কলকাতায় যাওয়ার সময় ভাই আর গ্রামবাসীদের বললেন, তোমরা আমাকে দেশত্যাগী করলে
বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, বীরসিংহবাসী, আত্মীয়-বন্ধু থেকে অজানা ও অচেনা অনেকেই বিদ্যাসাগরের অর্থানুকূল্যে প্রতিপালিত হয়েছেন। আবার তাদের কাছ থেকেই বঞ্চনা জুটেছে বিদ্যাসাগরের। একবার শুনলেন, অমুকে তাঁর নামে অকথা-কুকথা বলছে। শুনে হেসে বললেন, আমাকে গাল পাড়ছে, কই আমি তো তার কোনও উপকার করিনি।
বিধবা বিবাহ প্রচলন করলেও একবার বিধবা বিবাহ দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না বিদ্যাসাগর। আর তাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্র, ঈশানচন্দ্র ও বীরসিংহের কিছু বাসিন্দাদের উদ্যোগে সেই বিয়ে হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রবল আঘাত পান তিনি। কলকাতা থেকে মুচিরাম বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিধবা কন্যা মনমোহিনী এলেন বীরসিংহে, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে। সঙ্গে বিদ্যাসাগরের একমাত্র ছেলে নারায়ণচন্দ্রের চিঠি। তাতে লেখা ক্ষীরপাই নিবাসী মুচিরাম এবং ওই বিধবা কন্যা বিবাহ করতে চান। কিন্তু ক্ষীরপাই-এর অনেকেই এই বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে। তাই তাঁরা সাহায্যপ্রার্থী। বিদ্যাসাগর যতদিন না গ্রামে আসতে পারছেন, ততদিন এদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেন রাখা হয়। চিঠি পেয়ে শম্ভুচন্দ্র তাঁদের আশ্রয় দেন।
অন্যদিকে ক্ষীরপাই-এর হালদার বাবু বিদ্যাসাগরের কাছে সকাতর নিবেদন করেন মুচিরামের এই বিয়ে যেন না হয়। হালদারবাবুর সেই প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে বিদ্যাসাগর তাঁকে কথা দেন এই বিয়ে হবে না। কিন্তু কেন বিদ্যাসাগর পিছিয়ে এলেন। এ প্রসঙ্গে চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় সহজে এরূপ ভাবে এক ব্যক্তিকে সহায়তা হইতে বঞ্চিত করিতে সম্মত হইবার লোক ছিলেন না। কিন্তু যাঁহারা ইতি পূর্ব্বে বহুবার বিধবাবিবাহের অনুষ্ঠানে সহায়তা করিয়াছেন, এরূপ বহুসংখ্যক সম্ভ্রান্ত লোক বহুবিধ কারণ দর্শাইয়া এই কার্য্যের সহায়তায় বহু সাধ্য সাধনা করায়, অগত্যা বিদ্যাসাগর মহাশয় ঐ বিবাহে কোনও সংস্রব রাখিবেন না বলিয়া অঙ্গীকার করেন’। তাই বাড়ি ছেড়ে মনমোহিনীকে চলে যেতে হয়। বিদ্যাসাগরের আরেক ভাই ঈশানচন্দ্রের পরামর্শে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় পান মনমোহিনী। সেই প্রতিবেশীর নাম সনাতন বিশ্বাস। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন এই বিধবার বিবাহ দেওয়ার। বিদ্যাসাগরের মতকে অগ্রাহ্য করে বীরসিংহের কিছু বাসিন্দার ইচ্ছা ও উদ্যোগে এ বিয়ে হয়ে যায়। যদিও পাত্র মুচিরামের স্মৃতিচারণায় নিজের বিয়ের জন্য তিনি বিদ্যাসাগরের ভাই শম্ভুচন্দ্রকেই সমস্ত ‘কৃতিত্ব’ দিয়েছেন।
বিদ্যাসাগর ক্ষীরপাই বাসিন্দাদের কাছে কথা দিয়ে না রাখতে পারায় ছোট হয়ে যান। তিনি ঈশানচন্দ্রের কাছে জবাবদিহি চান। কিন্তু ঈশান একগুঁয়ে। তিনি এ বিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। আসলে বিধবাবিবাহ আন্দোলনের রাশ তখন বিদ্যাসাগরের হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। এদিকে কথা রাখতে না পারার ক্ষোভে বিদ্যাসাগর চিরদিনের মতো জন্মভূমি ত্যাগ করলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন, আর আমি দেশে আসব না। কিছু দিন গ্রামে থেকে বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, বালিকা বিদ্যালয় প্রভৃতির জন্য পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে কলকাতায় যাওয়ার সময় ভাই আর গ্রামবাসীদের বললেন, তোমরা আমাকে দেশত্যাগী করলে।
অথচ এই জন্মভূমি বীরসিংহের জন্য কী না করেছেন বিদ্যাসাগর। গ্রামের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসালয় কিছুই বাদ দেননি। জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর যাতে বীরসিংহবাসীর কোনও কষ্ট না হয় এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলি যাতে বন্ধ না হয় তার জন্যও মাসে মাসে অর্থের ব্যবস্থা করে গিয়েছেন তিনি। সেই বীরসিংহের বাসিন্দারাই বিদ্যাসাগরের একটি ইচ্ছের মর্যাদা রাখেননি। আর তাঁরই অন্ন এবং স্নেহে প্রতিপালিত তাঁর সহোদর শম্ভুচন্দ্র এই বিধবাবিবাহে বিদ্যাসাগরের পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘যথোচিত’ প্রতিদান দিয়েছেন অগ্রজকে। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর ভাই তাঁর বিরুদ্ধে ‘পশ্চাৎপদতা এবং কাপুষতার’ অভিযোগ এনেছেন। এ বিষয়ে চন্ডীচরণ লিখেছেন, ‘আজীবন জ্যেষ্ঠের অন্নে পালিত হইয়া এখনও তাঁহারই আনুকুল্যে দেহধারণ করিয়া তাঁহাকে ঐ রূপ মধুর বিশেষণে অভিহিত করিয়া আত্মীয়গণের নিকট এবং জনসাধারণ সমীপে অব্যাহতি পাওয়া কেবল আমাদের দেশেই সম্ভব’।
বিদ্যাসাগর আর সশরীরে কোনওদিন গ্রামে ফিরে যাননি। তবে জীবনের শেষ পর্বে একবার ডাকবাক্সে পেয়েছেন এক বিচিত্র চিঠি, একটি পুস্তিকা। নাম-স্বাক্ষর বিহীন সেই পুস্তিকার নাম ‘বীরসিংহ জননীর পত্র’। দীর্ঘ সেই চিঠিতে কাতর নিবেদন পূর্বক লেখা, ‘বাবা ঈশ্বরচন্দ্র, তুমি কি স্নেহ ও মমতায় জলাঞ্জলি দিয়া একেবারে এ অভাগিনীকে ভুলিয়া গেলে’? চিঠির ছত্রে ছত্রে যেন বেদনাতুর মাতৃভূমি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। কে লিখেছিলেন সেই স্বাক্ষর বিহীন চিঠি। চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি বিদ্যাসাগরের পুত্র নারায়ণচন্দ্রের লেখা। সত্য জানা কঠিন। তবে জীবনের শেষ দিকে একবার বিদ্যাসাগর বীরসিংহে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সে বাসনা আর পূর্ণ হয়নি।