অভিনব ‘হেরিটেজ ওয়াক’ : গন্তব্য শ্রীরামপুরের হেনরি মার্টিন প্যাগোডা

মুকুট তপাদারের লেখা ও ছবিতে শুরু হল হুগলির ‘হেরিটেজ ফটো ওয়াক’

লকাতার হেরিটেজ নিয়ে বহু কথা হয় যার অনেকটাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের সঙ্গে যুক্ত। তাই আজকের বাংলা-রেনেঁসা নিয়ে কথা বললে ব্রিটিশ যোগাযোগের কথাই বারে বারে চলে আসে। কিন্তু সেখানে গঙ্গার পশ্চিম পাড় অবহেলিত থেকে যায়। সময় এসেছে গঙ্গার পশ্চিম পাড়কে নতুন আলোতে নতুন ভাবে দেখার। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে উইলিয়াম কেরি, মিশনারিদের ছাপাখানা, ডাচ উপনিবেশ, ফরাসডাঙা, ডেনিসদের উপনিবেশ নগরী, মাহেশের রথ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বাংলার প্রথম ব্যাকরণ বই-সহ আরও কতো কতো স্মৃতি। বাংলার এই সমৃদ্ধ ইতিহাস আজকের হেরিটেজ তালিকায় একদম প্রথম সারিতে। সেই কারণেই গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে বেড়ে ওঠা শ্রীরামপুরের (Serampore) ঔপনিবেশিক চর্চা ও বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে একটি হেরিটেজ ফটো ওয়াকের (Photo Walk) প্রয়াস। ছুঁয়ে দেখা এসব ইতিহাসের ঠেক। ফটো ওয়াকটি আয়োজিত হয়েছিল গত ২৬ জুন, রবিবার।

আমাদের গন্তব্য হুগলি জেলার (Hooghly District) ব্যস্ত জনপদ, শ্রীরামপুর। হাওড়া-বর্ধমান মেইন লাইনের অষ্টম স্টেশন। আজকের ঝাঁ চকচকে শহরের অন্দরে রয়েছে ইতিহাসের ছড়াছড়ি। ১৭৫৭ সালে দিনেমাররা ডেনমার্কের তৎকালীন রাজা পঞ্চম ফ্রেডরিকের  নামানুসারে এই শহরের নাম রেখেছিলেন ফ্রেডরিক নগর। সেকালের ফ্রেডরিক নগর নাম বদলে আজ শ্রীরামপুর শহর। বিশপ হেবার ফ্রেডরিক নগর সম্পর্কে বলেছিলেন যে, এই শহরটি কলকাতার চেয়েও বেশি ইউরোপীয়। পরবর্তীতে মনে করা হয় এখানকার দে স্ট্রিটের ওপর শেওড়াফুলির রাজার নির্মিত বহু পুরোনো একটি রাম সীতার মন্দির থেকে এই জায়গার নাম হয় শ্রীরামপুর। যদিও এ নামকরণ নিয়ে মতান্তরও রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

“খৃষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ভিন্ন নাইরে ভাই। শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে এ-ও কোথা শুনি নাই।” — এ কথা যেন মিলেমিশে যায় হেনরি সাহেবের প্যাগোডায়।

হেরিটেজ ফটো ওয়াকের (Heritage Photo Walk) প্রথম পর্বে রইলো শ্রীরামপুরের সবচেয়ে পুরোনো জায়গা বল্লভপুরের ভাঙা মন্দিরের কথা। পুরাতন সেকেলে মন্দিরের ভেঙে পড়া থেকেই লোক মুখে এ মন্দির ‘ভাঙা মন্দির’ নাম নিলেও আজ অবশ্য প্রাচীন মন্দিরের গায়ে খানিক পালিশ হয়েছে। সাবেকিয়ানাকে ধরে রেখেই সারাই করা হয়েছে মন্দিরটির। এখন এর পোশাকি নাম হয়েছে ‘হেনরি মার্টিন প্যাগোডা’ (Henry Martin Pagoda)। 

