কলকাতার মধ্যে একটুকরো খাঁটি চিন

সারাবছর মেলে হোমমেড চিনা খাবার

‘চিনে বাজারের থেকে
              এনো তো করমচা
কাঁকড়ার ডিম চাই,
              চাই যে গরম চা।’

দামোদর শেঠকে খুশি করতে শেষে কি না চিনে বাজারের দ্বারস্থ হওয়া। যে চিনের সঙ্গে আজকাল প্রায়ই ভারতের ঠোকাঠুকি লাগে। সীমানায় তাই কড়া প্রহরা। চিনকে বেশি চিনলেই সন্দেহ! কিন্তু চিনের সঙ্গে  এদেশের দোস্তি তো আর একদিনের নয়। ফা-হিয়েন, হিউ-এন-সাঙের আমল থেকে  চিনকে দেখা। ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ স্লোগান ওঠার ঢের আগে বাংলা শব্দভাণ্ডারে চিনের অনুপ্রবেশ। চা, চিনি, চাউমিন খেয়ে-খেয়ে বাঙালির পেট তদ্দিনে হেজিয়ে গেছে। কলকাতার বুকে তাই আজও জেগে আছে মস্ত চিনে পাড়া। হালফিলের চায়না টাউন নয়। ইনি প্রা‘চীন’।

সারাবছর  মেলে হরেকরকম চিনা খাবার

কোথায়? চলে যাও লালবাজার। তা পেরিয়ে পোদ্দার কোর্ট। কাছেই চিনা নেতা সান ইয়াৎ সেনের ( সুচিত্রা বা অপর্ণার আত্মীয় নন। প্রজাতন্ত্রী চিনের প্রথম রাষ্ট্রপতি) নামে রাস্তা। সে রাস্তা জুড়ে একটা আস্ত চিন এবং তার মস্ত বাজার। তার পোশাকি-নাম টেরিটিবাজার। কোনো এক সাহেবের নাম ছিল নাকি টিরেট। তার নামেই এই বাজার। 

বসন্তকালে, ফেব্রুয়ারি মাসে,এ অঞ্চলে বড়ো করে পালিত হয় চিনা নববর্ষ। সে এক দেখার মতো কাণ্ড। কিন্তু তাছাড়াও সারাবছর  মেলে হরেকরকম চিনা খাবার। সমস্তই হোমমেড। দেশি পদ্ধতিতে তৈরি। সপ্তাহের প্রতিদিনই সেই খাদ্যভান্ডারের নাগাল মেলে। শনি-রবি তো তার সমারোহই আলাদা।

তবে যেতে হবে ভোরবেলা। দাঁতন করতে করতেই পৌঁছে যেতে হবে সেখানে। কারণ, বাজার বসে সকাল ৫টা থেকে ৯টা অবধি। দেরি করলে হাত উলটে চলে আসতে হবে।

কী কী মিলতে পারে এখানে….?

বড়ো বড়ো চাইনিজ কুইজিনকে টেক্কা মারতে পারে টেরিটি বাজারের চিনা খাবার। চিকেন ফিস পর্কের অফুরান সামগ্রী মেলে ধরে বসে আছে তারা। রকমারি মোমো,  সসেজ, স্যুপ-নুডলস,  ফিসবল, প্রন ওয়েফার্স, রাইসবোল — উপচে পড়ছে। যেমন সস্তা, তেমন পুষ্টিকর। সঙ্গে মিলবে ঘরে তৈরি চিনা সস। এছাড়াও পাওয়া যাবে  অ্যারোমাটিক ওষুধপত্তর, চা।

অবিশ্যি, বাঙালি রসনার সাথে সাযুজ্য রেখে টেরিটি বাজার অনেক খাবারের স্বাদেই খানিক বদল এনেছে। এই বাজারের সমস্ত দোকানিই চিনা। এখানে থাকতে থাকতে দিব্বি রপ্ত করে ফেলেছে বাংলা-হিন্দি।

