বোতলপুরাণ ও এক বিচিত্র বিদূষকের গান

‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিনু/ ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে’

বোতলের মতো দেখতে একটা বই। যে সে বোতল নয়, খাঁটি মদের বোতল। বোতলাকৃতি বইয়ের বাইরেটা কালো মোটা কাগজের আর ভিতরে লাল কাগজের পাতায় পাতায় মাতালদের উদ্দেশ্যে ছাপানো কবিতা। বইয়ের নামটাও খাসা—‘বোতলপুরাণ’। অত্যন্ত প্রতিভাধর রসিক বাঙালি ছাড়া এমন রোমহর্ষক পুরাণ রচনা করে কার সাধ্যি! 

সেই রসিক স্রষ্টার নাম শরৎচন্দ্র পণ্ডিত থুড়ি দাদাঠাকুর। অদ্ভুত মানুষ ছিলেন বটে তিনি। জঙ্গিপুরে নিজের একটি প্রেস ছিল। নাম দিয়েছিলেন ‘পণ্ডিত প্রেস’। সেখানে তিনিই কম্পোজিটার, মেশিনম্যান, প্রুফ রিডার। সেই প্রেস থেকেই বেরত বিখ্যাত ‘বিদূষক’ পত্রিকা। দাদাঠাকুর নিজেই কলকাতার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন বিদূষক। এই প্রেস থেকেই ছাপা হয়েছিল ‘বোতলপুরাণ’। বিশ শতকের কলকাতা এমন বই দেখে হাসবে, কাঁদবে না রাগ করবে– বুঝতে পারেনি। বইয়ের সঙ্গে উপরি পাওনা দাদাঠাকুরের মুখে মুখে বাঁধা গান। 

গালি গায়ে, খালি পায়ে দাদাঠাকুর গাইতে গাইতে ফেরি করতেন এই বই। চৌরঙ্গি, বড়োবাজার, কলেজ স্ট্রিট—জায়গার সঙ্গে সঙ্গে গানও বদলে যেত। এক এক জায়গার লোকরুচি ভিন্ন ভিন্ন। লোকরুচি, মনস্তত্ত্ব দারুণ বুঝতেন বটে শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। বড়োবাজার অঞ্চলে অবাঙালিদের বাস বেশি। দাদাঠাকুর সেখানে গাইতে গাইতে যেতেন—

কালা এইসা বোতলমে লাল রঙকে মাল।
দো আনা পৈসা দেকে পিয়ালামে ঢাল।
ইস্‌মে নেহি দারু
খালি হ্যায় মিঠি ঝাড়ু
পিকে শায়েস্তা হোগা শরাবি মাতাল।

এভাবে মদের বোতলের মতো বই বেচতে দেখে একবার তাঁকে পাকড়াও করল ব্রিটিশ পুলিশ। দাদাঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজিতে গান বানিয়ে শোনালেন লালমুখো পুলিশকে। সে তো তাজ্জব। খালি গা, খালি পা নেটিভ হকারটা কিনা ইংরেজিতে এমন গান বানায়! পুলিশ দাদাঠাকুরকে ধরল না। বোতলপুরাণের ফেরিও চলতে থাকল। 

বিশ শতকে দাদাঠকুরের বিকল্প রসিক আর একটিও খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। হাস্যরস আর প্রতিভার যুগলবন্দি যে কতখানি গাঢ় হতে পারে, তার প্রমাণ তিনি। জঙ্গিপুরের স্কুলে পরার সময়েই ইংরেজি কবিতার পাংচুয়েশন মনে রাখার জন্য গান তৈরি করেছিলেন। পরে এমন কত গানই যে বেঁধেছেন দাদাঠাকুর। জঙ্গিপুর থেকে হাওড়া পর্যন্ত সব স্টেশনের নাম মনে রাখার জন্য তৈরি করেছিলেন একটি নামাবলি-গান। তাতে আবার দু'ধরনের সুর—প্রভাতী আর গজল। ‘…আজিমগঞ্জ সিটি করি দরশন/ মুনিগ্রাম, গণকর পেরিয়ে/ জঙ্গিপুর আমার ঘর।’ একবার ট্রেনে আসতে আসতে উদাত্ত কণ্ঠে এই গান গাইছেন দাদাঠাকুর, এক টিকিট-চেকার তাঁকে বললেন অন্য স্টেশনগুলোই বা বাদ থাকে কেন? তাঁর মুখের কথা মুখেই রইল। দাদাঠাকুর চটজলদি গান ধরলেন—'সজনিপাড়া, নিমতিতা, ধুলিয়ান গ্যাঞ্জেস/ তিলডাঙা, বারহারোয়াতে শেষ। এ লাইনে দফা রফা/ তার পরে লুপ লাইন ধর।’

