কলকাতার ইতিহাসে হাত ধরাধরি করে চলেছে ধর্ম এবং বাণিজ্য

পায়ে হেঁটে কলকাতা সফর

বেথ-এল সিনাগগ

পায়ে হেঁটে কলকাতা সফরের আজ পঞ্চম পর্ব। এখনও অনেক পথ চলা বাকি। গত দিন আমরা দেখেছি একটি সিনাগগ, দুটি গির্জা এবং একটি মসজিদ। ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিট, ক্যানিং স্ট্রিট ও ব্র্যাবোর্ন রোড অঞ্চল যেন পুরোনো কলকাতার সর্বধর্ম সমন্বয় কেন্দ্র। সইফি মসজিদ পর্যন্ত হেঁটেছি আগের সপ্তাহে। আজ কয়েকটি ধর্মীয় কেন্দ্রীয় যাব, তার সঙ্গে ঢুঁ মারব কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও। চলুন শুরু করা যাক। 

বেথ-এল সিনাগগ

ব্র্যাবোর্ন রোড থেকে বাম দিকে ঘুরে পোলক স্ট্রিট ধরে পৌঁছে যান মানুক লেনে। সেখানেই রয়েছে বেথ-এল সিনাগগ। অফিসিয়াল ঠিকানা ২৬, পোলক স্ট্রিট। হিব্রু ভাষায় ‘বেথ-এল’ মানে ‘ঈশ্বরের বাড়ি’। ১৯ শতকের শুরু থেকে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন বাগদাদি ইহুদিরা। ১৮৫৬ সালে এই সিনাগগটি নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। অর্থসাহায্য করেন স্থানীয় বাগদাদি ইহুদি ডেভিড জোসেফ এজরা এবং এজেকিয়েল জুডাহ। প্রার্থনাকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৮৮৫ সালে সিনাগগটি আরও বড়ো করে তোলা হয়। অর্থের জোগান দেন এলিয়াস শালোম গুবে। 

এখন মহানগরে খুব কম সংখ্যক ইহুদিই বসবাস করেন। দেখে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব যে এক সময় কলকাতায় ইহুদি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের হৃৎপিণ্ড ছিল বেথ-এল এবং ম্যাগান ডেভিড সিনাগগ। উন্নত জীবনের খোঁজে ইরাক থেকে বহু সংখ্যায় ইহুদি চলে আসেন ভারতে। ইরান এবং অটোমান সাম্রাজ্য থেকেও এসেছিলেন। তাঁদের একাংশ কলকাতায় থাকতে শুরু করেন।

আজকাল বেথ-এল সিনাগগ আগের মতো সক্রিয় নয়। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ। একমাত্র ঢুকতে পারেন উইকএন্ডে, তবে ট্রাস্টি এবং প্রশাসকদের অনুমতি লাগবে। 

ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ

তিলোত্তমার যত প্রাচীন স্থাপত্য এতদিন ঘুরে দেখলাম, সেই তুলনায় ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ মোটেও পুরোনো নয়। ১৯৩০ সালে এটি গড়ে ওঠে লিয়নস রেঞ্জের ওপর। ১৭৮০ সালে মহাকরণের উলটো দিকে টমাস লিয়ন নির্মাণ করেন লিয়নস রেঞ্জ। মহাকরণেরও স্থপতি তিনি। যাই হোক, কেবল সময় দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের গুরুত্ব বিচার করা যায় না। ব্রিটিশ যুগে কলকাতার আর্থিক সমৃদ্ধির সূচক ছিল এই অফিস। আজও স্টক মার্কেটের ওঠানামায় জরুরি মতামত দেয়। ইন্ডিয়া এক্সচেঞ্জ প্লেসের চারদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে নজর কেড়ে নেয় এই রাজকীয় ভবন।

লালবাজার

স্টক এক্সচেঞ্জ ছাড়িয়ে বৌবাজার স্ট্রিট (বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট) ধরে হাঁটতে থাকুন। সেন্ট অ্যান্ড্রু’জ কার্ক পেরিয়ে ঢুকে পড়বেন লালবাজার অঞ্চলে।

লালবাজারকে সবাই কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর বলেই চেনে। গোটা অঞ্চলের সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের এমন নিবিড় ঐতিহাসিক যোগাযোগ সাধারণত দেখা যায় না। কলকাতা পুলিশের ইতিহাসেই কেবল সীমাবদ্ধ নয়। ১৮ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত জায়গাটি বিখ্যাত ছিল মদ এবং পানশালার জন্য। ব্রিটিশরা এই অঞ্চলকে ‘লোল বাজার’ নামে ডাকতেন। নামটি সম্ভবত এসেছে ‘লোল শরবত’ বা ‘লাল শরবত’ থেকে। রেড ওয়ানকে স্থানীয় লোকেরা এই নামে চিনতেন।

