ক্যানিং রেলওয়ে : ব্রিটিশ ভারতের এক উচ্চাভিলাষী ও ট্র্যাজিক বাণিজ্যিক ইতিহাস

বাংলার রেল মানচিত্রে শিয়ালদহ দক্ষিণ-শাখার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হলো ক্যানিং। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন যে, আজকের এই ক্যানিং স্টেশনের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ভারতের এক উচ্চাভিলাষী এবং ট্র্যাজিক বাণিজ্যিক ইতিহাস, যা ইতিহাসে ‘মাতলা রেলওয়ে’ বা ‘ক্যানিং রেলওয়ে’ নামে পরিচিত। এই কাহিনি কেবল রেললাইনের নয়, একটা শহর গড়া এবং তার পতনের এক ঐতিহাসিক দস্তাবেজ।

লর্ড ক্যানিং-এর স্বপ্ন ও প্রেক্ষাপট

১৮৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ সরকার এক অদ্ভুত সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। হুগলি নদীর নাব্যতা ক্রমশ কমছিল। পলি জমার কারণে বড়ো বড়ো জাহাজগুলো কলকাতা বন্দরে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়ছিল। ব্রিটিশ বণিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন যে, কলকাতা বন্দর যদি অকেজো হয়ে যায়, তবে ভারতের বাণিজ্য লাটে উঠবে।

 

এই রেলপথ নির্মাণ ছিল এক মহা চ্যালেঞ্জ। পিয়ালি, বিদ্যাধরী এবং মাতলা—এই তিন নদীর মোহনা এবং দক্ষিণবঙ্গের জলাভূমি ভেদ করে লাইন বসাতে গিয়ে বহু শ্রমিক ম্যালেরিয়া এবং বন্যপ জানোয়ারের আক্রমণে প্রাণ হারান।

তখনকার গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং এক বিকল্প বন্দর তৈরির পরিকল্পনা করেন। কলকাতার দক্ষিণ-পূর্বে মাতলা নদীর তীরে এক গভীর এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল, মাতলা নদীর তীরে একটি আধুনিক বন্দর তৈরি করা হবে এবং সেই বন্দরের নাম হবে ‘পোর্ট ক্যানিং’। কিন্তু বন্দর করলেই তো হবে না, সেই বন্দর থেকে মালপত্র কলকাতায় নিয়ে আসার জন্য দ্রুত পরিবহনের প্রয়োজন। আর সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিল ‘ক্যানিং রেলওয়ে’ বা মাতলা রেললাইন তৈরির পরিকল্পনা।

রেলপথের সূচনা ও নির্মাণ 

১৮৫৩ সালে ভারতে প্রথম রেল চললেও, সুন্দরবনের জলাজঙ্গল ঘেরা এলাকায় রেলপথ বসানো ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ। ১৮৫৯ সালে ‘ক্যালকাটা অ্যান্ড সাউথ-ইস্টার্ন রেলওয়ে’ নামক একটি বেসরকারি কোম্পানি এই রেলপথ তৈরির দায়িত্ব নেয়। রেলপথের লক্ষ্য ছিল শিয়ালদহ থেকে মাতলা নদীর তীর পর্যন্ত প্রায় ৪৫-৫০ কিলোমিটার রাস্তা যুক্ত করা।

এই রেলপথ নির্মাণ ছিল এক মহা চ্যালেঞ্জ। পিয়ালি, বিদ্যাধরী এবং মাতলা—এই তিন নদীর মোহনা এবং দক্ষিণবঙ্গের জলাভূমি ভেদ করে লাইন বসাতে গিয়ে বহু শ্রমিক ম্যালেরিয়া এবং বন্যপ জানোয়ারের আক্রমণে প্রাণ হারান। তবুও ব্রিটিশ জেদের কাছে হার মানে প্রকৃতি। ১৮৬২ সালের ২ জানুয়ারি প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলে এই লাইনে। আর ১৮৬৩ সালের ১৫ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

সেদিন বাংলার সংবাদপত্রে হইচই পড়ে গিয়েছিল। লোকে বলছিল, এবার নাকি কলকাতা ছেড়ে বাণিজ্যের জোয়ার বইবে মাতলার কূলে। শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে ট্রেনটি সোনারপুর হয়ে পৌঁছে যেত সরাসরি ক্যানিং-এ।

পোর্ট ক্যানিং—এক বিফল উচ্চাকাঙ্ক্ষা

রেলপথ চালু হওয়ার পর ক্যানিং শহরকে ঘিরে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হয়। লর্ড ক্যানিং চেয়েছিলেন এই শহরটিকে ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবে গড়ে তুলতে। রাজকীয় সব অট্টালিকা, হোটেল, চালের কল আর গুদামঘর তৈরি হতে শুরু করে। ভাবা হয়েছিল, দক্ষিণ ভারতের বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাহাজগুলো আর হুগলি নদী দিয়ে কলকাতায় না গিয়ে সরাসরি মাতলা নদী দিয়ে ক্যানিং বন্দরে ভিড়বে।