তবে, দাদাঠাকুরের সবচাইতে বিখ্যাত গান ‘কলকাতার ভুল’। এই গানকে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন নলিনীকান্ত সরকার। তিরিশের দশকের শেষদিকে একবার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে দিলীপকুমার রায়ের সংবর্ধনা সভায় নলিনীকান্ত গাইলেন এই গান—
মরি হায় রে,/ কলকাতা কেবল ভুলে ভরা/… আমি মুর্গিহাটায় চুপ করে যাই/ কিনতে রামপাখি,/ দেখি সারি সারি স্টেশনারি/ আসল জিনিস ফাঁকি/…নাইকো হাতি নাইকো বাগান/ হাতিবাগান বলে,/ বাদুড়বাগানেতে দেখি/ বাদুড় নাহি ঝোলে।’

সেদিন দর্শকাসনে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ নাকি ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এই গানের। একবার দিলীপকুমার রায়ের আমন্ত্রণে থিয়েটার রোডে তাঁর মাতুলালয়ে গেছেন দাদাঠাকুর। সেখানে আসরেও গাইলেন ‘কলকাতার ভুল’। গান শুনে শ্রোতাদের একজন বললেন, এই গানে থিয়েটার রোডের নাম নেই তো। দাদাঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে গেয়ে উঠলেন—‘থিয়েটার রোডে যে দেখি/ থিয়েটার তো নাই হায়/ তবে থিয়েটারের সাধ মেটালো দিলীপকুমার রায়।’ সাধে কি তাঁকে বাংলার শেষ কবিয়াল বলে ডাকত লোকজন।

বাংলার হাসির গানের ইতিহাস লেখা হলে দাদাঠাকুরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এমনিতে ভারী বর্ণময় চরিত্র ছিলেন দাদাঠাকুর। বাংলা ভাষায় প্যালিনড্রোমের প্রথম জন্মদাতাও তিনি। ‘কীর্তন মঞ্চ পরে পঞ্চম নর্তকী’র স্রষ্টাকে নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। এমন মানুষকে নিয়ে নানা কিংবদন্তি, গল্প জন্ম নেয়। সেইসবও দীর্ঘদিন মুখে মুখে ঘুরেছে মানুষজনের। তবে, এরই মধ্যে সামান্য হলেও আড়ালে চলে গেছেন গান রচয়িতা এবং অত্যন্ত সুগায়ক শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। হাসির গানের ভিতর সহাস্য চাবুক মারতেও যাঁর জুরি ছিল না। ভোট নিয়ে লেখা একটি গানের উল্লেখ করা যায় এই প্রসঙ্গে- ‘ভোট দিয়ে যা/ আয় ভোটার আয়। মাছ কুটলে মুড়ো দিব/ গাই বিয়োলে দুধ দিব/ দুধ খেতে বাটি দিব। সুদ দিলে টাকা দিব/ ফি দিলে উকিল হব/ চাল দিলে ভাত দিব/ মিটিং-এ যাব না/ অবসর পাব না/ কোনো কাজে লাগব না/ যাদুর কপালে আমার ভোট দিয়ে যা।’ প্রচলিত ছড়াকে ভেঙেচুরে এমন গানে পরিণত করেছিলেন তিনি। ভোটপ্রার্থীর ইমেজ দফারফা করা যাকে বলে। তেমনই আরেকটি ভোটের গানে ছিল—

‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিনু
ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে
(আমি ভিখারি না শিকারি গো)
মোরে হাঁ ছাড়া কেউ না বলিল না
ক্যানভাস করিনু যারে।’

কিছু কিছু গান দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক থেকে যায় স্রষ্টার গুণে। আর, সেই স্রষ্টা যদি দাদাঠাকুর হন তো বলাই বাহুল্য! ক্রমশ রসিকতা ভুলে হুঁকোমুখো হ্যাংলায় পরিণত হতে থাকা বাঙালিদের দিকে এমন সব গান কিংবা বোতলপুরাণ এগিয়ে দেওয়ার জন্য দাদাঠাকুরদের যে কী প্রয়োজন ছিল এখন! 

Developed by DXDasia