বাড়ির ছাদের চৌবাচ্চায় মাছ চাষ করে হয়ে উঠলেন ‘মাছেদের ডাক্তার’!

নিজের বাড়িতেই আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত জৈব পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন পরিমল মজুমদার

ছোটোবেলায় জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ডাউকিমারি গ্রামে থাকার সময় কুমলাই নদী-সহ বিভিন্ন পুকুরে মাছ ধরতেন পরিমল মজুমদার। তারপর মাছ ধরার নেশা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। ৫৭ বছর বয়সে এসেও মাছের নেশা ছাড়তে পারেননি। তবে এখন আর ছোটোবেলার মতো বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন না, নিজেই বাড়ির মধ্যে একটা ট্যাঙ্ক তৈরি করে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেছেন৷ শুধু মাছ চাষই নয়, ট্যাঙ্কের মধ্যে কোনও মাছ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই মাছের চিকিৎসাও করছেন তিনি। আর অসুস্থ মাছের চিকিৎসার জন্য আলাদা একটি হাসপাতাল ট্যাঙ্কও তৈরি করে ফেলেছেন৷ পরিমলবাবুর এই আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত জৈব পদ্ধতির মাছ চাষের মাধ্যমে অর্থ রোজগারের কথা জানতে পেরে সিকিম-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেকার যুবকরা তাঁর কাছে মাছ চাষের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন।


পরিমল মজুমদার। বাড়ি জলপাইগুড়ি জেলার ফকদইবাড়িতে। শিলিগুড়ি ইস্টার্ন বাইপাসের কাছে ফকদইবাড়িতে বসে তিনি পুরোনো গাড়ির ব্যবসা করেন। কিন্তু নেশায় সেই মাছ। নেশা থেকেই তিনি ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বাড়ির মধ্যে আরএএস বা রিসাইক্লিকিং একোয়া কালচার সিস্টেমে শুরু করেন মাছ চাষ। কিন্তু সেই চাষে দেখলেন বিদ্যুৎ খরচ অনেক। জলকেও ফিল্টার করতে সমস্যা হত। অথচ ২০১৮ সালে ভারতে প্রবেশ করেছে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বায়ো ফ্লক পদ্ধতির মাছ চাষ। এই পদ্ধতির মাছ চাষ আবিষ্কার করেছিলেন ইজরায়েলের বিজ্ঞানী ইউরাম অভনিমেলে। সেই মাছ চাষের পদ্ধতি ইউটিউব দেখে এবং অন্যান্য পড়াশোনার মাধ্যমে জেনে নেন পরিমলবাবু। তারপর নিজের বাড়ির ছাদে ৪ ফুট উচ্চতার ১১ বাই ৬ ফুট আকারের চৌবাচ্চা বা ট্যাঙ্কার তৈরি করেন। তাতে তিনি কই, তেলাপিয়া, সিং, মাগুর, ট্যাংরা মাছ চাষ শুরু করেন। আর তাতে দারুণ সফল হন।

একটি দশ হাজার লিটার ট্যাঙ্কে ৫০০ থেকে ৫৫০ কেজি মাছ উৎপাদন সম্ভব চার মাসে। পরিমলবাবু ৬,৫০০ লিটারের ট্যাঙ্কে চার মাস আগে ৩,২০০ পিস কই মাছের চারা ছাড়েন। কিছু মাছ অসুস্থ হয়ে মারা যায়। কিছু মাছ তিনি বিক্রি করে দেন। এখনও বহু মাছ আছে ট্যাঙ্কে। ওই ট্যাঙ্ক তৈরি করতে খরচ হয়েছে ২৩ হাজার টাকা। এরপর মাছের চারা, মেশিন বসানো ইত্যাদি মিলিয়ে খরচ হয়েছে আরও ৩৮ হাজার টাকা। পরিমলবাবু জানান, এটা চার মাসের চাষ। চার মাসে চাষ করে মূল বিনিয়োগের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ লাভ হতে পারে।