…সেই কবে কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি গেয়েছিলেন “খৃষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ভিন্ন নাইরে ভাই। শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে এ-ও কোথা শুনি নাই।” — এ কথা যেন মিলেমিশে যায় হেনরি সাহেবের প্যাগোডায়। ১৬৭৭ সালে গঙ্গা নদী তীরে আটচালার মন্দির নির্মাণ করে পূজা শুরু হয় রাধাবল্লভ জিউ -এর। কথিত আছে, রাধাবল্লভের নামেই অঞ্চলটির নাম হয় বল্লভপুর। এখন যে জায়গাতে এই প্যাগোডা সেখানে রুদ্ররাম নামের এক পণ্ডিত কৃষ্ণের আরাধনা করে তার দর্শন পেয়েছিলেন। তাঁর আরাধ্য দেবতা নির্দেশ দেন, গৌড়ের রাজপ্রাসাদ থেকে একটি শিলা সংগ্রহ করে এই স্থানে তার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে নিত্য পূজা আরম্ভ করতে। সেই নির্দেশ মতো রুদ্ররাম পণ্ডিত উপস্থিত হন গৌড়ে। তিনিই বাদশাহকে রাজি করিয়ে তাঁর কাছ থেকে এখানে নিয়ে আসেন সেই শিলাটি। সেই শিলা থেকে তিনটি মুর্তি নির্মাণ হয়। প্রথমটি শ্রীরামপুরের রাধাবল্লভ, দ্বিতীয় খড়দহের শ্যামসুন্দর এবং তৃতীয়টি সাঁইবনার নন্দদুলাল। এরপর নদীর ভাঙন শুরু হলে বল্লভপুরের রাধাবল্লভ মন্দিরের বিগ্রহ অন্যত্র সরানো হয়। প্যাগোডা থেকে খানিক দূরেই তৈরি হয় নতুন মন্দির। মানুষের ভক্তিতেই দেবতার বিরাজ। আর সেই ভক্তির জোরেই আজও মাঘী পূর্ণিমার দিন হাজার হাজার জন সমাগম হয় এই মন্দিরে। মানুষের বিশ্বাস, এক দিনে তিন ভাইকে একসাথে দর্শন করলে পূণ্য সঞ্চয় হয় এমনকি পুনর্জন্মও হয় না।

দেবতা চলে গেলেন যখন তখন আর ভক্ত কেন আসবেন পুরোনো থানে, তাই গঙ্গা পাড়ে তখন একাকী পরে রইলো ভাঙা মন্দির। ১৮০৩ সালে ডেভিড ব্রাউন সাহেব কিনে নিলেন ওই পরে থাকা মন্দিরটি। এবং ইংল্যান্ডের পাদ্রী হেনরি মার্টিন সাহেবকে সেখানে থাকতে ও খৃষ্ট ভজন করতে অনুমতি দিলেন। জনবসতি থেকে বেশ কিছু দূরে এই জায়গায় হেনরি সাহেব নিশ্চিন্তে যিশুর ভজনা করতে লাগলেন। একটা সময়ের পর সাহেব দেশে ফিরে গেলে ঝোপঝাড়ের ভিতরে আবারও একাই পড়ে রইলো জায়গাটি। বলা হয়, এটাই শ্রীরামপুরের প্রথম গির্জা। ইতিহাসের অদ্ভুত মহিমায় এখানে মিলেমিশে যায় হিন্দু এবং খ্রিস্ট ধর্ম। প্রমাণিত হয় সত্যিই “খৃষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ভিন্ন নাই।”

এই প্যাগোডা সম্পর্কে মার্টিন সাহেব লিখেছেন, “My habitation assigned to me by Mr. Brown is a Pagoda in his grounds, on the edge of the river. Thither I retired at night and really felt something like superstitious dread, at being in a place once inhabited as it were by devils.”

আজও প্যাগোডাটি নির্জন স্থানে অতীতের স্বাক্ষর হয়ে টিকে আছে। নানা টানাপোড়েন সামলে ১৮৯৩ সালে ওই জমি কিনে নেয় হাওড়া ওয়াটার ওয়ার্কস সংস্থা। তারপর থেকে দীর্ঘ দিন ধরে এই আলয়টি ভাঙাচোরা জীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে। সম্প্রতি শ্রীরামপুর পৌরসভার তরফে এটিকে সংস্কার করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী প্রাচীন এই আলয় কিছুটা হলেও ফিরে পায় তার হারানো গুরুত্ব। উত্তাল গঙ্গা, বাতাসের ঝলকানি আর সবুজের সমারোহ এসবের মধ্যেই হেনরি মার্টিন প্যাগোডা, এ যেন প্রকৃত অর্থেই ‘চোখ জুড়ানো’ অনুভূতি।

চলবে…

Developed by DXDasia