মার্টিন লাইট রেলের শেষ চিহ্ন : দক্ষিণ ২৪ পরগনার ‘ছোটো রেল’

ফলতা স্টেট রেলওয়ে ও ‘ন্যারো গেজ’ বিপ্লব

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার আমতলা-ফলতা রোডের পিচের আস্তরণের নিচে আজ যা চাপা পড়ে আছে, তা কেবল কিছু লোহার পাত বা পাথর নয়, বরং বাংলার রেল ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর এবং বিস্মৃত অধ্যায়। এক সময় এই পথ দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দাপিয়ে বেড়াত ফলতা স্টেট রেলওয়ে (Falta State Railway) বা সংক্ষেপে FSR।

আজকের প্রজন্মের কাছে আমতলা থেকে ফলতা যাওয়ার রাস্তাটি কেবল একটি ব্যস্ত জনপদ, কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত এই চত্বরে জীবন চলত রেলের বাঁশির ছন্দে।

পত্তনের প্রেক্ষাপট : মার্টিন লাইট রেলের সেই স্বর্ণযুগ
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলার গ্রামীন জনপদের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ব্রিটিশরা সরু গেজের বা Narrow Gauge রেলের প্রবর্তন করে। বিখ্যাত ‘মার্টিন বার্ন’ কোম্পানির হাত ধরে হাওড়া-আমতা বা হাওড়া-শাঁকরাইল লাইনের মতো জাঁকিয়ে বসেছিল ফলতা স্টেট রেলওয়ে। মূলত সামরিক এবং বাণিজ্যিক—উভয় কারণেই এই লাইনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। হুগলি নদীর পাড়ে ফলতা ছিল একটি কৌশলগত বন্দর এবং তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সেনানি। সেই ফলতাকে কলকাতার উপকণ্ঠ মাঝেরহাটের সঙ্গে যুক্ত করতেই এই রেলপথের পরিকল্পনা করা হয়।

কীভাবে জলাভূমি আর গ্রামীন কর্দমাক্ত মাটির ওপর দিয়ে রেললাইন পাতা হয়েছিল, তা আজও বিস্ময়ের। মার্টিন বার্ন কোম্পানির সেই ‘ন্যারো গেজ’ বিপ্লব না থাকলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উন্নয়ন হয়তো আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যেত।

ম্যাপের রেখাচিত্র: মাঝেরহাট থেকে ফলতা
এই রেলপথটি শুরু হতো কলকাতার মাঝেরহাট স্টেশন থেকে। সেখান থেকে ট্রেনটি দক্ষিণ দিকে এগোত। এর প্রধান প্রধান স্টেশনগুলোর নাম ছিল:
মাঝেরহাট
সন্তোষপুর
বিবিরহাট
পৈলান
আমতলা (যেটি ছিল এই লাইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাংশন বা বিরতিস্থল)
নৌহাজারি
ফলতা

আমতলা ছিল সেই সময়কার এক ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র। আজকের আমতলা মোড় যেখানে দিনরাত গাড়ির হর্নে মুখর থাকে, ১০০ বছর আগে সেখানে শোনা যেত ন্যারো গেজ স্টিম ইঞ্জিনের কুঁক-ঝিক শব্দ।

লোকগাথায় ‘ছোটো রেল’ : মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাধারণ মানুষের কাছে এই ট্রেনটি ছিল আশীর্বাদের মতো। বড়ো বড়ো  মালবাহী ট্রেনের বদলে এই লাইনে চলত ছোটো ছোটো কামরার ট্রেন। ছোটো ছোটো চাকা, ছোটো ইঞ্জিন—তাই স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ছিল ‘ছোটো রেল’। 

সে সময় রাস্তাঘাটের অবস্থা ছিল শোচনীয়। কাঁচা রাস্তা আর বর্ষার কাদায় যখন জীবন অতিষ্ঠ হতো, তখন এই ছোটো রেলই ছিল একমাত্র ভরসা। ফলতা অঞ্চলের মাছ, পান আর সবজি আমতলা হয়ে পৌঁছে যেত কলকাতার বাজারে। কথিত আছে, ট্রেনের গতি এতই কম ছিল যে চলন্ত ট্রেন থেকে অনায়াসেই নামা-ওঠা করা যেত। ট্রেনের কামরায় বসেই গ্রামের মানুষ হাট-বাজারের গল্প সারত।

 

পিচের তলায় বন্দি ইতিহাস : বর্তমান পরিস্থিতি
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে যখন সড়কপথ উন্নত হতে শুরু করল এবং বাসের দাপট বাড়ল, তখন লোকসানের মুখে পড়ে এই ছোটো রেল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায় ফলতা স্টেট রেলওয়ে।

