
বাংলার অন্যতম প্রাচীনতম এই হুগলি-মাহেশের রথযাত্রা
হুগলি জেলার ব্যস্ততম শহর শ্রীরামপুর। আধুনিকতার সবটুকু পরশ মেখে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিচ্ছে তিলোত্তমার সঙ্গে। শপিং মল, নামী-দামী দোকান, আলোর রোশনাই, ভিড়ভাট্টা সবকিছু নিয়ে রীতিমতো জমজমাট আজকের শ্রীরামপুর। এখানে পা দিলেই শুরু হয় টাইম ট্রাভেল। কয়েকশো বছর পেরিয়ে এসে আজও সজাগ শহরের প্রতিটা ইঁট-কাঠ-পাথর। ঐতিহ্যের কোনও এক পিছুটান গ্রাস করে বসে আমাদের, তার রেশ ধরে আমাদের নিয়ে যায় দিনেমারদের আস্তানায় – মাহেশে।
এ শহরের পাশ দিয়ে গঙ্গার পাড় ঘেঁষে বয়ে চলে ইতিহাস। এক আধটা বছরের নয়, ৬২৬ বছরের ইতিহাস। জি. টি রোডের ধারে সারাবছর ধরে অপেক্ষা করা ওই লাল রঙা রথটাতে আরও একবার টান দেওয়ার পালা। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমবেত টানে দিব্যি তরতরিয়ে এগিয়ে চলবে ৫০ ফুট উচ্চতার চারতলা এই রথটি। জগন্নাথ দেব পৌঁছাবেন তাঁর মাসির বাড়ি। প্রাচীনত্ব এবং জনসমাগমের দিক থেকে পুরীর পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা হয় মাহেশে। করোনার জেরে গত দুবছর ধুমধাম হয়নি এ যাত্রায়, তবে এবছর আবার পুরোনো ছন্দে মাহেশের রথযাত্রা।
১৫১০ সালে এক সাধক ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী জগন্নাথ দর্শনে আসেন পুরীধামে। স্বহস্তে ভোগ নিবেদন করার বাসনা তাঁর। কিন্তু পুরীর পাণ্ডারা তাঁকে ভোগ দিতে দিলেন না। পরে ধ্রুবানন্দ স্বপ্নাদেশ পেলেন বাংলায় ফিরে এসে জগন্নাথ দেবের মন্দির স্থাপনের। হুগলি নদীর ধারে মাহেশ (বর্তমানে যা হুগলি জেলার শ্রীরামপুর শহরের অন্তর্গত) নামে এক জায়গায় স্থাপন করলেন ইতিহাস প্রসিদ্ধ ‘মাহেশের মন্দির’।
কোভিড পরবর্তী সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে এবছর অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও রয়েছে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট মূল্যের প্রণামী দিয়ে কুপন কাটলে বাড়ি বাড়ি ক্যুরিয়ারে পৌঁছে যাবে ভোগ-প্রসাদ।
ভাগীরথী নদীতে ভেসে আসা নিম কাঠ থেকে নির্মিত হয়েছিল মাহেশের জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা মূর্তি। ইতিহাস বলে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর একবার নবদ্বীপ থেকে পুরী যাওয়ার পথে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব এই মাহেশের মন্দিরে আসেন। পুরীর মন্দির প্রসঙ্গে কথিত ছিল ‘নীলাচল’ নামটি। মাহেশের মন্দির দেখে মুগ্ধ মহাপ্রভু এই মন্দিরের নাম দেন ‘নব নীলাচল’। কালের গতিতে ভাগীরথীর পশ্চিম পাড় ভাঙ্গতে থাকায় মন্দিরের গর্ভগৃহটি নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়। সেইসময় কলকাতার এক বিত্তবান ব্যবসায়ী নয়নচাঁদ মল্লিক গঙ্গার পাড় থেকে মন্দির সরিয়ে নিয়ে আসেন মাহেশের রাজপথ অর্থাত্ জিটি রোডের ওপরে। আজও সেখানেই স্বমহিমায় রয়েছেন জগন্নাথ। রয়েছে তাঁর বার্ষিক ভ্রমণের রথটিও।
ধ্রুবানন্দের প্রতিষ্ঠিত সেই পুরোনো বিগ্রহ পূজিত হলেও, রথের ইতিহাস খানিক ভোল বদলের কথা বলে। মাহেশের প্রথম রথটি নির্মাণ করেন এক মিষ্টি ব্যবসায়ী, ১৭৫৪ সালে। যদিও নানা সংস্কারে জর্জরিত হওয়ায় সে রথ বদলের প্রয়োজন পড়ে। মন্দিরের এখনকার রথটি দান করেন জমিদার কৃষ্ণরাম বসু। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হুগলি জেলার তৎকালীন দেওয়ান ছিলেন শ্যামবাজারের এই ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগেই লোহার ওপর কাঠের প্রলেপ দেওয়া পাঁচটি চূড়া বিশিষ্ট এই রথ তৈরি করে বিখ্যাত মার্টিন বার্ন কোম্পানি। এই লোহার রথটির ওজন ১২৫ টন। ৫০ ফুট উচ্চতার চারতলা এই রথটির নির্মাণে খরচ পড়েছিল প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। রথের এক-একটি তলা আলাদা আলাদা পুরাণকথা বলে। কৃষ্ণলীলা, চৈতন্যলীলা, রাসলীলার ছবি আঁকা আছে রথের দেওয়ালে। রথের সামনে রয়েছে তামার ঘোড়া এবং কাঠের সারথি। বিশাল তামার ঘোড়া দু’টি বানিয়ে দেয় জয় ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। রথ চলাচলের জন্য তৈরি হয় চওড়া রাস্তা। বর্তমানে এই রথটির আর্থিক মূল্য প্রায় কয়েক কোটি টাকা। এখনও নিয়ম করে রঙ করে জৌলুস ধরে রাখা হয়েছে প্রাচীন রথটির। শুধু রথ উৎসব নয়, বছরের অন্যান্য উৎসবেও আলোয় মুড়ে ফেলা হয় রথটিকে।