১৮৬৬ সালে পাশ হয় ক্যালকাটা পুলিশ অ্যাক্ট। যদিও ১৭২০ সাল থেকে শহরে পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ১৭৭৮-এ সাতশো পদাতিক বা ‘পাইক’ নিয়ে ৩১টি থানার যাত্রা শুরু হয়। কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তরের বিশাল লাল ভবনটি চোখ ধাঁধিয়ে দেয় আজও। রাস্তার পাশে ঘড়ি এবং খাবারের দোকানগুলোও খুব জনপ্রিয়। এমন স্বাদের খাবার কলকাতার অন্য কোথাও পাবেন না।

সি ইপ চিনা গির্জা

এই বাড়ি কলকাতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্যগুলোর একটি। গির্জা বলা হলেও এটি আসলে বৌদ্ধ মন্দির। কলকাতার চিনা সম্প্রদায়কে এক সময় আন্তরিক বন্ধনে বেঁধে রেখেছিল। লালবাজার পুলিশ কার্যালয় যেখানে শেষ হচ্ছে, বাঁদিকে ঘুরে ট্রাম লাইন বরাবর রবীন্দ্র সরণিতে হাঁটতে থাকুন। ইন্ডিয়া এক্সচেঞ্জ প্লেস এক্সটেনশনের ডান দিকে ঘুরে ছাতাওয়ালা গলি পেরিয়ে তার সমান্তরাল গলিতে ঢুকে যান। পৌঁছে যাবেন সি ইপে। 

চৈনিক রীতিতে গড়ে উঠা মন্দির। সামনের ফটকটি দেখার মতো। দোতলায় রয়েছে উপাসনাঘর। তবে দর্শনার্থীদের যাওয়ার অনুমতি নেই। মন্দির প্রতিদিনই খোলা থাকে। একতলা এবং চারপাশটা দেখতে পারেন। কাছেই প্রসিদ্ধ নানকিং রেস্তোরাঁ এবং বেন্টিংক স্ট্রিট। যে রাস্তা এক সময় চিনা জুতোনির্মাতাদের জন্য পরিচিত ছিল। এঁদের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে এখন। বেশিরভাগই চলে গিয়েছেন ট্যাংরা এলাকায়। তবে চাইলে আপনি কাছের টেরিটি বাজারে ঢুঁ মারতে পারেন। ভোরবেলা মন ভালো করে দেবে চিনা প্রাতরাশ-সহ অন্যান্য খাবার।

ওল্ড মিশন চার্চ

ছাতাওয়ালা গলি এবং সান ইয়াত সেন স্ট্রিটের ক্রসিং থেকে ডান দিকে ঘুরবেন। বৌবাজার স্ট্রিট দিয়ে লালবাজার ছাড়িয়ে বাঁ দিকে মিশন রো বা আরএন মুখার্জি রোডে ঢুকুন। ওল্ড মিশন চার্চকে শ্রদ্ধা জানিয়েই রাস্তার নামকরণ। সুইডিস লুথারীয় মিশনারি জোহান জাখারিয়াহ কিয়েরনানডার এটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৭০ সালে। কলকাতার প্রথম প্রোটেস্টান্ট গির্জা। খ্রিস্টান চার্চের মধ্যে শহরের দ্বিতীয় প্রাচীনতম, আর্মেনিয়ান চার্চের পরেই। ১৭৬৭ সালে জমি কিনে নিজের খরচেই এই চার্চ গড়ে তোলেন কিয়েরনানডার। এটিকে তিনি ‘বেথ তেফিলাহ’ বলে ডাকতেন। হিব্রু ভাষায় যার অর্থ ‘প্রার্থনার বাড়ি’। স্থানীয় মানুষ বলেন ‘লাল গির্জা’। কারণ বাড়িটি প্রথমে ছিল লাল রঙের। পুরোনো কলকাতার কিছু নথি থেকে জানা যায়, লাল দিঘির নাম এসেছে এই লাল গির্জা থেকেই।

গির্জাটি দারুণভাবে সাজানো। এখনও প্রতি রবিবার সকালে প্রার্থনার জমায়েত হয়। যে কোনও দিন গিয়ে দেখতে পারেন।

চা নিলাম কেন্দ্র

আপনারা কি জানেন, লন্ডনের পরই পৃথিবীর দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র রয়েছে কলকাতায়? ওল্ড মিশন চার্চের ঠিক তিনটে বাড়ি পরেই। ১৮৮৬ সাল থেকে দেশের চা বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কেনাবেচা হয় এখানে। দার্জিলিং, আসাম-সহ বিশ্বখ্যাত চা নিলামে ওঠে। অনুমতি নিয়ে আপনিও নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

আজকের ভ্রমণ একটু দীর্ঘ হল। এসপ্ল্যানেডের কাছে এখন পৌঁছেছি আমরা। পরের দিন সেখান থেকেই নতুন দিকে যাত্রা শুরু হবে। 

Developed by DXDasia