রেলপথটি তখন ছিল ক্যানিং-এর প্রাণভোমরা। প্রতিদিন শত শত কুলি এবং বণিক রেলে চেপে ক্যানিং আসত। কিন্তু প্রকৃতি মানুষের এই দর্প সহ্য করেনি। মাতলা নদী ছিল অত্যন্ত অস্থির। ১৮৬৭ সালে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে পোর্ট ক্যানিং বন্দরটি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। কয়েক ফুট পলি জমে বন্দরের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়ে জাহাজগুলো আর তীরে ভিড়তে পারছিল না।

রেল কোম্পানি বিপুল লোকসানের মুখে পড়ে। যে শিয়ালদহ-ক্যানিং রুটটি বাণিজ্যের সোনার খনি হওয়ার কথা ছিল, তা তখন জনমানবহীন এক ভূতুড়ে লাইনে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়। ১৮৬৮ সালে বেসরকারি কোম্পানিটি হাত গুটিয়ে নেয় এবং সরকার এই রেলপথটি অধিগ্রহণ করে।

বিংশ শতাব্দী ও ক্যানিং রেলের পুনর্জীবন

পোর্ট ক্যানিং বন্দর হিসেবে ব্যর্থ হলেও, মাতলা রেলপথটি কিন্তু মরে যায়নি। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই রেলপথের গুরুত্ব অন্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সুন্দরবনের জনবসতি বাড়তে শুরু করলে ক্যানিং হয়ে ওঠে মাছ ও কাঠ বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। সুন্দরবনের গভীর থেকে আসা নোনা মাছ এই রেলে চেপেই কলকাতার বাজারে পৌঁছাতে শুরু করে।

১৯৫০-এর দশকের পর এই রেলপথের বৈদ্যুতিকীকরণ সম্পন্ন হয়। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার অন্যতম ব্যস্ত রুটে পরিণত হয় এটি। যে রেললাইন এক সময় ব্রিটিশ বণিকদের পকেট ভরাতে তৈরি হয়েছিল, আজ তা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার মেরুদণ্ড।

যে রেললাইন এক সময় ব্রিটিশ বণিকদের পকেট ভরাতে তৈরি হয়েছিল, আজ তা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার মেরুদণ্ড।

ঐতিহাসিক স্মারক ও আজকের ক্যানিং

আজ ক্যানিং স্টেশনে গেলে সেই পুরনো পোর্ট ক্যানিং-এর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। লর্ড ক্যানিং-এর তৈরি করা বিখ্যাত ‘হেডকোয়ার্টার’ ভবনটি আজও জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে সেই রেল ইতিহাসের সাক্ষী দেয়। এই রেলপথটি এখন কেবল একটি পরিবহন মাধ্যম নয়, এটি সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। পর্যটকরা যখন ক্যানিং লোকালে চড়ে সুন্দরবন দেখতে যান, তাঁরা আসলে সেই দেড়শো বছর পুরনো ‘মাতলা রেলওয়ের’ পথ ধরেই এগিয়ে চলেন।

মাতলা রেলওয়ের ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকৃতির কাছে হার মানে, আবার সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই কীভাবে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার নতুন পথ তৈরি হয়। পঁচিশ বছর আগে পলি জমা মাতলা নদী ক্যানিং-এর রাজকীয় স্বপ্ন ডুবিয়ে দিলেও, শিয়ালদহ-ক্যানিং রেললাইনটি আজও সগৌরবে টিকে আছে বাংলার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে।

লর্ড ক্যানিং-এর সেই স্বপ্নিল শহর আজ নেই, কিন্তু তাঁর নামে চলা ট্রেনটি আজও প্রতিদিন ভোরে হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষের স্বপ্ন নিয়ে শিয়ালদহের দিকে ছুটে চলে। এটাই মাতলা রেলওয়ের আসল সার্থকতা।

____________________
তথ্যসূত্র:
১। Bengal District Gazetteers (24-Parganas): এল.এস.এস. ও’ম্যালি (L.S.S. O’Malley) ১৯১৪ সালে এই গেজেটিয়ারে ক্যানিং বন্দর এবং মাতলা রেলওয়ের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
২। Railway Board Records: তৎকালীন ‘ক্যালকাটা অ্যান্ড সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে’ কোম্পানির বার্ষিক রিপোর্ট।
৩।  “The Early History of Bengal Railways”: বি. মুখোপাধ্যায় রচিত এই বইয়ে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার বিস্তার নিয়ে আলোচনা আছে।
৪।  “কলকাতার ইতিকথা”: বিনয় ঘোষের লেখায় মাতলা নদীকে কেন্দ্র করে নতুন শহর গড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টার উল্লেখ পাওয়া যায়।
৫। The Calcutta and South-Eastern Railway (CSER) ইতিহাস, wikipedia
৬। Indian Railways Fan Club (IRFCA): ভারতের রেল ইতিহাসের প্রাচীনতম তথ্যের জন্য এটি একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল উৎস।

ছবি: Eastern Bengal Railway logo, Source – Wikipedia, Old Steam locomotive engine photo, source – India Rail Info.

Written by