মানুষ ও প্রকৃতির সম্বন্ধ, যেভাবে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

মানুষ ও প্রকৃতি, এই দুই সত্তারই পৃথক সম্পর্ক রয়েছে সর্বোচ্চ শক্তি বা স্রষ্টার সঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তখন ৪০ বছর বয়স। সেই সময়ে তোলা তাঁর একটি ফটোগ্রাফে দেখা যায়, একটি তৃষ্ণার্ত, প্রকাণ্ড গাছের নীচে বসে আছেন তিনি, যেন অস্তিত্বের অর্থ সন্ধান করছেন। একটি ত্রিভুজের মধ্যে মানুষ আর প্রকৃতি সমতলে থাকলে, তার শীর্ষেস্থানে থাকে স্রষ্টা। বিগ ব্যাং নামক একটি অনন্য-বিস্ময়কর ঘটনার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল মানুষ ও প্রকৃতি, এই দুয়ের; এবং তা-ই এই দুই সত্তারই পৃথক সম্পর্ক রয়েছে সর্বোচ্চ শক্তি বা স্রষ্টার সঙ্গে। মানুষ, প্রকৃতি, স্রষ্টা পরস্পর সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গানের মধ্যেই রয়েছে সেই অনুরণন।  

সৃষ্টি আর স্রষ্টার এই ব্যাপারটাকে ঠিক কীভাবে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলেন তিনি? বিষয়টিকে শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে তিনি এ দেশ তথা বাংলার শিক্ষা-ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন। ১৯০১-এ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচার্য আশ্রম স্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ, যা যাবতীয় সাম্রাজ্যবাদী পক্ষপাতিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, বদ্ধমূল কুসংস্কারের শেকল থেকে ছিল মুক্ত। খোলা আকাশের নীচে পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে শিক্ষার্থীরা মানুষ, প্রকৃতি, স্রষ্টা –এই তিনের পারস্পরিক সম্বন্ধের প্রাথমিক ও বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে আত্মিক সংযোগস্থাপন করতে পারে। তাঁর বিশ্বভারতী স্থাপনার উদ্দেশ্য ছিল এটাই।

কলকাতা থেকে বহুদূরে অজ গ্রাম, লাল মাটির বীরভূমে বিশ্বভারতী স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাতে শিক্ষার্থীরা বাঁধাধরা শিক্ষার বদলে নাচ, গান, আঁকা, অভিনয়, উৎসব –এসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান আহরণ করতে পারে, প্রত্যেকটি ঋতু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী হতে পারে।

দারুণ অগ্নিবাণে রে/হৃদয় তৃষ্ণায় কাঁপে রে, জীবন যখন শুকায়ে যায়/করুণাধারায় এসো, মেঘের পরে মেঘ জমেছে অথবা আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে, আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, হেমন্তে কোন বসন্তের বাণী, শীতের হাওয়ার লাগলো নাচন আমলকীর এই ডালে ডালে, বসন্তে ফুল গাঁথলো আমার জয়ের মালা…আজি দখিনো দুয়ার খোলা…বীরভূমে বসে লেখা রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গানে বারবার ধরা পড়েছে ঋতু বৈচিত্র্য।

(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)

 

 

Developed by DXDasia