স্নানযাত্রার দিন দু'মণ দুধ আর ২৮ ঘড়া জলে স্নান করার পর ধুম জ্বর আসে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার। জ্বর সারাতে ডাক পড়ে গোঘাট, আরামবাগ আর ঘাটালের তিন করিরাজের। জ্বর সারতে লেগে যায় প্রায় পনেরোটা দিন। এ কদিন রীতিমত কোয়ারেন্টাইন চলে তিনজনের। রোজদিন দুধ-সাবু খেয়ে থাকেন ভগবান। এরপর রথযাত্রার আগের দিন জ্বর সেরে চাঙ্গা হন, এইদিনই হয় ‘নবকলেবর’ উৎসব। যদিও পুরীর মন্দিরের মতো এখানে প্রতিবছর নতুন কাঠ দিয়ে বিগ্রহ নির্মাণ করা হয় না, প্রাচীন বিগ্রহে নতুন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়।

রথের দিন সুসজ্জিত রথে চেপে জগন্নাথ দেব মাসির বাড়ির দিকে রওনা দেন। মাসি মানে জগন্নাথ দেবের পৌর্ণমাসি গুণ্ডিচা দেবী। প্রথমে চাতরায় মাসির বাড়ি ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে পাথুরিয়াঘাটার মতিলাল মল্লিকের স্ত্রী রঙ্গমণি দেবী বর্তমান জি.টি. রোডের ধারের ‘মাসির বাড়ি’টি নির্মাণ করেন। কাঁসর, ঘণ্টা, বিউগল সহযোগে অগণিত ভক্ত টান দেন রথের রশিতে। এইদিন পুণ্যলাভের আশায় দূরদূরান্ত থেকে ভক্তের ঢল নামে। জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা পৌঁছে যান তাঁদের মাসির বাড়ি। টান শেষ হয় বন্দুকের গুলির শব্দে। এখানেই থাকেন সপ্তাহ খানেক। তারপর আবার উল্টোরথের দিন একইভাবে ফিরে আসেন নিজগৃহে।
আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে, ১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারানি’ উপন্যাসে এই রথের মেলার বিবরণ রয়েছে। এই রথকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই বসে বিশাল মেলা। মনোহারী থেকে খাবারের দোকান কিংবা ফুলের গাছ হরেকমালের মেলা। এছাড়াও থাকে নানারকমের রাইড, রাস্তার ধারে থাকে বিশাল নাগরদোলা। মাহেশের রথের মেলায় এসে জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা না খেলে নাকি আগমন পূর্ণই হয় না। জি.টি রোডের ধারে বসে জিলিপি পাঁপড়ের দোকান। একমাস ধরে চলে মেলা। কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণ নাকি এসেছিলেন এই মেলায়। যদিও শ্রীরামপুরের পু্রোনো বাসিন্দারা সকলেই বলেন, এই মেলার আড়ম্বর এখন আগের থেকে অনেক কমে গেছে। কিন্তু পুলিশকর্তারা বলেন অন্য কথা। ভগবানের টান আর পুণ্যলাভ এই দুইয়ের চাপে ভিড় সামলাতে এখনো প্রতিবছর জেরবার হন তাঁরা।
কোভিড পরবর্তী সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে এবছর অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও রয়েছে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট মূল্যের প্রণামী দিয়ে কুপন কাটলে বাড়ি বাড়ি ক্যুরিয়ারে পৌঁছে যাবে ভোগ-প্রসাদ। তবে চাইলে অফলাইনে অর্থাৎ সশরীরেও পোঁছে যেতে পারেন ইতিহাসের দোরগোড়ায়।

কলকাতার খুব কাছেই মাহেশ। হাওড়া থেকে ব্যান্ডেলগামী লোকাল ট্রেনে অষ্টম স্টেশন শ্রীরামপুর। স্টেশনে নেমেই মিলবে টোটো, অটো অথবা রিক্সা। তাতে চেপে সোজা চলে আসতে পারেন মাহেশে জগন্নাথ দেবের আস্তানায়। নিজের চোখে ঘুরে দেখতে পারেন রথের অসাধারণ নান্দনিক গড়ন, মন্দিরের গর্ভগৃহ, মাসির বাড়ি এবং বিখ্যাত রথের মেলা। ৬২৬ বছরের পুরোনো কাঠের মূর্তিতে জীর্ণতার কোনো চিহ্ন নেই। কোন এক অলৌকিক জাদুবলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও ভারী হচ্ছে মূর্তিটি। কলকাতা থেকে দিনের দিন মাহেশে গিয়ে, আবার ফিরে আসা যায়। জিলিপি, পাঁপড় -এ কামড় দিতে দিতে একদিনের সফর মোটেই বৃথা যাবে না। হাতে খানিকটা সময় থাকলে ফেরার পথে ড্যানিশ মিউজিয়ামটিও ঘুরে নিতে পারেন। গঙ্গার স্নিগ্ধ হাওয়া মেখে দিনেমারদের শহরের গন্ধে মন ভরে যাবেই।
