সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপকের পদ না নিয়ে বন্ধুকে দিতে পায়ে হেঁটে কালনা গেলেন বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগরের বন্ধুবিচ্ছেদ – এক সামাজিক ভাঙাগড়ার দলিল

“এত কাল পরে সব ভেঙ্গে গেল ভূর।
 হতদর্প হৈলে বাচস্পতি বাহাদুর।।
সকলের বড় আমি মম সম নাই।
কীসে এই দর্প কর ভেবে নাহি পাই।।
অতি দর্পে লঙ্কাপতি সবংশে নিপাত।
অতি দর্পে বাচস্পতি তব অধঃপাত”।।

এককালের গভীর বন্ধুত্ব নিমেষেই ভেঙে গিয়েছিল এভাবে। ‘অতি অল্প হইল’- রচনায় প্রাণের বন্ধুকে তীব্র ব্যঙ্গে বিদ্ধ করেছিলেন বিদ্যাসাগর। যদিও নিজের নামে এই লেখা লেখেননি তিনি। লিখেছিলেন ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে। তবু, বাংলাভাষার এই নিখুঁত ব্যঙ্গরচনা পড়ে পাঠকও বুঝেছিল রচয়িতার পরিচয়। রচনার শুরুতেই ‘অতুচৈঃ পতনায়’ নামে বাচস্পতি মহাশয়কে রীতিমতো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। একটি মতান্তরে চিরবিচ্ছেদ হয়েছিল দুই বন্ধুর মধ্যে।  

বিদ্যাসাগরের থেকে বয়সে কিছু বড়ো ছিলেন তারানাথ তর্কবাচস্পতি। জন্মেছিলেন ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে। কালনার এই মানুষটির মতো সুপণ্ডিত তখন গোটা বাংলায় প্রায় কেউ নেই। জন্মসূত্রেই তারানাথ পেয়েছিলেন জ্ঞানের প্রতি অপরিসীম অনুরাগ। সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর বন্ধুতার সূত্রপাত। ততদিনে তারানাথ সে কলেজের খ্যাতনামা ছাত্র। সমস্ত বিষয়েই তাঁর অগাধ ব্যুৎপত্তি। সে জ্ঞানের টানে বিদ্যাসাগরও আকৃষ্ট তাঁর প্রতি। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে শুরু করে অলংকার, ন্যায় – সব আলোচনাই ছিল তারানাথের সঙ্গে। অন্যদিকে বয়সে ছোটো অথচ মেধাবী বুদ্ধিমান ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতি বিশেষ প্রশ্রয় ছিল তারানাথের। ঠনঠনিয়ার কাছেই ছিল তাঁর বাড়ি। কলেজ ছুটি হত বিকেল চারটেতে। বাড়ি ফিরেই ঈশ্বরচন্দ্রকে ঢুকে পড়তে হত ঘর-গেরস্থালির দেখাশোনায়। পড়ার সময় তেমন মিলত না। অতএব উপায়? এগিয়ে এলেন তারানাথ। কলেজ থেকে প্রথমেই ঈশ্বরচন্দ্রকে যেতে হত তাঁর বাড়িতে। সেখানে তারানাথের কাছে বিশ্বনাথ কবিরাজের  লেখা ‘সাহিত্যদর্পণ’-এর পাঠ নিতে হত। রীতিমতো শিক্ষকের ভূমিকায় তখন অবতীর্ণ তারানাথ। সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক জয়কৃষ্ণ তর্কালঙ্কার তারানাথের বাড়িতেই আবিষ্কার করেন, ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যে সুপ্ত আছে বনস্পতি হয়ে ওঠার অমিত সম্ভাবনা। আর সে সম্ভাবনায় জলসেচন করে চলেছেন তারানাথ।

বিদ্যাসাগরের থেকে বয়সে বড়ো। নিজে প্রভূত পাণ্ডিত্যের অধিকারী। অথচ যে কোনো সামাজিক বিতর্ক-আসরে বিদ্যাসাগরকে এগিয়ে দিতেই চাইতেন তিনি। কলকাতা শহরের কোনো বিতর্ক-সভায় তখন অবধারিত আমন্ত্রণ থাকত তারানাথের। কখনো তাঁকেই নিতে হত, সঞ্চালনার ভার। মীমাংসার দায়িত্ব। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সঙ্গে নিতেন ঈশ্বরচন্দ্রকে। প্রতিভাবান সেই কিশোরকে কলকাতার সুধী সমাজের কাছে পরিচিত করাতেন। কখনো বা বিতর্কসভার শুরুতেই ডেকে নিতেন ঈশ্বরকে। তাঁর প্রশংসায় ভরিয়ে তুলতেন গোটা সভা।      

