‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’-র তুখোড় জবাব
“তখন কলিকাতার লোক এই বই দু’খানি পড়িয়া হাসিয়া অস্থির হইত। খুড়োও ছাড়েন নাই, তিনিও জবাব দিতেন, একটা জবাবের নাম— লাঠি থাকিলে পড়ে না। কিন্তু হার খুড়োরই হইল, খুড়ো লিখিতেন সংস্কৃতে, বিদ্যাসাগর লিখিতেন বাংলায়, খুড়োর বই কেউ বুঝিতে পারিত না, বিদ্যাসাগরের বই সবাই পড়িত।” (বিদ্যাসাগর-প্রসঙ্গ, ভূমিকা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী)
আপাত মজার হলেও বেশ গুরুগম্ভীর বিষয় ধুন্ধুমার কাণ্ড চলেছিল উনিশ শতকের সত্তরের দশকে, কলকাতায়। ‘ভাইপো’ ছদ্মনামে বিদ্যাসাগর আর খুড়ো তারানাথ তর্কবাচস্পতির মধ্যে। দুজনের কেউই কম যান না। কিন্তু বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তর্কে জেতা তো সহজ নয়। কিন্তু, তর্কটা কী নিয়ে? তা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে আরো বছর তিনেক।
১৮৭১ সাল। বিদ্যাসাগর ফের হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দিলেন চারপাশে। এবারে তিনি ‘বহুবিবাহ’-কে আক্রমণ করে বই লিখেছেন। লিখেছেন বহুবিবাহ শাস্ত্রবিরোধী, কুৎসিত প্রথা। কুলীন ব্রাহ্মণদের আক্রমণ করেছেন সবচাইতে বেশি। তারা নাকি ঘুরে ঘুরে অসংখ্য বিয়ের করে স্ত্রীদের শ্বশুরবাড়িতেই রেখে দেওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাকা করে ফেলেন। কালেভদ্রে শ্বশুরবাড়ি যান স্ত্রীকে দেখতে। আদর-আপ্যায়নে মন না ভরলে সে যাওয়াও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে ওই সামান্য সাক্ষাতের উপহার হিসেবে স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার হলে তো মহা কেলেঙ্কারি। কীভাবে প্রমাণ হবে সন্তান কার? জামাই তো আসেই না। তখন উপায় বের করেন বাড়ির মহিলারাই। বিদ্যাসাগরের কলম থেকে যেন চুঁইয়ে নামে শ্লেষ–
“কন্যার জননী, অথবা বাটীর অপর গৃহিণী, একটি ছেলে কোলে করিয়া, পাড়ায় বেড়াইতে যান এবং একে একে প্রতিবেশীদিগের বাটীতে গিয়া, দেখ মা, দেখ বোন, অথবা দেখ বাছা, এইরূপ সম্ভাষণ করিয়া, কথাপ্রসঙ্গে বলিতে আরম্ভ করেন, অনেকদিনের পর কাল রাত্রিতে জামাই আসিয়াছিলেন; হঠাৎ আসিলেন, রাত্রিকাল, কোথায় কি পাব, ভাল করিয়া খাওয়াইতে পারি নাই; অনেক বলিলাম, একবেলা থাকিয়া, খাওয়াদাওয়া করিয়া যাও, তিনি কিছুতেই রহিলেন না; বলিলেন, আজ কোনও মতে থাকিতে পারিব না; সন্ধ্যার পরেই অমুক গ্রামের মজুমদারদের বাটীতে একটা বিবাহ করিতে হইবেক; পরে অমুকদিন, অমুক গ্রামের হালদারদের বাটীতেও বিবাহের কথা আছে। সেখানেও যাইতে হইবেক। এই বলিয়া ভোর ভোর চলিয়া গেলেন।… এইরূপে পাড়ার বাড়ী বাড়ী বেড়াইয়া জামাতার আগমনবার্তা কীর্তন করেন। পরে স্বর্ণমঞ্জরীর গর্ভসঞ্চার প্রচার হইলে, ঐ গর্ভ জামাতাকৃত পরিপাক পায়’।”
