প্রতিদিনের জীবন থেকে উদাহরণ নিয়ে আধুনিক ভাষ্যের নাম ‘কথামৃত’
উনিশ শতকের এক গন্ড গাঁ । নাম তার দেরেগ্রাম। গ্রামের জমিদার খুব হিসেবি। নিজের আখের গোছাতে অন্যকে দিয়ে জোর করে মিথ্যে বলিয়ে নিতেও ছাড়েন না। নির্দেশ অমান্যে কপালে জোটে মস্ত দুর্ভোগ। হাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয় না, মানুষও তাই, ফলে হতদরিদ্র ব্রাহ্মণ ক্ষুদিরাম, সে জমিদারের কোপে সর্বস্বান্ত হয়ে ভিটেমাটি চ্যুত হলেন, তবু মিথ্যে সাক্ষ্য দিলেন না কিছুতেই। সত্যকে আঁকড়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার হাত ধরে পথে নামলেন, এলেন কামারপুকুরে। আর সেখানেই ক্ষুদিরামের ঘরে জন্মালেন এক ‘বিরাট শিশু’, যে আজীবনটা কাটিয়ে দিল ঐ এক সত্যির সাধনায়। ক্ষুদিরামের সর্বকনিষ্ঠ এই সন্তান গদাধর চট্টোপাধ্যায় অর্থাৎ ভাবীকালের শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য ও গুরুত্বপূর্ণ সত্যি এটাই যে, তিনি তাঁর গোটা জীবনটায় যা কিছু করেছেন তার সবটা জুড়ে আবর্তিত হয়েছে তাঁর ঐ সহজ সত্যি, প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস ও অমলিন সারল্য।
অন্য আর পাঁচজনের মতোই শিশুবয়সে লাহাবাবুদের পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিল গদাধর। কিন্তু পড়াশোনায় এতটুকু মন লাগত না তার। বিশেষত কড়া-গন্ডার হিসেব কষতে গদাধর বিরক্ত হত খুব। যোগ যদি বা শেখা যায়, কিন্তু বিয়োগ তার কাছে নৈব নৈব চ। তার চেয়ে গদাই ওরফে গদাধরের ঢের ভালো লাগত রামায়ণ মহাভারতের কাহিনি পড়তে, পালাকীর্তন কিংবা যাত্রা শুনতে, আর নয়তো মানিক রাজার আমবাগানে সমবয়সীদের সঙ্গে হই হুল্লোড় করে সময় কাটাতে। আর ছিল ঘাসের ফুলটি থেকে শুরু করে পাশের মানুষটির প্রতি তাঁর একইরকম সহমর্মিতার বোধ। কারোর সামান্যতম কষ্টও সহ্য করতে পারত না গদাই, সকলের জন্য ছিল তার সমান ভালোবাসা আর এই সহজ ভালোবাসার বোধেই সমাজের সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, জেদ ধরেছিল গদাই, যদি তার উপনয়নে ভিক্ষে-মা কাউকে হতে হয় তাহলে সে হবে তার ধনি কামারনি। কারণ গদাই তাকে কথা দিয়েছে যে। ব্রাহ্মণ শরীর ব্যতিরেকে তৎকালীন সমাজের তথাকথিত কোনো নিচু জাতের মহিলাকে ভিক্ষে-মা’র সম্মান দিয়ে গদাই সেদিন শিক্ষা দিয়েছিল এই সমাজকে। যে শিক্ষার মূল সুর ছিল সমানুভবতা, দৃঢ়তা ও সত্যনিষ্ঠা। অনেক পুঁথি পড়া চশমা আঁটা পণ্ডিতরা যেখানে কোনো সমস্যার সমাধানে হাতাহাতির জায়গায় পৌঁছে গিয়ে বিব্রত হতেন, সেখানে বালক গদাধর তার এই সহজ সরল সত্যবিশ্বাসের জন্যই এককথায় সেসব সমস্যার সমাধান করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিত। ঠিক যেমনটা হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরে রানী রাসমণির রাধাগোবিন্দের মন্দিরে। গদাধর তখন