অসীমের সন্ধানী রবীন্দ্রনাথ

জীবনের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ সার্বিকভাবে প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী

জীবনের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ সর্বজনীনভাবে প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী, এ কথা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যদিও অনেককিছুই আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে, তবে যা এখনও আমাদের আশার আলোর দিকে নিয়ে যেতে পারে, তা হল চিরন্তন আশ্রমিক দর্শন। যেমন রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেনঃ

“আজ আমার জীবনের সমস্ত শূন্যতা ভরে উঠেছে শৃঙ্খলা আর আনন্দে, কারণ আমি তাঁর সর্বাত্মক উপস্থিতি অনুভব করছি। হারিয়ে আমি যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, তা তাঁর কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি তার থেকে কিছু কম নয়। এই পৃথিবী আমার আভ্যন্তরীণ যা কিছু সম্পদ তা কেড়ে নিতে পারে নি, চারপাশের মৃত্যু আমাকে দমিয়ে দিতে পারেনি তাঁর কাছে এবং এই অন্তহীন মহাবিশ্ব আমাকে অস্বীকার করতে পারেনি—এমনকি অস্বিত্বের একটা অণু-পরমাণুও নয়। তাঁর শাশ্বত প্রার্থনা আমার জীবনে সর্বব্যাপী। সেই কারণেই, এই পৃথিবীতে যা কিছু ক্ষয়, হারিয়ে যাওয়া, তা পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে এই আশ্রমিক জীবনে।”

কচিকাঁচাদের সঙ্গে 

অন্য একটি বক্তৃতায় কবি উল্লেখ করেছেন যে, “আশ্রম থেকে মূলত দুটি সুর তৈরি হয় – একটা সুর মানবতার, আর একটা প্রকৃতির। আমরা এই বিবৃতিটি এইভাবে বিশ্লেষণ করতে পারিঃ মানবতার সুরটি তরান্বিত করে মানবিকতা, আর প্রকৃতির সুর যাবতীয় পরিবেশবিদ্যা সহ সমস্ত বিজ্ঞানকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসে। এমনকি এটাও বলা যায়, আশ্রমিক জীবনই একটি শিল্প।” 

রবীন্দ্রনাথ গায়ত্রী মন্ত্রের গভীরতর অর্থ অবগত করাতে চেয়েছিলেন, যেখানে পদার্থবিজ্ঞান আর জীববিজ্ঞানের বুনিয়াদ অন্তর্নিহিত রয়েছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, সাবিত্রী হলেন সূর্যের দেবী – মহাবিশ্বের জননী, যিনি আমাদের জীবন, মন ও আত্মার শক্তি জোগান। শান্তিনিকেতনের উপাসনা গৃহে গুরুদেবের বক্তৃতায় প্রায়শই সেই শক্তির আভাস মিলত এবং সচেতন আর অসচেতন মনের মাঝে সেতুবন্ধন করতো তার আলো। তাঁর ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থে এই গভীর আত্তীকরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশ্বপরিচয়ের শেষ অধ্যায়ে যা লক্ষ্যণীয়, তা হল রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান আর লেখার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছিলেন।

অবাধ জ্ঞানের পূজারী 

সন্ধ্যাবেলায় আশ্রমে উচ্চারিত হয় জ্যোতির্ময় উপনিষদ থেকে অনুপ্রাণিত উপাসনা মন্ত্র। এই মন্ত্রের অর্থ: আগুনে কে আছে, কে আছে জলে, কে আছে শাখাপ্রশাখায়, কে আছে বৃক্ষে, যে সমস্ত মহাবিশ্বকে বিস্তৃত করেছে, সেই ঈশ্বরকে প্রণাম। 

এই মন্ত্রের যথাযথ সংস্করণগুলি ‘মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দরো বেশে এসেছো’র মতো অনেক রবীন্দ্রসংগীতেই পাওয়া যায়।

(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত) 
 

Developed by DXDasia