হুগলির রাজরাজেশ্বর : বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যরীতির এক জীবন্ত দলিল

বাংলার শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে এই মন্দির

“যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন” : রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র 

তিহাসের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় স্থান। ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি, মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে আধুনিক যুগের সূচনা পর্যন্ত বাংলার বাণিজ্য তথা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে নানা ইউরোপীয় শক্তি এখানে ঘাঁটি গেড়েছে। কখনও পর্তুগীজ (ব্যান্ডেল), ওলন্দাজ (চুঁচুড়া), ফরাসি (চন্দননগর) তো কখনও আবার ড্যানিশ (শ্রীরামপুর)। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম আসে পর্তুগীজরা। আদি সপ্তগ্রামে তখন রমরমা। বাঁশবেড়িয়া, কৃষ্ণপুরসহ সাতটি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি, আনুমানিক ত্রয়োদশ শতক থেকেই বাংলার প্রধান বন্দর হিসেবে কার্যকর। বস্ত্র, রেশম, মশলা ও তামাকে বিনিয়োগ করে পর্তুগীজরা। ক্রমশ প্রসারিত হয় বাণিজ্য। বাংলার অর্থনৈতিক প্রকরণে আকৃষ্ট হয়ে, এরপর একে একে এগিয়ে আসে আরও অনেকেই। সবশেষে আসে ডেনমার্ক। ১৭৫৫ সালের জুলাই মাস, বাংলার তৎকালীন নবাব আলিবর্দী খাঁ-র কাছে কুঠি নির্মাণের অনুমতি ও ফরমান পায় তারা।

চোখে পড়ে অপূর্ব সব নকশা- পৌরাণিক কাহিনি, কৃষ্ণের রাসলীলা ও সমকালীন সমাজ জীবন। বাংলার এই অনন্য মন্দিরগুলি রচনা করতেন এখানকার সূত্রধর সম্প্রদায়। তাঁরা মাটি, কাঠ, পাথর ও ছবি- এই চার মাধ্যমেই ছিলেন যথেষ্ট পটু।

আলোচ্য এই প্রতিটি স্থানে আমরা ইউরোপীয়দের যথেষ্ট প্রভাব দেখি। এখানকার বাড়িঘর, অফিস কাছারি, কারখানাতে বিদেশি ছাপ স্পষ্ট। তবে সেটিই একমাত্র নয়। ইউরোপীয় রীতির পাশাপাশি, সমান্তরাল ভাবে প্রসারিত হয়েছে বাংলার নিজস্ব ধারা। তেমনই একটি স্থাপত্য নিয়ে আজকের আলোচনা।

হুগলির প্রাচীন জনপদ চুঁচুড়া ও চন্দননগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত রাজরাজেশ্বর শিব মন্দির, বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। চন্দননগর স্টেশন থেকে অটো বা টোটো ধরে এখানে আসা যায়। কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যরীতির আঙ্গিকেও এ এক জীবন্ত দলিল। সাধারণত দক্ষিণ গাঙ্গেয় জনপদ অঞ্চলে আমরা যেসব শিব মন্দির দেখি, তার বেশিরভাগই হয় চারচালা নাহলে আটচালা। তবে এখানে তা নয়। শিব এখানে নবরত্ন গর্ভে বিরাজমান। মন্দিরের মূল কাঠামোর ওপরে দুটি স্তরে মোট নয়টি চূড়া বা রত্ন রয়েছে। রত্নগুলি খাঁজ কাটা ও শিখর বিশিষ্ট। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালে চিত্রাবলী বিদ্যমান। প্রখ্যাত গবেষক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘চুঁচুড়ার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত বুড়োশিবতলার শিবমন্দির চুঁচুড়া শহরের একমাত্র পরিপূর্ণ টেরাকোটার কারুকার্যমণ্ডিত মন্দির।’ এছাড়া ‘ডেভিডবাবু’ অর্থাৎ ডেভিড ম্যাকাচ্চান সাহেবের গবেষণাতেও আমরা এর উল্লেখ পাই। তিনি মন্দিরটি চিহ্নিত ও নথিভুক্ত করেছেন।

মন্দিরের নির্মাণকাল নিয়ে নানান মত প্রচলিত। তবে স্থাপত্য শৈলীর নিরিখে অনেকের ধারণা, সম্ভবত আঠারো শতকের শেষ অথবা উনিশ শতকের গোড়ায় এটি তৈরি হয়েছে। মন্দিরের ফলক অনুসারে এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন- স্বর্গীয় পূর্ণচাঁদ ও মেনকা চক্রবর্তী। আবার পাশের ফলকে পাওয়া যায় সংস্কারকদের নাম- স্বর্গীয় পূর্ণচাঁদ, পুত্র উদয়চাঁদ, পুত্রবধু চন্দনা ও নাতি সুব্রত চক্রবর্তীর নাম। এখানে কিছুটা শঙ্কার উদ্রেক হয়। ফলক দুটি নিতান্তই হাল আমলের। ‘মেনকা’ নামটি আঠারো-উনিশ শতকের নিরিখে বেশ আধুনিক। বড়োজোর বিংশ শতকের। সেক্ষেত্রে পূর্ণচাঁদের কোনও পূর্বপুরুষ কি এটি নির্মাণ করেছেন? এই প্রশ্ন অনুসন্ধিৎসু মনে জাগতে বাধ্য। অবশ্য প্রদোষ দাশগুপ্তের ‘Temple Terracotta of Bengal’- এ আমারা কিছুটা অন্য তথ্য পাই। তাঁর মতে মন্দিরটি ১৭০৪ সালে নির্মাণ করেন কালাচাঁদ ঘোষ। 

বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণ প্রায় নেই বললেই চলে। ইতি উতি পেরেক গাঁথা। কোথাও আগাছার স্তূপ, ফাটলে গজানো গাছ, কোথাও আবার খসে পড়ছে টেরাকোটা। এ যেন নীরব দিন যাপন। একটু কাছে আসলেই চোখে পড়ে অপূর্ব সব নকশা- পৌরাণিক কাহিনি, কৃষ্ণের রাসলীলা ও সমকালীন সমাজ জীবন। বাংলার এই অনন্য মন্দিরগুলি রচনা করতেন এখানকার সূত্রধর সম্প্রদায়। তাঁরা মাটি, কাঠ, পাথর ও ছবি- এই চার মাধ্যমেই ছিলেন যথেষ্ট পটু। এই চিত্রকরদের কথা আমরা মঙ্গলকাব্যে পাই।

জরাজীর্ণ শিখরে ও দেওয়ালে জন্মেছে আগাছা। ফাটল, যত্রতত্র পেরেক সংযোজন- ক্রমশ দুর্বল করে চলেছে প্রাচীন গঠনবিন্যাস। ফলত অবিলম্বে এর সংরক্ষণ প্রয়োজন।

মানব অবয়ব (Human Figure) ছাড়াও মন্দিরে চোখে পড়ে নানাবিধ মোটিফ। যেমন তৃণগুল্ম, মৃত্যুলতা, শুকপাখি, মূয়েরর মুখে সাপ ও দ্বাদশ শিবলিঙ্গ। হিন্দু পুরাণ মতে শুকপাখি হল জ্ঞান, প্রেম ও আধ্যাত্মিক বার্তার প্রতীক। তারা কামদেব ও দেবী মাতঙ্গীর বাহন। শুকের পিঠে কামদেব বসন্ত ও প্রণয়ের ধারক। এছাড়াও “শুকসপ্ততি”-র মতো কাহিনিতে এদের ধৰ্মীয় উপদেশ ও বার্তা বাহক হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে শাস্ত্র মতে সাপ হল মানুষের অহংকার (Ego), বিষাক্ত মনোভাব ও ক্ষণস্থায়ী ইন্দ্রিয়সুখ। ময়ূ্রের সাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখা আসলে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য মানুষের রিপুকে জয় করা। 

বাংলার মন্দির স্থাপত্যে এক বিশেষ অলঙ্করণ ‘মৃত্যুলতা’ (Chain of Death)। মূলত বাঁকুড়া ও বীরভূম অঞ্চলে আমরা মৃত্যুলতা দেখি। সেই নিরিখেও রাজরাজেশ্বর অনন্য। এখানে বেশ কিছু অংশে এই কৌনিক ফলকগুলি দেখা যায়। গবেষকদের ভাষায়, এটি জীবনের নশ্বরতার প্রতীক। এখানে সকলে সকলকে হত্যায় রত। অর্থাৎ রাজা থেকে প্রজা, জন্তু থেকে মানব—মৃত্যুর অমোঘ ঘাতে কারোর রেহাই নেই। 

মন্দিরের প্রধান আরাধ্য কষ্টিপাথরের সুবিশাল শিবলিঙ্গ। এটিই ‘রাজরাজেশ্বর’ নামে পরিচিত। মহাদেব এখানে নিত্য পুজিত। প্রতিদিন নিয়ম করে ঢালা হয় জল। এছাড়া শিবরাত্রি, নীল পুজা, চৈত্র সংক্রান্তি ও শ্রাবণের সোমবারগুলোয় ভক্তদের ভিড় হয় লক্ষণীয়।

তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মন্দিরটি বর্তমানে ধুঁকছে। কয়েক জায়গার অবস্থা বেশ শোচনীয়। জরাজীর্ণ শিখরে ও দেওয়ালে জন্মেছে আগাছা। ফাটল, যত্রতত্র পেরেক সংযোজন- ক্রমশ দুর্বল করে চলেছে প্রাচীন গঠনবিন্যাস। ফলত অবিলম্বে এর সংরক্ষণ প্রয়োজন।

রাজরাজেশ্বর শিব মন্দির বাংলার শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে। তাই অতীত গৌরবের এই স্মারকটিকে রক্ষা করা কেবল প্রশাসনের নয়, সাধারণ মানুষেরও সমান দায়িত্ব। সঠিক সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এই মন্দিরটি হুগলি জেলার পর্যটন মানচিত্রে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে বলে আমাদের স্থির বিশ্বাস।

__________
তথ্যসূত্র: 
১। Temple Terracotta of Bengal/ Prodosh Dasgupta
২। হুগলি জেলার পুরাকীর্তি/ নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য 
৩। পশ্চিম বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্য: মন্দির ও মসজিদ/ তারাপদ সাঁতরা 
কৃতজ্ঞতা: তন্ময় ভট্টাচার্য, দেবাশিস মুখোপাধ্যায় ও অর্ঘ্যকমল পাত্র

Developed by DXDasia