কল্পনা, প্রীতিলতা, বাঘাযতীনের পাশাপাশি আরও একজন ‘সংগ্রামী’ রয়ে যান, আড়ালে

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যিনি রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন, পেয়েছিলেন ‘পদ্মশ্রী’

সিস্টার ডরোথি তাঁর প্রিয় ছাত্রীকে দেখতে এসেছেন। ফৌজদারি মামলায় ৯ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত মেয়েটি। জেলের গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে সিস্টার। সময় আর যেন কাটতে চায় না। খানিক পরে সে এল। টানা চোখে, উদাস দৃষ্টি। আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না ডরোথি।
অবরুদ্ধ ক্ষোভে ফেটে পড়লেন…

“O, Bina, I love you so much. How could you do this?”

ঠান্ডা, অথচ নির্ভীক গলায় উত্তর এল,
“O Sister, I love you no less. But, I love my country more.”

কী করেছিলেন বীণা দাস?

৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯৩২।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান। তৎকালীন আচার্য অর্থাৎ রাজ্যপাল স্ট্যানলি জ্যাকসন ভাষণ পাঠ করছেন। হ্যাঁ, ইয়র্কশায়ারে খেলা সেই ক্রিকেটার স্ট্যানলি জ্যাকসন, দ্বিতীয় ‘বোয়ার’ যুদ্ধের নায়ক স্ট্যানলি জ্যাকসন। ব্রিটিশবিরোধী লড়াই চলছে ভারতজুড়ে। যার ফলস্বরূপ একমাস আগেই গ্রেপ্তার হয়েছেন গান্ধীজি এবং সর্দার প্যাটেল। টালমাটাল দেশ। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অনুষ্ঠান চলছে, সুললিত মার্জিত কায়দায়।

ভাষণ চলাকালীন, আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল গাউন পরা, একুশ বছরের এক তরুণী। হাতে রিভলভার। ২৮০ টাকা দামের আগ্নেয়াস্ত্রটি চুপিসাড়ে পাচার হয়েছিল রামমোহন গ্রন্থাগারে। পৌঁছে দিয়েছিলেন প্রাণের চেয়ে প্রিয় ‘কমলাদি’। বিপ্লবী কমলা দাসগুপ্ত। 

ট্রিগারে হাত রেখে বীণা’র হয়তো মনে পড়ছিল বাবাকে। চট্টগ্রামের ইস্কুলমাস্টার, বেণীমাধব দাসের প্রিয় এক ছাত্র, পরাধীনতার ভারে ধুঁকতে থাকা ভারতবর্ষকে একদা বলেছিলেন, “তোমরা আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” এহেন বেণীমাধবের দুই মেয়ে ‘ছাত্রী-সংঘে’ যে যোগ দেবেন বলা বাহুল্য। বাবার কাছেই বীণা পেয়েছিলেন সংগ্রামের মন্ত্র। শিখেছিলেন, শাসকের সামনে মাথা না নোয়াতে।

দুম! দুম! দুম! দুম! দুম! 

পরপর পাঁচবার গর্জে ওঠে পিস্তল। ভিড়ের মাঝে একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন বীণা। সাইড স্টেপ করে সরে যাচ্ছেন জ্যাকসন সাহেব। সমাবর্তন গৃহে কোলাহল। চেঁচামেচি। জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ল বীণার উপর। লহমায় হাতছাড়া হল পিস্তল। পুলিশের হাতে ধরা দিলেন অকুতোভয় তরুণী।

জেল থেকে জেলে পাচার করা হচ্ছে তাঁকে। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা। টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ। শারীরিক, মানসিক নির্যাতন। পরিবারকে সইতে হচ্ছে পুলিশি হেনস্থা। বেণীমাধব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন সরকারি চেতাবনী। ২৫ পৃষ্ঠার একটি বিবৃতি লিখলেন কন্যাকে সমর্থন জানিয়েই। আর বীণা? তাঁর মুখেই শুনে নেওয়া যাক বরং…

“…I have no sort of personal feelings against Sir Stanley Jackson, the man and Lady Jackson, the woman. But the governor of Bengal represents the system of repression which has kept enslaved Three hundred million of my countrymen and countrywomen.”

১৯৩৯ সালে গান্ধীজির প্রচেষ্টায় মুক্তি পেলেন তিনি। যোগ দিলেন অহিংস আন্দোলনে। কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী হিসেবে সংগঠন সামলাচ্ছেন। গড়ে তুলছেন ট্রেড ইউনিয়ন। তখন তিনি দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদিকা। টালিগঞ্জের চালকল বস্তিতে, শ্রমিক মহল্লায় দেখা যাবে তাঁকে। আবার কারাবরণ করছেন ১৯৪২ সালে, ভারতছাড়ো আন্দোলনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজ্যসভার সদস্যও হয়েছিলেন। পেয়েছিলেন ‘পদ্মশ্রী’।

গল্পটা এখানেই হয়তো শেষ হয়ে যেত। একজন সফল রাজনৈতিক কর্মীর উত্তরণের গল্প। কিন্ত তা হয়নি। ধীরে ধীরে রাজনীতির প্রতি জন্মাছিল বিতৃষ্ণা। শোনা যায়, স্বামী যতীশ ভৌমিকের মৃত্যুর পর লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। কানাঘুষো শোনা যায়, তিনি হৃষিকেশে একটি আশ্রমে শিক্ষকতা করতেন নিভৃতে।

১৯৮৬ সালের, ২৬ ডিসেম্বর। হরিদ্বারের ঘাটে পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা। নিথর, প্রাণহীন অবস্থায়। বেওয়ারিশ দেহটি চালান হল মর্গে। প্রচুর তল্লাশির পর  মিলেছিল হদিস। চমকে উঠেছিল ভারতবাসী। 

একুশ বছরের এক চট্টগ্রামের কিশোরী সেদিন ভয় পায়নি, শাসকের চোখে চোখ রাখতে। কল্পনা, প্রীতিলতা, বাঘাযতীনের পাশাপাশিই তো তাঁর নাম জনসাধারণের মুখে মুখে ফেরার কথা। তা আর হল কই!

তথ্যঋণঃ প্রীতম চট্টোপাধ্যায়, জোবিতা আরানহা, শ্রুতি সিংহল
চিত্রঋণঃ ঋতম সেনগুপ্ত

Developed by DXDasia