
কুড়ি বছর ধরে আদিবাসীদের হাতের কাজ শিখিয়ে স্বনির্ভর করছেন এই মহিলা
ওঁদের কেউ জঙ্গলে কাঠ কুড়াতো। কেউ আবার গাছ কাটাতেই মন দিত। কারও আবার নজর ছিল বন্য প্রাণী হত্যার দিকে। এখন ওঁরা একদম সেসবে নেই। বরং এখন বন ও বন্য প্রাণী রক্ষার জন্যই চেষ্টা করে। আর ওঁদের কাছে এখন বেঁচে থাকার বড়ো অস্ত্র গাছ কাটার করাত বা কুড়াল নয়, সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র হস্ত শিল্প। যদিও এই করোনা লকডাউনের জেরে সেই হস্ত শিল্পের কাজ বেশ কিছুটা থমকে গিয়েছে। কিন্তু তাঁরা হেরে যেতে রাজি নন। এই হস্ত শিল্পের পিছনে যিনি রয়েছেন তিনি একজন গৃহবধূ। নাম সরস্বতী বণিক। বাড়ি ডুয়ার্সের মালবাজারে। প্রকৃতপক্ষে রাজ্য বন দপ্তর মনোনীত একজন হস্তশিল্পের শিক্ষিকা এই সরস্বতীদেবী।
সরস্বতী বণিকের পাটের কাজ
ডুয়ার্সের গরুমারা জঙ্গলের চাপরামারি, লাটাগুড়ি, কালিপুর এলাকায় কুড়ি বছর ধরে বনবস্তির আদিবাসীদের হাতের কাজ শিখিয়ে আসছেন সরস্বতীদেবী। এই জঙ্গল থেকে সেই জঙ্গলে ঘুরে তিনি একদল মহিলাকে পাট-সহ অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে হাতের কাজ শেখান। দিনের পর দিন সরস্বতীদেবী বন জঙ্গলের সেই সব বাসিন্দাকে পরামর্শ দিয়ে আসছেন, বন ও বন্য প্রাণী ধ্বংসের দিকে মন না দিয়ে তোমরা হাতের কাজ শেখো। হাতের কাজ শিখলে তোমাদের হাতে দুটা পয়সা আসবে।
শুরুতে সে কাজ ছিল সরস্বতীদেবীর কাছে বেশ কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়েছে। বন বস্তির সেইসব বাসিন্দা বিশেষ করে মহিলারা জুট দিয়ে হাতি, ময়ূর, ব্যাগ-সহ আরও সামগ্রী তৈরি করে মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা রোজগার করছেন। সরস্বতীদেবী বলেন, এ কাজে বন দপ্তরের আধিকারিক বিমল দেবনাথ থেকে শুরু করে অন্য বন আধিকারিক এবং বন কর্মীরা তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সকলের প্রচেষ্টা সর্বোপরি রাজ্য বন ও বন্য প্রাণী দপ্তরের প্রচেষ্টায় এখন সেই সব বন বস্তির বহু বাসিন্দা স্বনির্ভর। তাঁরা বন ও বন্য প্রাণী ধ্বংস না করে মূল স্রোতে ফিরেছেন।
সরস্বতী বণিকের পাটের কাজ
তাঁদের হাতে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী ডুয়ার্স বেড়াতে আসা পর্যটকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় স্মারক হিসাবে। ডুয়ার্সের জঙ্গলে টিকিট কেটে যখন পর্যটকরা প্রবেশ করেন তাদের হাতে কার্যত উপহার হিসাবে বন দপ্তরের সেসব স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
সরস্বতী বণিকের পাটের কাজ
প্রকৃতপক্ষে টিকিট থেকে বনদপ্তর যে অর্থ সংগ্রহ করে, তা দিয়েই কিনে নেওয়া হয় ওই সব হস্তশিল্পের সামগ্রী। আদিবাসী বা অন্য বন বস্তির বাসিন্দাদের হাতে তৈরি সেই সামগ্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যটকদের ঘরে শোভা পাচ্ছে।
ছোটো থেকেই হাতের কাজ শেখার আগ্রহ ছিলো সরস্বতীদেবীর। বড়ো হয়েও সেই নেশা তিনি ছাড়তে পারেননি। একসময় এলাকার বহু মহিলাকে তিনি হাতের কাজ শেখাতেন। এরপর একদিন বিমল দেবনাথ-এর মতো অরণ্য প্রেমিক তথা বন-আধিকারিক তাঁর হাতের কাজ দেখে বনের বাসিন্দাদের হাতের কাজ শেখানোর কাজেে নিয়োগ করেন। বিমলবাবু এখন বনদপ্তরের জলপাইগুড়ি শাখায় এডিএফও হিসাবে কর্মরত। তিনি জানালেন, সবুজ বাঁচাতেই আসলে তাঁদের এই প্রচেষ্টা।
সরস্বতী বণিকের পাটের কাজ
এখন করোনা দুর্যোগ চলতে থাকায় সেভাবে জমায়েত করে সরস্বতীদেবী হাতের কাজ শেখাতে পারেন না বটে। তবে ফোনে তিনি সবসময় পরিচালনা করে যাচ্ছেন বন বস্তির বাসিন্দাদের। এরই সঙ্গে লকডাউনে ঘরবন্দি অবস্থায় সরস্বতীদেবী পাট দিয়ে নতুন নতুন হস্তশিল্পের কাজ করতে মগ্ন। তাঁর স্বামী দীপক বণিকও তাঁকে উৎসাহিত করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।
