কেরি কলিতানির ‘অসতী মোকদ্দমা’ ঘিরে সরগরম উনিশ শতকের কলকাতা

তর্ক-বিতর্ক, পুরাণ-শাস্ত্র খুঁড়ে ধুন্ধুমার লড়াই

আজব ঘটনা। অনেকগুলো বছর আগের ঠিকই। তবু এখনো সেসবের হাত থেকে মুক্তি মেলেনি সমাজের, আমাদের। অতীতের ভূত হয়ে সেসব আজও আমাদের শাসন করে চলে।  সেসব বিষবৃক্ষ আমরা পরম যত্নে আমাদের উঠোনে বপন করে রেখেছি। সুযোগ পেলেই সার-জল দিয়ে তাকে বড়ো করে তুলি। তেমনই  একটি  ঘটনা ঘটেছিল ১৮৭৩ সালের, এপ্রিল মাসে। একটি মামলাকে ঘিরে কলকাতার জনজীবন সরগরম হয়ে উঠেছিল। তর্ক-বিতর্ক, পুরাণ-শাস্ত্র খুঁড়ে সে এক ধুন্ধুমার লড়াই বটে! কিন্তু এই লড়াইগুলো আসলে হয়ে থাকে যুক্তি-যুক্তি খেলা। সত্য উপলব্ধির থেকে তা ঢের দূরে।

ঘটনাটি আসামের একজন বিধবাকে নিয়ে। বিধবার নাম কেরি কলিতানি।  নিবাস আসামের শিবসাগর অঞ্চলে। ধর্ম – হিন্দু। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি স্বামীর সম্পত্তি পেয়েছিলেন। আর তাতেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা ঠুকেছিল তার স্বামীর এক দূরসম্পর্কের ভাই মণিরাম কলিতা। মণিরাম কলিতার দাবি ছিল, কেরি কলিতানি ব্যভিচারী। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সহবাস করেছেন। তাই স্বামী গেন্ডেলার সম্পত্তিতে তাঁর কোনো অধিকার নেই। সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী গেন্ডেলার ভাই মণিরাম কলিতা। 

কলকাতা হাইকোর্টের কালঘাম ছোটে এই মামলার নিষ্পত্তি করতে। প্রধান বিচারপতি ছিলেন রিচার্ড কাউচ। তিনি সহ আরো সাতজন বিচারক রায় দিয়েছিলেন কেরি কলিতানির পক্ষে। কিন্তু অন্য তিনজন বিচারকের রায় ছিল কেরির বিপক্ষে। এই অন্য তিনজন বিচারকের মধ্যে একমাত্র বাঙালি ছিলেন দ্বারকানাথ মিত্র। 

কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সমস্যার সমাধান সেদিন করা যায়নি। হাইকোর্ট হিন্দু পণ্ডিত ব্যক্তিদের জড়ো করেছিল। শাস্ত্রজ্ঞ সেসব পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন, ভারতচন্দ্র শিরোমণি ও পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচস্পতি। শোনা যায়,  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও ডাকা হয়েছিল মতামত দেওয়ার জন্যে। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। সে যাহোক, উপস্থিত পণ্ডিতেরা রায় দিয়েছিলেন কেরির বিপক্ষে। তাঁদের মতে ব্যভিচারিণী বিধবা কিছুতেই স্বামীর সম্পত্তির অধিকারী হতে পারে না। জীমূতবাহনের দায়ভাগ, কাত্যায়ন – থেকে তাঁরা দেখিয়েছিলেন, বিধবার উচিত বা অনুচিত কাজ কী হতে পারে। বিধবামাত্রেই সে শুধু স্বামীর পারলৌকিক প্রয়োজন মেটাবে। আর সে কারণেই প্রয়োজনমতো সামান্য  গ্রাসাচ্ছাদন করবে। কোনোরকম ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদ সে মেটাতে পারবে না। স্বামীর শয্যাকে পবিত্র রাখা তার একান্ত দায়িত্ব। আর সেসব পালন না করলে নরকবাস অনিবার্য। 