বিদ্যাসাগরোচিত শ্লেষ বটে। এরই সঙ্গে জুড়েছিল শাস্ত্রাদি থেকে উদ্ধৃতি, অকাট্য যুক্তি। পাথরপ্রতিম প্রথায় ধাক্কা কীভাবে দিতে হয়, তা ভালোই জানতেন ঈশ্বরচন্দ্র নামের মহাপণ্ডিত মানুষটি। ধাক্কা যথাস্থানেই লাগল। বহুবিবাহ বন্ধ করার জন্য অবশ্য সেই ১৮৫৫ সালের ডিসেম্বর থেকেই চেষ্টা করছেন তিনি। সমাজ তা নিয়ে আড়াআড়ি বিভাজিতও হয়েছে। সেই উত্তপ্ত বাস্তবতাতেই যেন ঘৃতাহুতি দিল এই বই। শুরু হয়ে গেল বিরোধিতা, প্রতি আক্রমণ।
বিদ্যাসাগরের বিরোধিতায় কলম ধরলেন তারানাথ তর্কবাচস্পতি নামের এক পণ্ডিত। সংস্কৃতে লেখা বই। বইটি পড়ে যুক্তির বহর দেখে ভারি আমোদ পেলেন বিদ্যাসাগর। ঠিক করলেন তর্কবাচস্পতি মশাই-এর যুক্তি এবং সংস্কৃতজ্ঞান নিয়ে খানিক কৌতুক করবেন। লিখলেন ‘অতি অল্প হইল’। বইয়ের শুরুতে লেখা ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য প্রণীত’। কোথাও নিজের নাম নেই। গোটা বইতে তারানাথকে ‘খুড়’ (খুড়ো) বলে সম্বোধন করে, তাঁর সঙ্গে ভাইপো-র সম্পর্ক পাতিয়ে দেদার ব্যঙ্গ বুনেছেন বিদ্যাসাগর। এ বই পড়লে বোঝা কঠিন রাশভারী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর লেখক।
খুব সম্ভবত তারানাথ তর্কবাচস্পতি মশাইও বুঝতে পারেননি। তিনি তো বই পড়ে চটে লাল। একে যুক্তির ধারে পেরে উঠছেন না, তার ওপর এই ‘খুড়’ সম্বোধনের ঠাট্টা। উত্তর তো দিতেই হবে। তিনি পাকড়াও করলেন বইয়ের গোড়াতে লেখা ওই পরিচিতিটিকেই। ‘ভাইপোস্য’ বলে কোনো শব্দই হয় না সংস্কৃতে। অতএব, লেখকের সংস্কৃতজ্ঞানই নেই। তিনি শাস্ত্র কী জানবেন! নিজের পরিচয়টাই ঠিকমতো দিতে পারেন না।
আরও পড়ুন
বোতলপুরাণ ও এক বিচিত্র বিদূষকের গান
এই উত্তর পড়ে নিশ্চয়ই মুচকি হেসেছিলেন বিদ্যাসাগর। তারানাথ তর্কবাচস্পতি তো জানতেন না, নেহাত ঠাট্টার জন্যই ‘ভাইপোস্য’ শব্দের জন্ম দেওয়া। জানলে অন্য যুক্তির পথ ধরতেন। কিন্তু, এই সুযোগ বিদ্যাসাগর ছাড়বেন কেন? দ্রুতই ছেপে বেরোল ‘আবার অতি অল্প হইল’। তাঁর ‘ভাইপোস্য’ পরিচয় নিয়ে যে ঠাট্টা করেছিলেন তারানাথ, তারই এক অত্যাশ্চর্য ব্যাখ্যা দিলেন বিদ্যাসাগর। সেই ব্যাখ্যা নিজের ভাষায় লেখা অসম্ভব। অতএব, ফের উদ্ধৃতির আশ্রয় নিতেই হচ্ছে।
“খুড়, এত বড় পণ্ডিত ও এত বড় বুদ্ধিশীল হইয়া, কোন বিবেচনায়, ‘ভাইপোস্য’ এই বিশুদ্ধ প্রয়োগটিকে অশুদ্ধ বলিয়া নির্দ্দেশ করিলেন, বুঝিয়া উঠা কঠিন। ‘ভাইপোস্য’ এই প্রয়োগটি দুটি সংস্কৃত পদে ঘটিত। ‘ভাইপঃ’, ‘অস্য’, এই দুই পদে সন্ধি হইয়া, ‘ভাইপোস্য’ প্রয়োগটি সিদ্ধ হইয়াছে। ভা শোভা, ইঃ কামঃ, অভিলাষ ইতি যাবৎ, তৌ পাতি রক্ষতি ইতি ইতি ভাইপাঃ, তস্য ভাইপঃ।
