এ বাড়িতে জলস্পর্শ করব না, প্রিয় শিক্ষককে বললেন বিদ্যাসাগর

গুরুকে শ্রদ্ধা করলেও তাঁর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কুন্ঠা বোধ করেননি বিদ্যাসাগর

কলকাতায় এসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও ঈশ্বরচন্দ্রের প্রধান শিক্ষাগুরু ছিলেন তাঁর বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রত্যেকদিন রাতে বাবাকে পড়া দিতে হত। লেখাপড়ায় এতটুকু বেচাল দেখলেই জুটতো বাবার হাতে প্রবল মারধর। কাজকর্ম সেরে ঠাকুরদাসের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ন-টা বেজে যেত। আর ফিরে যদি দেখতেন ঈশ্বর লেখাপড়া না করে ঘুম দিয়েছে, তখন আর রক্ষে নেই। ঘুমন্ত বালককে তুলে চলত রাম পেটানি। এমনকি বাড়িওলা পর্যন্ত একবার ঠাকুরদাসের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে বলেছিলেন, আপনি অন্যত্র চলে যান, এভাবে মার খেলে ছেলেটা মরে যাবে আর আমরা ব্রাহ্মণ হত্যার ভাগীদার হব।

আর ছোটোবেলা থেকেই একগুঁয়ে আর গোঁয়ার ঈশ্বরচন্দ্রকে যা বলা হত, তিনি করতেন ঠিক তার উল্টো। তাই ছেলেকে সোজা রাখতে ঠাকুরদাসের টোটকাও ছিল আজব। তিনি যা চাইতেন, ঈশ্বরকে ঠিক তার উল্টো করতে বলতেন। হয়তো ঠাকুরদাস চাইছেন ঈশ্বর স্নান করুক। তখন তিনি বলতেন, না, ঈশ্বর, আজ তোমার স্নান করা হবে না। বেশ এই শুনেই আমাদের ‘বাঁকাবাবু’ ঈশ্বর বাবাকে অমান্যি করার জন্য তেল-টেল মেখে জলে ডুব দেওয়ার জন্য তৈরি। নিজের ছেলের এমন গোঁয়ার-গোবিন্দ হাবভাবের জন্য ‘এঁড়ে বাছুর’, ‘ঘাড়কেঁদো’ এইসব নামকরণ করেছিলেন ঠাকুরদাস।

ছোটোবেলা থেকেই রসবোধে অতুলনীয় ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। আর তাঁর সেই রসচর্চায় মদত দিতেন তাঁর মাস্টারমশায়েরা। তখন সদ্য শিক্ষক প্রেমচন্দ্রের তাগিদে সংস্কৃত রচনা লিখে পুরষ্কার পেয়েছেন ঈশ্বর। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায়, সাহিত্যশাস্ত্রের অধ্যাপক জয়গোপাল তর্কালঙ্কার চান তাঁর ছাত্ররা সকলে সংস্কৃতে পদ্য লিখুক। ঈশ্বর একাধিকবার গুরুর অনুরোধ রাখেননি। কিন্তু পুরষ্কার পাওয়ার পর তাঁকে পদ্য লিখতে জোর জবরদস্তি করলেন জয়গোপাল। তাঁর শর্ত, পদ্যের চতুর্থ চরণে ‘গোপালায় নমহস্তু মে’ থাকতে হবে। তাই শুনে ঈশ্বরের প্রশ্ন, আমরা কোনও গোপালের বন্দনা করব? এক গোপাল আমাদের সামনে রয়েছেন, আরেক গোপাল তো বহুদিন আগে বৃন্দাবনে লীলাখেলা করেছেন। আপনি কোন গোপালকে চান বলুন। রসিক ঈশ্বরের প্রশ্নের জবাবে সহাস্য জয়গোপাল বললেন, বৃন্দাবনের গোপালেরই স্মরণ নাও। এক ঘণ্টায় পাঁচটি শ্লোক লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র।