সেখানকার ছোট ভটচায্, বিগ্রহের এক পা কোনো কারণে ভেঙে যাওয়ায় তাবড় শাস্ত্রজ্ঞরা যেখানে বিধান দিলেন নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সেখানে গদাধর রানীকে বললেন রানীমার জামাইয়ের পা ভাঙলে তাঁকে বাদ দিয়ে নতুন জামাইয়ের পরিবর্তে চিকিৎসা করে যদি সারিয়ে তোলা হয়, তাহলে মন্দিরের বিগ্রহের ক্ষেত্রে সে নিয়ম খাটবে না কেন! কষ্টিপাথরের বিগ্রহ নয়, মন্দিরের রাধাগোবিন্দ ঠিক যেন তাঁর ঘরের মানুষ। এই সহজ জীবনবোধ, অকাট্য যুক্তি ও ঈশ্বরানুভবের কাছে সেদিন হার মেনেছিল সব পণ্ডিতি তর্ক।
প্রার্থনা সংগীত, কথা ও সুর – স্বামী বিবেকানন্দ
সত্যের খোঁজ গদাধরকে শ্রীরামকৃষ্ণে পরিণত করেছে, যে পথে তাঁর সামনে হাজির হয়েছে নানা কথা, আলাপ-আলোচনা, নানা মত। একাধারে সনাতন হিন্দুধর্ম, ইসলাম, খ্রীষ্টান ইত্যাদি ধর্মপথে সাধনা করে সেই এক সত্যই অনুধাবন করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ভাবীকাল ঠিক এই একতার সুরই শুনেছিল শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের কণ্ঠস্বরে, যার মূল চালিকাশক্তি কামারপুকুরের এই দরিদ্র ব্রাহ্মণ শ্রীরামকৃষ্ণের সত্যনিষ্ঠা ও সমন্বয়বাদ। ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাধনের ইতিহাসের অত্যন্ত ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত এই মানুষটি যিনি সাধনপথের অন্তরায় হিসেবে স্ত্রীকে বর্জন করেননি বরং প্রকৃত সহধর্মিণী স্বরূপ অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে স্ত্রী সারদা দেবীকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন। হৃদয়প্রসারী ভালোবাসার টানে শ্রীরামকৃষ্ণ বাঁধতে পেরেছিলেন প্রত্যেককেই। শ্রীরামকৃষ্ণের শাস্ত্রের ব্যাখ্যা তাঁর রসবোধ, অতি সাধারণ মেদহীন যাপন, একরোখা বিশ্বাস আর অনাবিল সারল্যে হয়ে উঠেছে আমাদের বিচিত্র জীবনজিজ্ঞাসার সহজ উত্তর। প্রতিদিনের জীবন থেকে উদাহরণ নিয়ে জীবনানুসন্ধানের আধুনিক ভাষ্যের নাম তাই ‘কথামৃত’। মানুষের মধ্যেই প্রকৃত ঈশ্বরের বাস এই কথা কেবল চমকপ্রদ বাণী হয়ে থাকেনি শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে, আন্তরিক বিশ্বাস থেকে এ বাক্য সত্যি হয়ে উঠেছে তাঁর অনুপম জীবনে। সরলতায় সব হয়, আর সহজ সাধারণ হওয়ার চেয়ে বড়ো সাধন এ জগতে আর নেই – এই এত বড়ো সত্যি কথাটিই আসলে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে।
আজকের জটিল পৃথিবীতে গৃহী থেকে ত্যাগী, বিষয়ী থেকে বৈরাগী, সবরকম মানুষের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ আজ এক অনন্ত প্রবাহের নাম। যার কাছে করজোড়ে বসলে তিনি আমাদের শিখিয়ে দেন কীভাবে শিশুর মতো সরল হয়ে মনোহরণকারী, মায়াবিস্তারী চন্দ্রমাকেও চাঁদমামা বলে ডাকতে হয়। আজ, সেই সারল্যের জন্মদিন, আজ সরলতা উদযাপনের দিন।