
রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক ভাবনা
বিজ্ঞান এবং দর্শনের যোগসূত্রে বিশ্বাস করতেন রবীন্দ্রনাথ। জড় হোক চেতন – সমস্ত সত্যের উৎসই এক। তা যে কোনো রকম কার্য-কারণ সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। দার্শনিক শোপেনহাওয়ার তাঁর ‘পর্যাপ্ত যুক্তির মূলনীতি’ বইতে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জগতের প্রধান চালক হিসেবে চিহ্নিত করেন ‘ইচ্ছে’ এবং ‘ভাবনা’-কে। তবে ‘ইচ্ছে’-কে স্থান দেন ভাবনার ওপরে। ‘শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ’-এ বলা আছে –
“স্রষ্টা থাকেন কার্য-কারণ সম্পর্কের বাইরে। তিনি কর্মফলের অধীন নন। তাঁর প্রজ্ঞা, ক্রিয়া এবং ক্রীড়া স্বাভাবিকভাবেই বিস্তার লাভ করে। ‘স্বাভাবিকতা’-এর সঙ্গে জুড়ে আছে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’, যা সব কার্য-কারণের ঊর্ধ্বে। জড় বস্তু নয়, জড় জগৎ সম্বন্ধে সচেতনতাই নিবিষ্ট করে রয়েছে আমাদের।”
এই জগতে ব্রহ্মের কোনো মালিক নেই, কোনো নিয়ন্ত্রক নেই। তাঁকে বুদ্ধি দিয়ে জানা যায় না। তিনিই সবকিছুর কারণ, জীবাত্মার শাসক। নিজের রথ নিজেই চালান। তিনি পরমাত্মা – পিতা বা মাতা নন। কোনো লিঙ্গ নেই তাঁর। সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজেকে – রয়েছেন আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রে। জগতের তিনি সম্রাট। আবার তাঁকে সঠিকভাবে জানলে মুক্ত হওয়া যায় জগতের সমস্ত বন্ধন থেকে।
বিশ্বভারতী
আরও পড়ুন: অসীমের সন্ধানী রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথের ছিল বহুমুখী প্রতিভা। শিশু মতো দৃষ্টিতে তিনি জগতের সৌন্দর্য দেখতেন। উৎস খুঁজে বার করতে চাইতেন। পরমসুন্দরকে জানতে চাইতেন নিজের সৃষ্টি দিয়ে। আধ্যাত্মিক পরিবেশে তিনি ছোটোবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন। আধ্যত্মিকতার মধ্যেই নিজেকে পূর্ণ করে পেতেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর শিক্ষাদর্শনেও সেই চেতনার প্রতিফলন। নিজের ৭০তম জন্মদিনের বক্তৃতায় তিনি বলছেন –
“জীবনের এই দীর্ঘ চক্রপথ প্রদক্ষিণ করতে করতে বিদায়কালে আজ সেই চক্রকে সমগ্ররূপে যখন দেখতে পেলাম তখন একটা কথা বুঝতে পেরেছি যে, একটিমাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছুই নয়, আমি কবি মাত্র। আমার চিত্ত নানা কর্মের উপলক্ষে ক্ষণে ক্ষণে নানা জনের গোচর হয়েছে। তাতে আমার পরিচয়ের সমগ্রতা নেই। আমি তত্ত্বজ্ঞানী শস্ত্রজ্ঞানী গুরু বা নেতা নই—একদিন আমি বলেছিলাম, ‘আমি চাই নে হতে নববঙ্গে নবযুগের চালক’ – সে কথা সত্য বলেছিলাম। শুভ্র নিরঞ্জনের যাঁরা দূত তাঁরা পৃথিবীর পাপক্ষালন করেন, মানবকে নির্মল নিরাময় কল্যাণব্রতে প্রবর্তিত করেন, তাঁরা আমার পূজ্য; তাঁদের আসনের কাছে আমার আসন পড়ে নি। কিন্তু সেই এক শুভ্র জ্যোতি যখন বহুবিচিত্র হন, তখন তিনি নানা বর্ণের আলোকরশ্মিতে আপনাকে বিচ্ছুরিত করেন, বিশ্বকে রঞ্জিত করেন, আমি সেই বিচিত্রের দূত। আমরা নাচি নাচাই, হাসি হাসাই, গান করি, ছবি আঁকি– যে আবিঃ বিশ্বপ্রকাশের অহৈতুক আনন্দে অধীর আমরা তাঁরই দূত। বিচিত্রের লীলাকে অন্তরে গ্রহণ করে তাকে বাইরে লীলায়িত করা– এই আমার কাজ। মানবকে গম্যস্থানে চালাবার দাবি রাখি নে, পথিকদের চলার সঙ্গে চলার কাজ আমার। পথের দুই ধারে যে ছায়া, যে সবুজের ঐশ্বর্য, যে ফুল পাতা, যে পাখির গান, সেই রসের রসদে জোগান দিতেই আমরা আছি। যে বিচিত্র বহু হয়ে খেলে বেড়ান দিকে দিকে, সুরে গানে, নৃত্যে চিত্রে, বর্ণে বর্ণে, রূপে রূপে, সুখদুঃখের আঘাতে-সংঘাতে, ভালো-মন্দের দ্বন্দ্বে–তাঁর বিচিত্র রসের বাহনের কাজ আমি গ্রহণ করেছি, তাঁর রঙ্গশালায় বিচিত্র রূপকগুলিকে সাজিয়ে তোলবার ভার পড়েছে আমার উপর, এই-ই আমার একমাত্র পরিচয়। অন্য বিশেষণও লোকে আমাকে দিয়েছেন – কেউ বলেছেন তত্ত্বজ্ঞানী, কেউ আমাকে ইস্কুল-মাস্টারের পদে বসিয়েছেন। কিন্তু বাল্যকাল থেকেই কেবলমাত্র খেলার ঝোঁকেই ইস্কুল-মাস্টারকে এড়িয়ে এসেছি – মাস্টারি পদটাও আমার নয়। বাল্যে নানা সুরের ছিদ্র-করা বাঁশি হাতে যখন পথে বেরলুম তখন ভোরবেলায় অস্পষ্টের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠতে চাচ্ছিল, সেইদিনের কথা মনে পড়ে। সেই অন্ধকারের সঙ্গে আলোর প্রথম শুভদৃষ্টি; প্রভাতের বাণীবন্যা সেদিন আমার মনে তার প্রথম বাঁধ ভেঙেছিল, দোল লেগেছিল চিত্তসরোবরে। ভালো করে বুঝি বা না বুঝি, বলতে পারি বা না পারি, সেই বাণীর আঘাতে বাণীই জেগেছে। বিশ্বের বিচিত্রের লীলায় নানা সুরে চঞ্চল হয়ে উঠছে নিখিলের চিত্ত, তারই তরঙ্গে বালকের চিত্ত চঞ্চল হয়েছিল, আজও তার বিরাম নেই।”
পূর্ণতার সাধনা রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ধরে করেছেন। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি স্থাপন করেন বিশ্বভারতী।
(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)