চিন থেকে উৎখাত হয়ে উদ্বাস্তু এই মানুষেরা আশ্রয় নিয়েছিল কলকাতায়। এ’শহর তখনো বহিরাগতকে খেদাতে শেখেনি। সেসব প্রাকস্বাধীনতার গল্প। ১৯৬২-তে যুদ্ধের সময় এই শরণার্থী মানুষগুলোকেও সহ্য করতে হয়েছিল হাজারো অত্যাচার।  একটা সময় নাকি প্রায় হাজার কুড়ি চিনা মানুষ থাকত এই কলকাতায়। এখন তা দাঁড়িয়েছে দু-হাজারে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে টেরিটি বাজারের জৌলুসও। বাইপাসের ধারে মেট্রোপলিস কলকাতায় নবজাত চায়না টাউনেও উঠে গেছে অনেকে। সেখানে চিনে খাবারই বিক্রি হয়। তবে খোলা আকাশের নিচে, হাটের মতো আন্তরিক উষ্ণতায় না। ঠান্ডাঘরে।

সব খাবারই হোমমেড 

কেউ কেউ বাসা বেঁধেছে মুম্বাই দিল্লি। অলিতে-গলিতে গজিয়ে-ওঠা চাইনিজ রেস্তরাঁর জেরে আজকাল তেমন আর ভিড় জমে না এখানে। কিছুকাল আগে অবধি চাইনিজ জুতোর সুনাম ছিল কলকাতায়। টেরিটির মানুষজনের হাতে কাজও ছিল তখন। এখন ব্র্যা ন্ডেড জুতোর জমানা। তাই সেকাজও হারিয়েছে তারা।

‘চেয়ে দেখি ঠোকাঠুকি বরগা কড়িতে
কলকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে’। 

কলকাতাকে তিলোত্তমা বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল সাহেব-সুবোর দল। সেই নির্মাণের সঙ্গে জুড়ে যায় চিনদেশও। ১৭৮১ তে ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে বজবজের ঘাটে নামে চিনদেশের টাং আছি (যার নামে অছিপুর)। হেস্টিংসের সুপারিশে ও আছির  বাংলায় তৈরি করে ভারতের প্রথম চিনির কল। তার সাথে চিনা শ্রমিকদেরও ভারতে পদার্পণ।  

ইংরেজ সাহেবদের আমরা যত যত্নেই রাখি না কেন, এই মানুষগুলোর ভূমিকা ভুলতে বসেছি। ইউরোপ বা আমেরিকান হলে এক ব্যাপার। একে চিনা, দুইয়ে শরণার্থী। আমাদের মাথাব্যথা নেই। খাওয়াদাওয়া উপলক্ষে খানিক যাওয়া যায়, এই আরকি। 

বড়ো বড়ো চাইনিজ কুইজিনকে টেক্কা মারতে পারে টেরিটি বাজারের চিনা খাবার

তাই টাং আছির উত্তরসূরিরা কোনোক্রমে ঝুলে আছে টেরিটির অন্দরে। পুরোনো কলকাতাকে ঘিরে বাঙালি মধ্যবিত্তের এখনও টইটম্বুর  আবেগ। কিন্তু কলকাতা তো শুধু বাঙালিবাবু বা ইংরেজ গভর্নরের নয়। কলকাতা চিনারও।  সে কলকাতা ফুরোচ্ছে। খুব হুড়োতাড়ায় বদলে যাচ্ছে কলকাতার সমস্ত খোলনলচে। 

টেরিটিও ফুরোল বলে। একটি বড়ো অধ্যায়ের অবলুপ্তি। তবে মিসিংলিঙ্কেরা থাকে। তাই চিলিচিকেন, চিনাবাদাম, চিনেমাটির হাত ধরে হয়তো থেকে যাবে চিনা-কলকাতা।

ছবি- তর্পিণী ভুঁইয়া

Post Tags
Developed by DXDasia