সেসব দিনের কথা বিদ্যাসাগরও ভোলেননি কখনও। চিরকাল সমস্ত কাজে এই মানুষটিকে পাশে নিয়ে চলতে চেয়েছেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা করার সময় বিদ্যাসাগরের কাছে সুযোগ আসে সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করার। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তাঁর বেতন ছিল পঞ্চাশ টাকা। আর সংস্কৃত কলেজ তাঁকে দিতে চেয়েছিল ৯০ টাকা। কিন্তু বিদ্যাসাগর নিলেন না সে চাকরি। অধ্যক্ষ মার্শেল সাহেবকে বললেন, তাঁর চেয়ে ঢের বেশি জ্ঞানী পণ্ডিত ‘সর্ববিদ্যাবিশারদ এবং অদ্বিতীয় বৈয়াকরণিক’ তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয়। ওই পদ তাঁরই পাওয়া উচিত। কিন্তু হাতে সময় মাত্র একদিন। বিদ্যাসাগর এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে পড়লেন কালনার পথে৷ ডিসেম্বরের প্রবল শীত। দিনটি ছিল শনিবার। পদব্রজে কালনা পৌঁছালেন বিদ্যাসাগর। সেখানে তারানাথ তখন চতুষ্পঠীতে ছাত্রদের পাঠদানে ব্যস্ত। কিন্তু ঈশ্বরের অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না। ছ-মাসের জন্য সংস্কৃত কলেজে পড়াতে রাজি হলেন।

তারানাথের পাণ্ডিত্যের কর্মতৎপরতার খ্যাতি সেসময় ইংল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আর পৌঁছেছিল ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর বন্ধুতার কথাও। নারীশিক্ষার সূচনার সময় দু-বাহু বিস্তৃত করে বিদ্যাসাগরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সমস্ত নিন্দার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছিলেন। নিজের মেয়ে জ্ঞানদা দেবীকে ভর্তি করেছিলেন বেথুন সাহেবের ইস্কুলে। বিদ্যসাগরের চেষ্টা তো বটেই। পাশাপাশি তারানাথও প্রচার করে চলেছিলেন – “স্ত্রীশিক্ষা শাস্ত্রসম্মত”।

কিন্তু এই নিবিড় বন্ধুতায় হঠাৎ একদিন চির ধরে। বহুবিবাহ বন্ধ করার উদ্যোগ করছেন তখন বিদ্যাসাগর। হঠাৎ একদিন দেখলেন, যেসব পণ্ডিত মানুষ তাঁর এই কাজের বিরোধী তাদের মধ্যে অন্যতম তারানাথ তর্কবাচস্পতি মহাশয়। বহুবিবাহের পক্ষে এবং বিদ্যাসাগরের বিপক্ষে প্রথম পাঁচটির একটি স্বাক্ষর তারানাথের। প্রকাশ্য সভায় তারানাথ তখন বিদ্যাসাগর-বিরোধী বক্তব্য রাখছেন। আর বলছেন, বহুবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ক্ষুব্ধ বিদ্যাসাগরও লিখে ফেলছেন ব্যঙ্গাত্মক লেখা। এতদিনের চেনা মানুষের পাণ্ডিত্য ও বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এতদিনের বন্ধুত্বের তাপ নিভে আসছে ক্রমশ।

নারীশিক্ষা প্রচলনের সময়ও বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে। কিন্তু বহুবিবাহ রদের ক্ষেত্রে যেন অনেকবেশি আক্রমণাত্মক তিনি। শুধু যুক্তি না। শুধু শাস্ত্রীয় বচন নয়। ব্যক্তি-আক্রমণও প্রবল হয়েছিল তাঁর লেখায়।

ক্রমশ দেখা যায় তাঁদের বন্ধুতার আখ্যানগুলি ফিকে হয়ে আসতে থাকে। স্ত্রীশিক্ষা প্রচলনের সময় যে বন্ধুতার কারণে লড়াইয়ে অনেক জোর পেয়েছিলেন তিনি, বহুবিবাহে তাঁর সঙ্গেই বিরোধিতায় জড়াতে হয়। লড়াই যেন আরো কঠিন হয়ে ওঠে বিদ্যাসাগরের কাছে। তাই কি এত ব্যঙ্গ?

ইতিহাসে বন্ধুবিচ্ছেদ বিরল নয়। তবে এই বন্ধুবিচ্ছেদ যেন সময়েরই এক আখ্যান। ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে যে সময়টা এগোচ্ছিল, যে সমাজটা এগোচ্ছিল- তারই দলিল এই বন্ধুবিচ্ছেদটিও।
 

Developed by DXDasia