এই সংস্থার সদস্যরা নৌকায় চেপে কয়েকপ্রস্থ খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন গাজলডোবার মাঝিপাড়ায়
লকডাউনের জেরে সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ। ফলে বাংলা জুড়ে নানারকম সংকটের ছবি উঠে আসছে। শিলিগুড়ি শহর লাগোয়া গ্রামগুলোর বহু মানুষও অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। কোথাও একটু ত্রাণ বা রান্না করা খাবার বিলি হচ্ছে খবর পেলেই থালাবাটি নিয়ে ত্রাণ সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। কবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা এখনও কেউ বলতে পারছেন না। তবে আপাতত ত্রাণ সংগ্রহের ছবি বড্ড বেদনাদায়ক হয়ে উঠছে গ্রামগুলোতে। সরকার রেশনে খাদ্য সামগ্রী দিচ্ছে। এর পাশাপাশি এগিয়ে আসছেন বহু সাধারণ মানুষ। আবার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ত্রাণের খবর পেলেই লাইনে দাঁড়ানোর জন্য ছুটছেন অনেকে।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো এই লকডাউনে বিভিন্ন ভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে নৌকায় চেপে গাজলডোবার মাঝিপাড়াতে ইউনিক ফাউন্ডেশন টিমের ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। লকডাউনের জেরে গাজলডোবায় কোনও পর্যটক নেই। ফলে বিপাকে পড়েছেন তিস্তার মাঝিরা। একদল মাঝি সারা বছর ধরে নৌকায় পর্যটকদের চাপিয়ে গাজলডোবার তিস্তা ও প্রাকৃতিক দৃশ্য ঘুরিয়ে দেখান। আর এতে তাদের কিছু রোজগারও হয়। কিন্তু এখন লকডাউনের জেরে পর্যটক আসা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। ফলে অর্ধাহার বা অভুক্ত থাকা বহু মাঝির কাছে নিত্যকার ঘটনা। খবর পেয়ে শিলিগুড়ি থেকে ইউনিক ফাউন্ডেশন টিমের সদস্যরা নৌকায় চেপে কয়েকপ্রস্থ খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন গাজলডোবার মাঝিপাড়ায়। ইউনিক ফাউন্ডেশন টিমের সমাজসেবী শক্তি পাল জানিয়েছেন, তাঁরা মাঝেমধ্যেই গাজলডোবার মাঝিপাড়ায় এভাবে ত্রাণ পৌঁছে দেবেন। একইভাবে লকডাউনের সময় হাসপাতালে রক্তের সঙ্কট মেটাতেও তাঁরা করোনা সচেতনতা মেনে বাড়ি বাড়ি থেকে আগ্রহীদের রক্ত সংগ্রহ করে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে পৌঁছে দিচ্ছেন।
লকডাউনের সময় বিশেষ ডিজিটাল ফুড ব্যাঙ্ক তৈরি করেছেন উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লাগোয়া মেডিকেল মোড়ের বাসিন্দা এক দম্পতি— অনির্বাণ নন্দী ও তাঁর স্ত্রী পৌলমী চাকিনন্দী। ডিজিটাল বুক ব্যাঙ্কের মাধ্যমে তাঁরা ইতিমধ্যেই করোনা দুর্যোগ শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন মহলে সাড়া ফেলেন। এবার তাদের কাজ শুরু হয়েছে ডিজিটাল ফুড ব্যাঙ্ক ঘিরে৷ অনেক মানুষ অনলাইনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খাদ্য সামগ্রী জমা দিচ্ছেন। আর এই খাদ্য সামগ্রী আবার তারা বিভিন্ন চা বাগান ও বস্তিতে পৌঁছে দিচ্ছেন।

ডুয়ার্সের নাগরাকাটা ব্লকের সরকারি এএনএম সোনালি সামন্ত বেশ কিছুদিন আগে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েও সোনালি তাঁর সামাজিক ও মানবিক কাজ বন্ধ করেননি৷ বরঞ্চ এই লকডাউনের সময় সরকারি কর্তব্য পালনের পাশাপাশি সোনালিদেবী বন্ধ থাকা গ্রাস মোড় চা বাগানের অভুক্ত মানুষদের জন্য বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন। কয়েক দফায় সেই সব ত্রাণ তিনি পৌঁছে দিয়েছেন বন্ধ চা বাগানে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লাগোয়া কাওয়াখালি নিমতলা ও তার আশপাশে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়মিত ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন শিলিগুড়ি রাজবংশী রিপ মিনিস্ট্রির সমাজসেবী কৌস্তুভ দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী রোজলি দত্ত। কখনও কম্যুনিটি কিচেন, কখনও চাল, ডাল, সবজি তাঁরা প্যাকেট করে পৌঁছে দিচ্ছেন বিভিন্ন অভুক্ত মানুষের হাতে। ওয়েস্টবেঙ্গল ভলান্টারি হেলথ অ্যাসোসিয়েশন থেকে সমাজসেবী তরুণ মাইতি এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়মিত খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন লকডাউনের পর থেকে। তরুণবাবু জানিয়েছেন, লকডাউন শুরু হওয়ার পর চরম বেকায়দায় পড়েন এইচআইভি আক্রান্তরা। তাই তাঁরা এইসব প্রান্তিক মানুষদের নিয়মিত খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। লকডাউন শুরু হওয়ার আগে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লাগোয়া এলাকায় রাস্তার ধারে পড়ে থাকা অসহায় গরিব মানুষদের নিয়মিত খাবার পৌঁছে দিতেন আমরা বেকার সংগঠনের সদস্যরা। এখন এই লকডাউনের সময় আমরা বেকার তাদের পুরোনো সেবামূলক কাজ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিলি করছেন বলে সংস্থার তরফে সজল দত্ত জানিয়েছেন।

এসবের বাইরে আরও ক্লাব, সংস্থা নিয়মিত ত্রাণ বিলির কাজে নেমেছেন। বিশেষভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। বহু সংস্থা ত্রাণ সামগ্রী তুলে দিচ্ছে পুলিশের হাতে। পুলিশকর্মীরা আবার সেসব বিভিন্ন বস্তি এলাকায় গিয়ে বিলি করছেন। শিলিগুড়ি মহকুমার বিধাননগরে পুলিশ কর্মী বাপন দাস নিয়মিত এলাকার ভবঘুরেদের রান্না করা ফ্রায়েড রাইস, মাংস, চিকেন বিরিয়ানি বিলি করছেন।
