
মৃত্যুর মুখে বাংলার একমাত্র সঙ্গীত ঘরানা
ফতেপুর সিক্রির সেই পাথরের চাতালের কথা মনে পড়ে, যেখানে প্রতি সপ্তাহান্তে তানসেন এসে বসতেন এবং সুরের জাদুতে শ্রোতাদের আচ্ছন্ন করতেন, এমনকী আকবরকেও? এমনও বলা হয়, তানসেনের গান ডেকে আনতে পারত ঝড় ও বজ্রপাতকেও। অনেকের মনে পড়বে মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট মাইহার এস্টেটের কথাও, যা অনেক উত্তর ভারতের ধ্রুপদী সঙ্গীতের অনেক ঘরানার জন্ম দিয়েছিল; যার ঐতিহ্য বহনকারী পণ্ডিত রবিশঙ্করও। কিন্তু আমরা ক’জন বাংলার ধ্রুপদী হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত? দশকের পর দশক ধরে বাংলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সঙ্গীতজগতের দিকপালরা সারা বিশ্বে পারফর্ম করে চলেছেন, অথচ কারও ইচ্ছা বা সময় হল না বাংলার একমাত্র ধ্রুপদী সঙ্গীত ঘরানা – বিষ্ণুপুর ঘরানার সম্পর্কে কথা বলার।
ষাটের দশকের শেষের দিকে, পণ্ডিত রবিশংকর, যাঁর শিকড় বাংলায়, আমেরিকার ব্যান্ড বিটেলস্-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তিনি কোনওদিনই কলকাতার থেকে মাত্র ২০০ কিমি দূরের বাঁকুড়ায় গিয়ে উঠতে পারেননি। সেখানে বাংলার বিষ্ণুপুর ঘরানা ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। দিনের পর দিন ধরে আমাদের নিজস্ব ঘরানাটি তাত্ত্বিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এমনকি সরকারের থেকেও অবহেলিত হয়ে এসেছে।
বাংলা সঙ্গীতের নানা আঙ্গিকের মধ্যে থেকে বিষ্ণুপুর ঘরানা উল্লেখযোগ্য ঐশ্বর্যের অধিকারী। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের যা প্রাচীনতম স্টাইল – ধ্রুপদ – বিষ্ণুপুর ঘরানায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিষ্ণুপুর ঘরানার উদ্ভব ১৩৭০ খ্রিষ্টাব্দে, বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। বাংলার নিজস্ব সঙ্গীত ঘরানার ছোঁয়া এর সর্বাঙ্গে। আলাপের অংশটি মৃদু ও সুরেলা; লয়বিন্যাস ও তালের ব্যবহার এই ঘরানার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে, দিকপাল সঙ্গীতশিল্পীদের অভাব দেখা দিয়েছিল ভারতে, কেননা প্রায় সব শিল্পীই মুঘলদের ঘেরাটোপ ছেড়ে ছোট-ছোট অঙ্গরাজ্যগুলিতে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়েছিলেন।
সেনিয়া ঘরানার ধ্রুপদশিল্পী বাহাদুর খান মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ দেব-এর কাছে গিয়ে পৌঁছন পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার আশায়। পণ্ডিত রামশরণ ভট্টাচার্য-কেও ধ্রুপদে তালিম দেন তিনি। এই রামশরণ ভট্টাচার্যই পরবর্তীকালে বিষ্ণুপুর ঘরানার জনক হিসেবে অভিহিত হন।
বাঁকুড়া ভ্রমণের সময়, আমি হাজির হয়েছিলাম ভারতের প্রাচীনতম সঙ্গীত আশ্রম – বিষ্ণুপুরের রামশরণ সঙ্গীত আশ্রমে। অধ্যক্ষ সবেমাত্র তাঁর দুপুরের বিশ্রামের জন্য চলে গেছেন। অন্যান্য কর্মীরা রাজি হলেন আমাকে এই আশ্রমের সঙ্গীতশিক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে রাজি হলেন। সরু ড্যাম্প-ধরা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় পৌঁছে দেখলাম বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো রামশরণ ভট্টাচার্য, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরও অনেক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি অসহায় তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। শতাব্দীপ্রাচীন কিছু বাদ্যযন্ত্র কাঠের ক্যাবিনেটে রাখা, যে-কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। একটা সুরবাহার হাতে তুলে নিলাম আমি। ব্যালকনি থেকে যাচ্ছে, আগেকার প্রেক্ষাগৃহ এখন বিষ্ণুপুর পুরসভার আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপ ওয়্যারহাউজ।
কিন্তু, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এমন অনেক হেরিটেজ এলাকা দেখেও না-দেখার স্বভাব জানা আছে বলে, জাতীয় গৌরবগুলিকে এমন অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে অবাক হইনি। আশ্রমটি স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাফিলিয়েশন পাওয়ার জন্য ২০ বছর ধরে অপেক্ষা করছে। দোতলা বাড়িটাও পৌরসভার দখলে, ডাম্পিং গ্রাউন্ডের পরিচয়ে।
এই আশ্রমেই ধ্রুপদ ও খেয়ালের লয়বিন্যাস নিয়ে গবেষণা ও অনুষ্ঠান হয়। একটা সময়, যখন বিষ্ণুপুরের এই ঘরানা হারিয়ে যেতে বসেছিল, কয়েকজন অজানা শুভানুধ্যায়ী চেষ্টা করেছিলেন ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের মূল স্রোতের মধ্যে বিষ্ণুপুর ঘরানাকে আবার ফিরিয়ে আনার।
বাংলা নিয়ে দুর্বলতাই আমাকে ধ্রুপদী ঘরানার খোঁজে ছুটিয়ে মারছিল। হারিয়ে যাওয়া সেইসব যুগ সম্পর্কে যতটা জানা যায়, সেটাই আমার লক্ষ্য ছিল তখন। আশার কথা, রাজ্য সরকার অবশেষে বাংলার প্রাচীন এই সঙ্গীত ঘরানাটিকে ডকুমেন্টেড করতে উদ্যোগী হয়েছে এবং এর প্রসার ঘটাতেও পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আমি শুধু স্বপ্ন দেখতে পারি, মৃতপ্রায় ঘরানাটি জেগে উঠছে আবার। আর কী!