এরপর কেটে গেছে কয়েক দশক। রেললাইন তুলে নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমতলা থেকে ফলতা পর্যন্ত যে বর্তমান পিচ রাস্তাটি তৈরি হয়েছে, সেটি তৈরি হয়েছে সেই পুরনো রেললাইনের উপরেই।

*রেলপথ থেকে সড়কপথ: আজ আপনি যখন আমতলা থেকে ফলতা রোড দিয়ে গাড়িতে যান, আসলে আপনি সেই ঐতিহাসিক রেলপথের ওপর দিয়েই সফর করেন। 
*পুরোনো সংকেত: আজও রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়ে খুঁজলে চোখে পড়তে পারে পুরনো রেললাইনের পাথরের ব্লক বা লোহার স্লিপারের ধ্বংসাবশেষ। 
*ভবন ও স্টেশন: আমতলা বা ফলতার আশেপাশে অনেক পুরনো জীর্ণ ভবন আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা এক সময় রেলওয়ের অফিস বা স্টেশন মাস্টারদের থাকার জায়গা ছিল।

সরকারের উচিত অন্তত আমতলা বা ফলতার কোনো এক মোড়ে একটি স্মারক ভাস্কর্য বা রেলের পুরনো কোনো নিদর্শন রাখা, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে—তাদের এই ব্যস্ত রাস্তার নিচে এক সময় বাংলার এক গৌরবময় রেলের ইতিহাস চুকচুক শব্দে কথা বলত।

কেন এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ?
আমতলা-ফলতা রোডের নিচে চাপা পড়ে থাকা এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলার ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার কথা। কীভাবে জলাভূমি আর গ্রামীন কর্দমাক্ত মাটির ওপর দিয়ে রেললাইন পাতা হয়েছিল, তা আজও বিস্ময়ের। মার্টিন বার্ন কোম্পানির সেই ‘ন্যারো গেজ’ বিপ্লব না থাকলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উন্নয়ন হয়তো আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যেত।

আজকের দ্রুতগামী জীবনের নিচে ফলতা স্টেট রেলওয়ে এক নীরব সাক্ষী হয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমরা যখন হাইওয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাই, তখন একবারও ভাবি না যে আমাদের চাকার কয়েক ফুট নিচেই ছিল সেই ঐতিহাসিক বাষ্পীয় ইঞ্জিনের যাত্রাপথ। 

আমতলা-ফলতা রোডের প্রতিটি বাঁক আজও সেই ছোটো রেলের বাঁশির প্রতিধ্বনি ধরে রেখেছে। সরকারের উচিত অন্তত আমতলা বা ফলতার কোনো এক মোড়ে একটি স্মারক ভাস্কর্য বা রেলের পুরনো কোনো নিদর্শন রাখা, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে—তাদের এই ব্যস্ত রাস্তার নিচে এক সময় বাংলার এক গৌরবময় রেলের ইতিহাস চুকচুক শব্দে কথা বলত।

চাপা পড়ে থাকা সেই লোহা আর পাথর হয়তো আজ জং ধরেছে, কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষের যৌথ স্মৃতিতে ফলতা ছোটো রেল আজও এক অবিচ্ছেদ্য আবেগ।

________________

তথ্যসূত্র:
১. Martin Burn & Co. Records): ১৯১৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভারতে মার্টিন বার্ন পরিচালিত লাইট রেলওয়ে সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদন এবং নথি।
২. দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা গেজেটিয়ার (South 24 Parganas District Gazetteer): ব্রিটিশ এবং পরবর্তী ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত জেলা গেজেটিয়ারে আমতলা ও ফলতা অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিবরণ।
৩. ভারতীয় রেলের ইতিহাস (History of Indian Railways): আর. আর. ভাণ্ডারী বা সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের লেখা ন্যারো গেজ রেলওয়ে সংক্রান্ত গবেষণাপত্র।
৪. দ্য রেলওয়ে গেজেট (The Railway Gazette): বিশ শতকের প্রথমার্ধে প্রকাশিত বিভিন্ন জার্নাল যেখানে ‘ফলতা স্টেট রেলওয়ে’ (FSR)-এর কারিগরি দিক আলোচিত হয়েছে।
৫. স্থানীয় ইতিহাস ও মৌখিক সূত্র: দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রবীণ নাগরিকদের স্মৃতিচারণ এবং স্থানীয় ইতিহাসবিদদের সংকলিত ছোটো রেলের কাহিনি।
৬. পুরাতন সংবাদপত্রের আর্কাইভ : ১৯৫৮ সালের আনন্দবাজার বা স্টেটসম্যান পত্রিকার আর্কাইভ, যেখানে এই লাইনটি বন্ধ হওয়া সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

 

Developed by DXDasia