শ্রী রামকৃষ্ণের ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারকে হোমিওপ্যাথিতে হাতে খড়ি দেন বিদ্যাসাগর?
আজকাল চার পাশে পাশ না করা ডাক্তার নিয়ে সাংঘাতিক চর্চা চলছে। তাদের হাত কড়াও পরানো হচ্ছে। অবশ্য তাদের প্রায় সিংহ ভাগই অসাধু। কিন্তু আজকের হিসেবে দেখলে বিদ্যাসাগরকেও আমাদের ‘ভুয়ো’ ডাক্তার বলতে হয়। কিন্তু এই পাশ না করা ডাক্তারই তাঁর অন্যান্য কৃতিত্বের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাতেও নাম কিনেছিলেন। আবিস্কার করেছিলেন নতুন ওষুধ। কেবল তাই নয় সেকালের প্রবাদ প্রতিম অ্যালোপাথ ডাক্তারকে হাতে খড়িও দিয়েছিলেন হোমিওপ্যাথিতে।
বরাবরই সেবা অন্ত প্রাণ বিদ্যাসাগর। শহর কলকাতায় তখন কলেরার প্রকোপ। যে খানেই খবর পেতেন কলেরা রোগীকে অস্পৃশ্য করে রাখা হয়েছে সেখানেই চিকিৎসক বন্ধুকে নিয়ে বা একাই চলে যেতেন তিনি। তাঁর শুশ্রূষায় কত জন যে জীবন ফিরে পেয়েছেন তার কোনও হিসেব নেই। কেবল কলকাতাই নয়, পৌঁছে গেছেন প্রত্যন্ত গ্রামেও। অধ্যক্ষ ক্ষুদিরাম বসুর লেখায় পাই, একবার বর্ধমানের গ্রামকে গ্রাম ম্যালেরিয়ায় উজার হয়ে যায়। উলো, দ্বারবাসিনী সহ বিভিন্ন গ্রামে ছ মাস থেকে চিকিৎসা করেছিলেন বিদ্যাসাগর।
প্রচুর অর্থ ব্যয় করে হোমিওপ্যাথির বই কিনে চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন তিনি। বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন ওষুধ। ডাক্তারি শেখার জন্য নরকঙ্কাল পর্যন্ত কিনেছিলেন বিদ্যাসাগর। আর চিকিৎসা করতেন রীতি মতো ডায়রি মেনটেন করে। ইংরাজিতে লেখা সেই ডায়রি বর্তমানে সংরক্ষিত আছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে দুটি এন্ট্রি লক্ষ্য করা যাক। স্ত্রী দিনময়ী দেবীর চিকিৎসা করছেন ঈশ্বরচন্দ্র।
‘Dinamayi Devi
Thin watery evacuations-cutting pains in the bowels-violent chills; Execessive heat and thirst-
15.10.80 acontium 1
Every 2 hours
Cured 16.10.80’
পুত্রবধূ ভবসুন্দরীর চিকিৎসাও করছেন নিপুণ ভাবে-
‘Bhabasundari
Copious, tenacious, yellowish discharge from the female genital organs-
26.1.81 aconitium 6
Thrice daily
1.2.81 sepea 30
Thrice daily
Cured 15.2.81.’