‘সন্ধিস্তু পুরুষেচ্ছয়া’ এই ব্যবস্থা বশতঃ, লেখকের ইচ্ছাবিরহ হেতু, ‘ভা’ ‘ই’ এই দুয়ের সন্ধি হইল না। ইহার অর্থ এই, অস্য কি না খুড়স্য, ভাইপঃ শোভাবিলাষরক্ষিতুঃ; অর্থাৎ, খুড়র পাণ্ডিত্যশোভার ও প্রতিপত্তিলাভবাসনার রক্ষাকর্তার। ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ সমুদয়ের অর্থ, খুড়র উপযুক্ত পাণ্ডিত্যশোভা ও প্রতিপত্তিলাভবাসনার রক্ষাকর্তা কোনও ব্যক্তির।”
লেখকের ইচ্ছা মেনে নাকি ‘ভা’ এবং ‘ই’-এর সন্ধি হয়নি। এ যে কী বিকট যুক্তি তা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সঙ্গে ভয়ানক ঠাট্টা। লক্ষ করার মতো ব্যাপার, এহেন ব্যখ্যার ভিতরেও কিন্তু বহুবিবাহ-কে ইঙ্গিতে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি বিদ্যাসাগর। শব্দে শব্দে তার প্রমাণ ছড়িয়ে। কেমন মানুষের পাল্লায় পড়েছেন, এই ব্যাখ্যা পড়ে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন তারানাথ। হয়তো এটাও বুঝতে পেরেছিলেন, এই লেখক ভাইপোটি যে-সে লোক নহে। অতএব আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।
আরও পড়ুন
‘ভুয়ো’ ডাক্তার বিদ্যাসাগর?
ভাষার এহেন অদ্ভুতুড়ে ব্যখ্যার সাহিত্যিক নিদর্শন ভবিষ্যতেও আমরা কম দেখব না। রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায় কিংবা শিবরামে এই উদাহরণ জ্বলজ্বল করছে। শিবরামের ‘এক দুর্যোগের রাতে’ গল্পটি মনে পড়ে? “ব্যাক টু ভিলেজ মানে হল তোমার পিঠ দাও গ্রামকে, অর্থাৎ কিনা, গ্রামকেই তোমার পীঠস্থান মনে করো।” কিন্তু, এসব তো সাহিত্য। আর বিদ্যাসাগর তো একটা বিতর্কমূলক ভারী লেখাতেই এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললেন। অকাট্য যুক্তির মধ্যে ভাষা নিয়ে এমনতরো ভড়কে দেওয়া কৌতুক। ভাবলেই বিস্ময় লাগে।
অবশ্য, বিদ্যাসাগরকে যাঁরা খুব কাছ থেকে চিনতেন তাঁরা অবাক হননি নিশ্চয়ই। তাঁর গাম্ভীর্য, পাণ্ডিত্যর মতোই রসিকতার বোধটিও ছিল বেশ উঁচুজাতের। বিদ্যাসাগরের অন্যতম জীবনীকার, উনিশ শতাব্দীর বিখ্যাত পজিটিভিস্ট কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘এই রসিকতা সে কালের ঈশ্বরগুপ্ত বা গুড়গুড়ে ভট্টাচার্যের মত গ্রাম্যতাদোষে দূষিত নহে, ইহা ভদ্রলোকের, সুসভ্য সমাজের যোগ্য।… এরূপ উচ্চ অঙ্গের রসিকতা বাঙ্গালা ভাষায় অতি অল্পই আছে।’
সেইসব বিদ্যাসাগরোচিত উচ্চাঙ্গের রসিকতা নিয়ে নাহয় আরেকদিন আলোচনা করা যাইবেক। আজ ‘অতি অল্পই হইল।’