রথ নয়, এই গ্রামে ভক্তদের কাঁধে চড়ে মাসির বাড়ি যান জগন্নাথদেব

উনিশ শতক থেকে চলছে এমন প্রথা

রথযাত্রা বাঙালির এক প্রধান উৎসব। ভারতের অন্যান্য প্রান্তের মতো এই রাজ্যের অধিবাসীরাও রথের দিনে আনন্দে মেতে ওঠেন। বৃষ্টিবাদল সেই আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে না। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে রথে বসিয়ে অগণিত মানুষ রথ টেনে নিয়ে যান। রথের সজ্জাও নানা রকম, তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। তবে, বাংলারই এক গ্রাম রয়েছে, যেখানে জগন্নাথদেবকে রথে চড়ানো হয় না। ভক্তরাই কাঁধে করে তাঁকে পৌঁছে দেন মাসির বাড়ি।

জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা

মন্দিরের অভ্যন্তর

বলরাম 

সুভদ্রা

পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি গ্রামে এমন প্রথা চলে আসছে উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে। লোকমুখে কথিত আছে, এই গ্রামের জমিদার পদ্মলোচন দত্ত এক গ্রীষ্মের সন্ধেয় প্রজাদের সুখদুঃখ নিজের চোখে দেখার জন্য বেরিয়েছিলেন। এমন সময়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। জমিদার তখন বাধ্য হয়ে গগনেশ্বর গ্রামের কুরুমবেড়া দুর্গে আশ্রয় নেন। দুর্গটি ছিল পরিত্যক্ত। কৌতূহলের বশে পদ্মলোচন এই ভগ্নপ্রায় দুর্গ ঘুরে দেখতে থাকেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ে একটি বন্ধ দরজা। যদিও বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল, তা সত্ত্বেও ধাক্কা দেওয়া মাত্র সেটি খুলে যায়। পদ্মলোচন অবাক হয়ে দেখেন, ভিতরে রয়েছে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার বিগ্রহ।

জগন্নাথদেবের মন্দির 

মাসির বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি 

ভক্তদের কাঁধে জগন্নাথদেব

চলেছেন দেবী সুভদ্রা

বলভদ্র চলেছেন মাসির বাড়ি

পদ্মলোচন তারপর গ্রামবাসীদের ডাকেন। কিন্তু সেই কাঠের বিগ্রহগুলি সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারে না কেউই। যে ঘরে মূর্তিগুলি রাখা ছিল, সেটিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন পদ্মলোচন। কীভাবে মূর্তিগুলি সেখানে এল, তার কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। জমিদারের মনে হয়, জগন্নাথদেব তাঁর থেকেই পুজো চাইছেন। গ্রামবাসীদের সাহায্যে তিনি মূর্তিগুলি কেশিয়াড়ি নিয়ে আসেন। একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মূর্তিগুলি স্থাপন করেন। এখনও দত্ত পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠাভরে জগন্নাথদেবের পুজো করে চলেছেন। 

প্রতি বছর রথের দিন এখানে বিশেষ পুজো হয়। তারপর এক এক করে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার বিগ্রহ কাঁধে তুলে পুরোহিতরা প্রায় ৫০০ মিটার পথ অতিক্রম করে ‘মাসির বাড়ি’ পৌঁছে দেন। ভোগ বিতরণ করা হয়ে সব গ্রামবাসীকে। বাইরে থেকে যেসব দর্শনার্থী সেদিন কেশিয়াড়ি গ্রামে যান, তাঁরাও প্রসাদ পেয়ে থাকেন। জীবনে অনেক জায়গাতেই রথযাত্রা দেখেছি, তবে এই গ্রামের রথ উৎসব সত্যিই অনন্য। আজও আমার মনে কেশিয়াড়ি গ্রামের রথযাত্রার স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে। 

মাঠ পেরিয়ে যাত্রা শেষ হবে

অংশ নিয়েছেন গ্রামবাসীরাও

প্রসাদ বিতরণ

গ্রামবাসী-সহ প্রত্যেক দর্শনার্থীকে ভোগ বিতরণ করা হয়  

Developed by DXDasia