নৈহাটিতে রয়েছে এশিয়ার অন্যতম বড়ো চারাপোনার বাজার। সেখান থেকে পরিমলবাবু মাছের চারা কিনে আনেন। দূর থেকে সড়ক যোগে মাছের চারাগুলো তাঁর বাড়িতে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন সেই ক্লান্ত মাছের চারাগুলোকে প্রথমে ভিটামিন ওষুধ এবং অ্যান্টিবায়োটিক খাইয়ে চাঙ্গা করেন। তারপর শুরু হয় চাষের বিভিন্ন প্রক্রিয়া। এই চাষের অঙ্গ হিসাবেই মধ্যপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসা হয় ব্যাসিলিয়াস গ্রুপের উপকারী ব্যাকটেরিয়া। সেই সব ব্যাকটেরিয়া আসে পাউডার ফর্মে। তখন ব্যাকটেরিয়াগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সজীব করার জন্য এফসিও বা ফর্মাটেড কার্বন অর্গানিক তৈরি করা হয়। চৌবাচ্চায় মাছের মলের সংস্পর্শে  এসে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রতি ত্রিশ মিনিটে দ্বিগুণ বৃদ্ধি হতে থাকে। চল্লিশ দিন পর আবার ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায়। তবে বেঁচে থাকার সময়ই ব্যাকটেরিয়াগুলো চৌবাচ্চার জলকে নাইট্রিফিকেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছ রাখতে সাহায্য করে। ব্যাকটেরিয়াগুলোর মূল খাদ্য হল মাছের মল। আর মাছের মল গ্রহণের পর জলের মধ্যেই ব্যাকটেরিয়াগুলো একরকম প্রোটিন সেল তৈরি করে যাকে ফ্লক বলে। সেই ফ্লক আবার মাছ খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। পরিমলবাবু সকাল, দুপুর, রাতে মাছগুলোকে চৌবাচ্চায় খাবার দেন। খাদ্য হিসাবে তিনি দেন ভুট্টার গুঁড়ো, সোয়াবিন, শুঁটকি মাছের গুঁড়ো ও কিছু ভিটামিন। খাবার দেওয়ারও কিছু পরিমাপ আছে। মাছের ওজন হিসাবে তা অঙ্ক করে স্থির করা হয়। বাইরে থেকে বাতাসের অক্সিজেন সংগ্রহ করা হয় মেশিনের সাহায্যে। সেই সংগৃহীত অক্সিজেন বিভিন্ন পাইপের মাধ্যমে যায় কিছু ছোটো ছোটো পাথরে। সেই পাথরের মাধ্যমে জলের মধ্যে বুদবুদ তৈরি হয়। জলের মধ্যে মাছেদের কাছে পৌঁছে যায় অক্সিজেন। অক্সিজেন নিয়ে ব্যাকটেরিয়াগুলোও তাদের বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে।


মাছেদের জন্য কোনও ডাক্তার না থাকলেও পরিমলবাবু নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগ করে মাছগুলোর চিকিৎসা করেন৷ হয়ে ওঠেন মাছেদের ডাক্তার। সুস্থ করে আবার মাছগুলোকে তিনি হাসপাতাল ট্যাঙ্ক থেকে মূল ট্যাঙ্কে নিয়ে যান। সিকিম-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেকার যুবকরা খবর পেয়ে এখন পরিমলবাবুর বাড়ি এসে এই জৈব পদ্ধতির মাছ চাষের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অনেকে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বনির্ভরও হতে শুরু করেছেন। পরিমলবাবু আমাদের জানান, এই বায়ো ফ্লক সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতির মাছ চাষ। বাজারে আজকাল যেসব মাছ পাওয়া যায় তার একটি বড়ো অংশে ফর্মালিন ব্যবহার করা হয়। এই মাছ খেয়ে মানুষের শরীরে বহু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া নদীনালা পুকুর থেকে মাছ ধরার সময় অনেক সময় ইলেকট্রিক, বিষ প্রয়োগ করা হয়। এতেও মানুষের ক্ষতি হয়। সেদিক থেকে চিন্তা করলে এই চৌবাচ্চার মাছ চাষ বেশ ভালো। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছও বেশ সুস্বাদু। এখন যেভাবে জনসংখ্যা এবং জনঘনত্ব বাড়ছে তাতে পুকুরজলাশয় কমে আসছে৷ অথচ মাছের চাহিদা বাড়ছে। তাই বায়ো ফ্লক পদ্ধতির মাছ চাষের তুলনা হতে পারে না বলে দাবি করেন পরিমলবাবু। বাড়ির ছাদ না থাকলে বাড়ির উঠোন, রান্নাঘর চার ফুট বাই চার ফুট জায়গা হলেই এই মাছ চাষ সম্ভব বলে তিনি জানান। শিক্ষিত বেকারদেরই তিনি এই চাষের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে আগ্রহী। 
 

Developed by DXDasia