সহকর্মী ক্ষুদিরাম বসু লিখছেন, ‘আমার একবার পেটের বায়রাম হয়েছিল। ব্রজেন বাঁড়ুয্যে, প্রতাপ মজুমদারদের ওষুধও ঠিক লাগছিল না। বিদ্যাসাগর মশায় আমায় দেখতে এসে বললেন-“ থাকবে?-না যাবে?” বেঁচে থাকতে চাও, না মরতে চাও? আমি একটু হাসলাম। তিনি বই খুঁজে খুঁজে আমাকে ওষুধ দিলেন। ২/৩ বার খেয়েই সুস্থ হলাম’।
ক্ষুদিরামকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শিখতে বলেন বিদ্যাসাগর। বই আর ওষুধ মিলিয়ে দেড়শ টাকার একটা ফর্দ করে দেন। সে যুগের দেড়শ টাকা! স্বভাবতই হতভম্ব এবং বিব্রত ক্ষুদিরাম। বিদ্যাসাগর সে কথা বুঝতে পেরে তাঁর তরুণ সহকর্মীটিকে টাকাটা ধার হিসেবে দেন। প্রথমে বিরক্ত হলেও আখেরে লাভ হয়েছিল ক্ষুদিরামের। তিনি লিখছেন, ‘ এখন কিন্তু মনে হয় কি উপকারই তিনি করে গিয়েছিলেন। এলোপ্যাথিক ডাক্তারখানায় আমার বাড়ির জন্য এখন বছরে যদি ২০ টাকার বিল হয়ত খুব বেশী। আমি হোমিওপ্যাথিতেই বাড়ীর ছোট খাটো রোগ সারাই। আমার ছেলে হিরণ যার বয়স ২৫/২৬ হবে, এই গত বছরে মাত্র প্রথম এলোপ্যাথিক ওষুধ খায়’।
সে যুগের বিখ্যাত অ্যালোপাথ ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার একসময় হোমিওপ্যাথিকে ‘হাতুরে চিকিৎসা’ মনে করতেন। সেই তিনিই নিজের মত পালটে পরবর্তীতে হোমিওপ্যাথি চর্চা করেন। আর এই চর্চার পিছনেও আছেন বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরের ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের লেখা থেকে জানা যায়, একবার একই গাড়িতে ভবানীপুর থেকে উঠেছিলেন তিনি, বিদ্যাসাগর এবং মহেন্দ্রলাল সরকার। শ্রী রামকৃষ্ণের ডাক্তারের সঙ্গে হোমিওপ্যাথির যথার্থতা নিয়ে প্রবল তর্ক জুড়েছিলেন বিদ্যাসাগর। সে বিবাদের স্বর এমনই উচ্চে পৌঁছেছিল যে শম্ভুচন্দ্র বলতে বাধ্য হন, ‘মশায় আমাকে নামিয়ে দিন, আপনাদের বিবাদে আমার কানে তালা লাগল’। এই মহেন্দ্রলালই পরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতেও খ্যাতি অর্জন করেন। ক্ষুদিরাম বসু এ প্রসঙ্গে বলছেন,‘মহেন্দ্র ডাক্তারকে ত তিনিই একরকম হোমিওপ্যাথিতে হাতে খড়ি দেন। লাল মিত্রের একসময়ে লিভার অ্যাবসেস হয়। মহেন্দ্র ডাক্তার দেখেশুনে ওষুধ দিয়ে গেলেন। তারপর বিদ্যাসাগর মশাই এসে রোগীকে দেখে সে ওষুধ আর দিতে দিলেন না। তিনি নিজে দেখেশুনে ওষুধ খাইয়ে তাঁর দুরারোগ্য রোগ সারিয়ে ছিলেন’।
বিদ্যাসাগরের নিজের হাঁপানি রোগ ছিল। শীতকালে সেই রোগ বেড়ে যেত। তিনি সকালে সন্ধ্যায় দু বেলা গরম চা পান করতেন। একদিন চা খাওয়ার পর অনুভব করলেন হাঁপানির টান যেন একটু বেশি মাত্রায় কম বোধ হচ্ছে। ভৃত্যকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন চায়ে আদা বা বিশেষ কিছু দেওয়া হয়েছিল কিনা। ভৃত্য বলে, না রোজ যেভাবে বানাই, সেভাবেই বানিয়েছি। বিদ্যাসাগরের সন্দেহ হয়। সরেজমিনে বিষয়টা খতিয়ে দেখতে রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের কেটলি খোলেন তিনি। যা দেখেন তাতে হতভম্ব বিদ্যাসাগর। কেটলিতে দুটো আরশোলা মরে পড়ে আছে। ভুবনকৃষ্ণ মিত্র লিখছেন, ‘তিনি দেখিলেন এক কেটলি জলে যখন ২টা আর্সোলা পড়িয়া তাঁহার হাঁপ অর্ধেক কমাইয়াছে, না জানি বহু পরিমাণে উহা জলে ফেলিয়া সিদ্ধ করিয়া, পরে এলকোহলে ফেলিয়া ছাঁকিয়া dilute করিয়া হোমিওপ্যাথি মতে ঔষধ বানাইয়া লোকের বা রোগীর অজ্ঞাতে সেবন করাইয়া এবং নিজেও ব্যবহার করিয়া দেখিব, হাঁপ কাসি সারে কি না?’
যেমন ভাবা তেমন কাজ। হোমিওপ্যাথি মতে ওই ওষুধ তৈরি করে অনেকের কষ্ট উপশম করেছিলেন বিদ্যাসাগর।