জটিল পরিস্থিতি। ইংরেজ সাহেবরাও কিন্তু এই মামলায় বেশ ফ্যাসাদেই পড়েছিলেন। একে তো আগে থাকতেই ঠিক ছিল যে, এদেশের ধর্ম-সংক্রান্ত বিচারের ক্ষেত্রে তারা ঔপনিবেশিক আইনকানুন বলবৎ করবে না। অন্যদিকে ভারতের মতো এক ‘পিছিয়ে-থাকা’ দেশকে সঠিক দিশা দেখানোও তাঁদের কর্তব্য। এদেশে নারীর ওপর শোষণ পদে পদে। 

তা এক্ষেত্রে কী করা যায়? ইংরেজ দ্বিধাবিভক্ত। কেম্প ও গ্লোভার নামের দু’জন ইংরেজ বিচারক আবার হাত মিলিয়েছিলেন দ্বারকানাথ মিত্রের সঙ্গে। 

কলকাতা জুড়ে তখন একই আলোচনা।  নারী-স্বাধীনতার জন্যে সমাজ উচ্ছন্নে যাচ্ছে – এই গোঁড়ামিও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ ডালপালা মেলেছিল। তবে কেরি কলিতানি মামলায় জিতে গিয়েছিলেন। জিতেছিলেন তাঁর উকিল মোহিনীমোহন রায়ের দৌলতে। হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞরা যখন বিধবার উচিত-অনুচিত কর্তব্য ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত, তখন মোহিনীমোহন রায় দেখিয়েছিলেন,  কোনো শাস্ত্রেই এমন বিধান নেই, যে বিধবা একবার সম্পত্তি পেয়ে গেলে, আবার তাকে সেই অধিকার থেকে চ্যুত করা যেতে পারে। মানে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষই মেনে নিয়েছিল, কেরি কলিতানির এই ‘সহবাস’ তাঁর ‘ব্যভিচার’। অর্থাৎ এটা যে স্বাভাবিক একটি অধিকারই, সেভাবে কিন্তু ঘটনাটির ব্যাখ্যা হল না। কলিতানি ব্যভিচারী, তা স্বীকৃতিই পেল। কিন্তু শাস্ত্রে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার কথা বলা নেই বলে, সে সম্পত্তি কলিতানির রয়ে গেল। 

অন্যদিকে, বিধবাবিবাহের আইনে বলা ছিল, বিধবা যদি পুনর্বিবাহ করে, তাহলে পূর্বতন স্বামীর সম্পত্তিতে তার কোনো অধিকার থাকবে না। কিন্তু কেরি কলিতানি তা করেননি। শুধু সহবাস করেছিলেন। তাই সেই আইনের প্যাঁচেও তাঁর সম্পত্তিভোগ আটকানো গেল না।

হয়তো একটা সমস্যার সমাধান এতে হল। শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে স্বামীর সম্পত্তির অধিকার থেকে স্ত্রীকে বঞ্চিত করার যে হাজার উপায় হিন্দু সমাজে প্রচলিত ছিল, শাস্ত্র দিয়েই তাকে ঠেকানোর একটা উপায় মিলল। কিন্তু ‘ব্যভিচার’-এর লেবেল তার গায়ে লেগে রইল। ফলে, নারীমুক্তির যে হাওয়াটি বয়েছিল উনিশ শতকে, তার প্রয়োগেও বেশকিছু ফাঁক রয়ে গিয়েছিল। হয়তো কালক্রমে সেগুলি মুছে যাওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু আজও আমরা বুঝতে পারি, সমস্যার মূল কতটা গভীরে। বুঝতে পারি, শুধুমাত্র আইনি লড়াই দিয়ে সেই সমস্যাকে সমাধান করা যায় না। চেতনার উপলব্ধিতে তাকে পৌঁছে দেওয়া দরকার।

ঋণ – ‘উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান’ – সুমন্ত্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
ছবি – ১৮৬০-এর দশকে কলকাতা হাইকোর্ট, স্যামুয়েল বোর্ন

 

Post Tags
Developed by DXDasia