
আমফান বিধ্বস্ত সুন্দরবনেও তাঁরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন
লকডাউনে দুঃস্থ অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে নানা জায়গায় সাধারণ মানুষেরা গড়ে তুলেছেন ছোটো ছোটো গোষ্ঠী। তাঁরা গরিবদের কাছে খাবার, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেন। আবার, এমন কিছু স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও রয়েছে, যারা অনেক আগে থেকেই সেবামূলক নানা কাজে ব্রতী। লকডাউন শুরু হওয়ার পর এঁরা সীমিত সাধ্য নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কর্মযজ্ঞে। এখন কাজ অনেক কঠিন, তবুও হাল ছেড়ে দেননি তাঁরা।
২০১৮ সালে ১৫ এপ্রিল। কাঁচড়াপাড়া অঞ্চলের ৬ জন মেয়ে মিলে শুরু করলেন নতুন একটি সংগঠন – ‘কাঁচড়াপাড়া এডুকেশনাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। তাঁদের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল নারীদের জন্য কিছু করা। সঙ্গে সমাজের সব স্তরের মেধাবী, পিছিয়ে পড়া দুঃস্থ বঞ্চিত মানুষদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মহিলাদের স্বনির্ভর করতে তাঁরা বিনামূল্যে হস্তশিল্পের স্কুল শুরু করেন ২০১৯ সালের ৩ আগস্ট থেকে। ধীরে ধীরে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকে। একটু একটু করে কর্মভার ভাগ করেন নেন সবাই। মহালয়ার পুণ্য দিবসে নতুন কাপড় বিতরণ করা হয় সংস্থার পক্ষ থেকে। শীতের আগে অসহায় মানুষদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরোনো শীতবস্ত্র। বস্তিবাসী শিশুদের জন্য খোলা হয় ‘আলোরানী অবৈতনিক বিদ্যাালয়’। এই স্কুলের আরেকটি শাখা রয়েছে নদিয়া জেলার একটি আদিবাসী গ্ৰামে। এছাড়া ছোটো ছেলেমেয়েদের জন্য খোলা হয়েছে বিনামূল্যের লাইব্রেরি। যার নাম ‘বিজিত রায় স্মৃতি সৌধ গ্রন্থাগার’। এখানে ওই স্কুলের পড়ুয়ারা বিনা পয়সায় বই পড়ার পাশাপাশি খাতা, পেন, পেনসিল ও ব্যবহারিক শিক্ষা সামগ্রীর সুবিধাও পায়। সোসাইটির সদস্যারা প্রতিদিন এক টাকা করে জমিয়ে লাইব্রেরির উন্নয়নে ব্যবহার করেন।
এখন লকডাউন পরিস্থিতিতে সংস্থার মেয়েরা যেখানে প্রয়োজন হয় ছুটে যান। মানুষের পাশে দাঁড়ান। কচিকাঁচাদের অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছেন তাঁরা। ছোটোদের জন্য ছবি আঁকা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাঁরা রোপণ করেন নতুন চারাগাছ। আলোরানী অবৈতনিক বিদ্যালয়ে সপ্তাহে একদিন করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস করানো হয়। পড়ুয়াদের দেওয়া হয় টিফিন। লকডাউনে বহু খেটে খাওয়া দুঃস্থ মানুষের রোজগার বন্ধ। তাঁদের কথা ভেবে সোসাইটির উদ্যোগে চালু হয়েছে ‘অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার প্রকল্প’। সংস্থার সদস্যারা পাঁচ থেকে ছয় দফায় দুঃস্থ অঞ্চল, ইটভাটা, বস্তিতে চাল, ডাল, অন্যান্য খাবার এবং প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিয়েছেন।
চলছে অবৈতনিক ক্লাস
লকডাউনে মহিলাদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে তাঁরা শুরু করেছেন বিনামূল্যের কিছু কোর্স। যেমন, হ্যান্ডিক্রাফটস, মেহেন্দি, কেক তৈরি এবং আরও নানারকম কুটির শিল্প। বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, যেমন জলসংরক্ষণ দিবস, ডেঙ্গু সচেতনতার প্রচারও চলছে। এরই মধ্যে বাংলায় হানা দেয় বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমফান। লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া সুন্দরবনে একশো জনের শুকনো খাবার নিয়ে এগিয়ে যায় কাঁচড়াপাড়া এডুকেশনাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মহিলা টিম। সদস্যারা নিজেরাই অর্থ সংগ্রহ করে নিরলসভাবে মানুষের সেবা করে চলেছেন।
শুরু থেকেই সংগঠনে যুক্ত ছিলেন পিয়ালী ঘোষ, প্রতিমা সরকার, শুক্লা দে, দেবযানী ব্যানার্জীরা। পরে যোগ দেন সুদেষ্ণা মিশ্র, জোনাকি ভৌমিক, পুষ্পিতা মজুমদার, মিলি শীল, লীনা কুণ্ডু, মৌসুমী গাঙ্গুলী, পিয়ালি মুখার্জী, রিয়া সরকার, সুপ্রিয়া সরকার প্রমুখ। এই সংস্থা গড়ে তোলায় মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন সম্পাদিকা দীপিকা দাস সিকদার।
কচিকাঁচাদের জন্য নানান প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাঁরা
কাঁচড়াপাড়া এডুকেশনাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির এই নিরন্তর সেবাকর্ম ইতিমধ্যেই এলাকার বাসিন্দাদের প্রশংসা অর্জন করে নিয়েছে। কাঁচড়াপাড়া অঞ্চলে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সংগঠন। দীপিকা দাস সিকদার আমাদের বললেন, “বুদ্ধিমত্তা আর শক্তিই পারে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে, তবে অখণ্ড মনোবল বড়ো কাজের জিনিস। অখণ্ডতা না থাকলে এগুলো কিছুই সম্ভব হত না”।