জয়গোপালের বাড়িতে ঘটা করে সরস্বতী পুজো হত। পুজোর দিন ছাত্ররা দিনে-রাতে তাঁর বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া করত। আর পুজোর আগের দিন ছাত্রদের জয়গোপাল সংস্কৃত শ্লোক লিখতে দিতেন সরস্বতীর বর্ণনা করে। ঈশ্বর কিছুতেই লিখতে চান না। কিন্তু একবার এড়াতে পারলেন না গুরুকে। তাঁর অনুরোধে লিখলেন মজার একটি শ্লোক-
‘লুচি কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম্‌
যস্যা প্রসাদেন ফলারমাপ্লুমঃ
সরস্বতী সা জয়তান্নিরন্তরম’

ছাত্রের লেখা এই শ্লোক জনে জনে ডেকে ডেকে শোনান শিক্ষক জয়গোপাল। শিক্ষকদের অপরিসীম শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন বিদ্যাসাগর। তা বলে অন্যায় করলে প্রশ্রয় দেওয়ার লোক ছিলেন না ঈশ্বর। চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় আমরা সেরকমই একটি ঘটনার কথা পাই। বেদান্তের অধ্যাপক শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতির খুব প্রিয় ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র। গুরুর বহু সেবা শুশ্রূষাও করেছেন তিনি। একবার বৃদ্ধ শম্ভুচন্দ্রকে তাঁর কিছু আত্মীয় পরামর্শ দিলেন, আপনার একলার সংসারে বড়ো কষ্ট। আপনি বিয়ে করুন। বৌ-এলে সংসারের সমস্যার সুরাহা হবে। গরিব ব্রাহ্মণের সুন্দরী কন্যার হদিশ মিলল। বৃদ্ধ শিক্ষক ছাত্র ঈশ্বরের মত চাইলেন। গুরুর সমস্ত কথা শুনলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু সায় দিতে পারলেন না। বললেন, এই বুড়ো বয়সে আপনার নতুন করে সংসার করা কিছুতেই উচিত কাজ হবে না। আসলে বালিকা বধূটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছুতেই মত দিলেন না বিদ্যাসাগর। গুরুকে সাফ বলে দিলেন, বিয়ে করা তো দূর অস্ত, বিয়ে করার কথা ভাবলেও আপনার পাপ হবে।

শিষ্যকে কাকুতি মিনতি করেও তাঁর মত আদায় করতে পারেননি শম্ভুচন্দ্র। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিয়ে করেছেন। আর বুড়ো বয়সে গুরুর এক অল্পবয়সী মেয়েকে সংসারে নিয়ে আসাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি বিদ্যাসাগর। তা সত্ত্বেও শম্ভুচন্দ্রের বারংবার অনুরোধ, ঈশ্বর তোমার নতুন মা-কে একবার অন্তত দেখে যাও। গুরুপত্নী মাতৃসমা। বাধ্য হয়েই অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে হল। কিন্তু ঘোমটার নিচে বধূটির মুখের দিকে একবার চাইল না ঈশ্বর। পায়ের কাছে দু’ টাকা রেখে দূর থেকে নমস্কার করল। শম্ভুচন্দ্র ছাত্রের হাত ধরে অনুরোধ করলেন, তোমার মা-কে একবারটি দেখে যাও। বাধ্য হয়েই নতুন বউ-এর দিকে তাকালেন বিদ্যাসাগর। আর কিছুদিনবাদেই ভব সংসারের মায়া কাটিয়ে প্রৌঢ় শম্ভুচন্দ্রকে চলে যেতে হবে। আর সেই অনাগত ভবিষ্যতে বধূটি কী পরিমাণ দুরবস্থায় পড়বে সে কথা ভেবে নিজের অশ্রু রোধ করতে পারলেন না বিদ্যাসাগর। ঝরঝর করে কাঁদতে লাগলেন। বেগতিক দেখে ঈশ্বরকে অন্যপ্রান্তে নিয়ে গিয়ে নানা কথায় বোঝাতে লাগলেন শম্ভুচন্দ্র। তাঁকে কিছু মুখে দিতে অনুরোধ করায় বিদ্যাসাগর বললেন, এ ভিটেয় আমি আর জলস্পর্শ করব না।

গুরুকে শ্রদ্ধা করলেও তাঁর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কুন্ঠা বোধ করেননি বিদ্যাসাগর। কথা রেখেছিলেন। জীবনেও শম্ভুচন্দ্রের গৃহে গিয়ে আর জলস্পর্শ করেননি তিনি।

Developed by DXDasia