‘১লা’ নয়, পয়লা বৈশাখে সচেতন হওয়ার অঙ্গীকার নিক সবাই মিলে

শুধু করোনা নিয়ে সচেতন হলে চলবে না

পাড়ার হুল্লোড়বাজ হরিদার মন ভালো নেই। গেল বছর লকডাউনে ‘১লা’ বৈশাখ কাটিয়ে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা পুরস্কার দিয়ে বলেছিলেন ‘আসছে বছর আবার হবে’। সে আর হল কই! যাই যাই করেও ফের ফিরে এল করোনা।

তিল তিল করে জমানো গুড়ে এক বালতি মূত্র। ‘মূত্র’ মনে পড়ল কারণ,  গোমূত্রের বিপুল বাজারের যুগে হরিদা এমন মুখ করে আছেন যেন কেউ মুখে জোর করে এক ফোঁটা চোনা (গোমূত্র) ফেলে দিয়েছে। হরিদার সাফ কথা- পাড়ার ‘কালচারাল’ অনুষ্ঠান নেই, মেয়ে আল্পনা কর্মসূত্রে ভিনরাজ্যে, এমনকি একটা হালখাতাও কপালে জোটেনি। বাংলার হালখাতা নিয়ে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত (সাঁটুল গুপ্ত) লিখেছিলেন: ‘গ্রামবাংলায় এবং শহরগঞ্জে হালখাতায় যার নামে বাকি নেই, তিনি বুক উঁচিয়ে চলতেন না।’ সেসব কিছুই তো নেই… নববর্ষ না কচুপোড়া!তবে, ‘আফটার অল’, হরিদা বাঙালি। গিন্নিকে গড়িয়াহাটে পাঠিয়ে ঠিক নতুন ধুতি-পাঞ্জাবিটা আগেভাগে বাগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু, ব্যাপারটা ‘বাগিয়ে কালী লোক হাসালি’র মতো হয়ে যাবে ভাবতে পারেননি হরিদা। নববর্ষে সকাল সকাল স্নান সেরে পাট ভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে নিজের ঘরেই চুপ করে বসেছিলেন হরিদা। সেই দৃশ্য দেখে প্রত্যাশিতভাবে গিন্নি আওয়াজ দিলেন, ‘বুড়ো বয়সে ঢং করে সং সাজা হয়েছে!’ হরিদা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় মোবাইল বেজে ওঠে-

বাংলার মাটি, বাংলার জল,   বাংলার বায়ু, বাংলার ফল–

পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান ॥

বাংলার ঘর, বাংলার হাট,   বাংলার বন, বাংলার মাঠ–

পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান ॥

বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা–

সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক…

ফোনটা রিসিভ করে নেন হরিদা। শখ করে ঠাকুরের (রবি) গানই রিংটোন রেখেছেন। মহারাষ্ট্র থেকে ভিডিও কল করেছে হরিদার মেয়ে আল্পনা। সেখানে আবার করোনা-কার্ফু জারি-টারি হয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। বাবা-মা’কে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছে সে। সে জানায়, বাবার সাজগোজ দারুণ লেগেছে তার। মা’কে বলে- দুপুরে রান্না করার দরকার নেই, অ্যাপ থেকে অর্ডার দিয়ে দেবো। আমার বন্ধু ফয়জুল, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টেই থাকে। সকালে একটু পায়েস করেছিলাম, ওকে দিয়ে এসেছি। ওর বাড়ি  বাংলাদেশে, বেচারা বাড়ি যাবে ভেবেছিল, এখন তো আর কোনওভাবেই সম্ভব নয়।

হরিদাঃ বেশ করেছিস পায়েস রান্না করে ওকে খাইয়েছিস। শোন, আমি জাতে মাতাল হতে পারি, তালে ঠিক। ফয়জুলকে আমার আর তোর মায়ের তরফ থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাস। আর বলিস, ১৯৩৯ সালের পয়লা বৈশাখে শ্যামলী-প্রাঙ্গণে সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘নববর্ষ-ধরতে গেলে রোজই তো লোকের নববর্ষ। কেননা, এই হচ্ছে মানুষের পর্বের একটা সীমারেখা। রোজই তো লোকের পর্ব নতুন করে শুরু হয়।’

ফোন রেখে মুখে মৃদু হাসি নিয়ে হরিদা গুনগুন করতে থাকেন,

বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন,  বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন–

এক হউক, এক হউক, এক হউক …

পরিশেষেঃ এখানে ‘সব চরিত্রই কাল্পনিক’, তবু ‘গল্প হলেও সত্যি’। আমরা এক অকল্পনীয় সংকটের মধ্যে রয়েছি। তা বলে বাঁচতে ভুলে গেলে চলবে না। লড়াই করতে ভুলে গেলে চলবে না। শুধু করোনা নিয়ে সচেতন হলে চলবে না, সচেতনতা আসুক সংস্কৃতিতে, ভাষায়, সম্পর্কে, মানবিকতায়। রবীন্দ্রনাথ কোন পরিপ্রেক্ষিতে 'বাংলার মাটি, বাংলার জল' লিখেছিলেন, তা আমরা জানি।  ১লা নয়, পয়লা বৈশাখে সচেতন হওয়ার অঙ্গীকার নিক সবাই মিলে। শুভ হোক ১৪২৮।

 

 

 

Developed by DXDasia