
রাধারমণ বলেন, “লড়াই থামেনি, এখনও অনেক লড়াই”
বাবা ছোটো থেকেই নেই। মামাবাড়িতেই মানুষ। সেই সময় বহু উপেক্ষার শিকার হয়েছেন। একবার একদল ছেলে তাকে খুব মারধর করেছিল। খুব ছোটোবেলায় এরকম মারধর খেয়ে তিনি শপথ নিয়েছিলেন, “আমি তোমাদের মারধরের জবাবে এমন কিছু শিখব, যা দিয়ে তোমাদের ভবিষ্যতে শিক্ষা দিতে পারি।”
কিন্তু কীই বা শিখবেন! একে তো আর্থিক সঙ্কট তারপর আবার অপুষ্টিতে আক্রান্ত। কিন্তু না, হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। “যারা আমায় বারবার মেরেছে, তাদের কিছু শিখে শিক্ষা দিতেই হবে।” তাঁর বয়স তখন আট বছর। শিলিগুড়ি ছেড়ে চলে যান কলকাতায়। কখনও হোটেলে বাসন মাজার কাজ, কখনও চায়ের দোকানে কাপ প্লেট ধোয়ার কাজ। আবার কখনও বাস কর্মী। কাজ করতেন পেটের টানে। কিন্তু সেইসব নির্যাতনকারীদের শিক্ষা দিতে হলে তো কিছু শিখতে হবে। কলকাতা লেকগার্ডেন এলাকায় ভর্তি হয়ে গেলেন তাইকুন্ড আর ক্যারাটে শেখার জন্য। লড়াই আর লড়াই। ফাইট, রাধারমণ ফাইট – মনের মধ্যে কেউ একজন ডাকে, উৎসাহ দেয় সবসময়। তাই কখনও কলকাতা থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে কাঠমাণ্ডুতে ছোটাছুটি। সেখানেও কখনও লোকের বাসন মাজা বা সাউন্ড সিস্টেমের দোকানে সামান্য কর্মী। তাইকুন্ডর সঙ্গে ক্যারাটে, কিক বক্সিং, মার্শাল আর্ট শেখা। শরীরে অন্যরকম শক্তি সঞ্চয়। কিন্তু সেসব শিখতে গিয়ে তিনি শিখলেন, তাইকুন্ড, ক্যারাটে, মার্শাল আর্ট, কিক বক্সিং এসবই নিজেকে আত্মরক্ষার জন্য। অন্যের ওপর অকারণে হামলা বা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়। যারা তাঁকে ছোটোবেলায় উপেক্ষা করে শুধু বারবার হামলা চালিয়েছে, তাদের কিছু বুঝিয়ে দিতেই হবে। দিনরাত এক করে চলতে থাকে লড়াই। শুধু ফাইট আর ফাইট।

পুরস্কার হাতে রাধারমণ রায়
হ্যাঁ, লক্ষ্য স্থির রেখে সৎভাবে সংগ্রাম চালিয়ে গেলে ফল তো আসবেই। গতবছরই ১ ও ২ নভেম্বর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক তাইকুন্ড প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলে তাতে রাশিয়া, কম্বোডিয়া, হংকং-সহ পৃথিবীর পাঁচটি দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে দুটি ইভেন্টে ভারতের হয়ে সোনা ও ব্রোঞ্জ জিতে এসেছেন তিনি। তাছাড়া রাশিয়ার নাম মুছে দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট ফাইটার হিসাবেও তিনি ভারতের নাম সোনার অক্ষরে লিখে দিয়ে এসেছেন সেই আন্তর্জাতিক আসরে।
হামলাকারীদের যে শিক্ষা তিনি দিতে চেয়েছিলেন, তা পেরেছেন। শিলিগুড়ি দেশবন্ধুপাড়ার ২৭ বছরের তরুণ রাধারমণ রায় তাই এখন বহু তাইকুন্ড ও ক্যারাটে শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনুপ্রেরণার বিষয়। বাবা নেই। মা পার্বতী রায় তাঁকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন দেশবন্ধু পাড়ার মামাবাড়িতে। ছেলেকে বড়ো করতে পার্বতীদেবীকে কখনও বাড়ি বাড়ি ফিনাইল ফেরি করতে হয়েছে, কখনও কেরোসিন তেল বিক্রি করতে হয়েছে। মা আর কত কষ্ট করবেন, তিনিইবা আর কত অবহেলা নির্যাতনের শিকার হবেন। তাই নিজেই শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা, দিল্লিতে ছোটাছুটি আর লড়াইকে মাত্র আট বছর বয়সেই সঙ্গী করে নেন রাধারমণ।
আজ তাঁর কাছে আছে তাইকুন্ডর আন্তর্জাতিক শিরোপা। পৃথিবীর দশ জনের মধ্যে একজন মার্শাল আর্টের শিরোপাও তাঁর হাতে। আবার ক্যারাটেতেও আছে বিশেষ কিছু পুরস্কার। রাধারমণ বলেন, “লড়াই থামেনি৷ এখনও অনেক লড়াই। বহু গরিব দুঃখীকে দেখি, ক্যারাটে শিখতে আসে। কিন্তু তাদের পোশাক পর্যন্ত নেই। আমি চাই, এরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাক। বাংলা তথা দেশের নাম আরও উচ্চতায় নিয়ে যাক।”
শিলিগুড়ির এনজেপি গেটবাজার, মাটিগাড়া, শান্তিনগর আমতলায় ক্যারাটে ইত্যাদি শেখান রাধারমণ। শিলিগুড়িতে ক্যারাটে, তাইকুন্ড, মার্শাল আর্ট প্রভৃতি শেখানোতে পরিকাঠামোর অনেক অভাব। অনুশীলনের জন্য ঘর, ম্যাট প্রভৃতি দরকার। ম্যাট না থাকায় ঘাসের ওপরই ছেলেমেয়েদের অনুশীলন করানো হচ্ছে। আর ঘাসও এখন সেভাবে নেই। ফলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেইসব খেলার গুণগত মানের উন্নতি করা যাচ্ছে না। তাদের বডি ব্যালান্সিং ঠিক হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক খেলায় ম্যাটের ওপরই পারদর্শিতা দেখাতে হয়। আর ম্যাটে পারদর্শিতা দেখাতে গেলে ম্যাটেই অনুশীলন করে বডি ব্যালান্সিং করতে হয়।
রাধারমণের আগামিদিনের লড়াই আরও অনেক। থাইল্যান্ড যেতে দরকার হয় এক লাখ টাকা। সেই টাকা শিলিগুড়ির উত্তম কুমার সাহা, জ্যোৎস্না আগরওয়ালা, ধীরাজ বসুরা কিছু কিছু করে যেমন দেন, তেমনই কিছু টাকা ঋণ নিতে হয়। এখনও অর্থ সংকট তাঁর পিছু ছাড়েনি। ক্যারাটে শিখিয়ে কিছু টাকা হাতে আসে। ঘর ভাড়া দিয়ে থাকতে হয় দেশবন্ধুপাড়ায়। কষ্ট করে স্নাতক হয়েছেন। ইচ্ছে আছে অলিম্পকে যোগ দিয়ে কিছু করে দেখানো। আর তার জন্য অনুশীলন আরও বেড়েছে। রাধারমণরা হারতে জানেন না। জীবনের জেদ এবং একাগ্রতা তাঁদের পৌঁছে দেবে শীর্ষে। একেবারে শীর্ষে। বিশ্বের দরবারে বাংলার নাম উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে।
ছবি- প্রতিবেদক
