সেদিনও আঘাত নেমে আসছিল মানুষটির ওপর

দেহরক্ষী শ্রীমন্ত সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগরকে

সেদিন যেখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হল, তার কাছেই ঘটেছিল ঘটনাটা। ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির সামনেই। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে তা হাঁটাপথই। ১৮৫৫ সাল। ভরপুর শীতে কলকাতা কম্পমান। তবু সেই শীতের রাতে কাদের চোখে যেন ঘুম নেই। ঘুম উড়িয়েছে কে? না, বীরসিংহ গ্রামের বিদ্যাসাগর। কীভাবে? সে বলে কিনা বিধবাবিবাহ দেবে। সংস্কৃত কলেজের লাইব্রেরি তোলপাড় করে সে কেবলি প্রমাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। উঁহু, চেষ্টা চালাচ্ছে বললে ভুল হবে। প্রমাণ সে করেই ফেলেছে। দু-খানা বইও লিখে ফেলেছে, বিধবাবিবাহের পক্ষে যুক্তি খাড়া করে। তাঁকে কি ছেড়ে দেওয়া যায়? ধর্মকারার প্রাচীরে সে বজ্র হানছে, এতই তার স্পর্ধা! 

তাই সেই শীতের রাতে  তাঁকে ঘিরে ফেলল। উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট। মানুষটিকে ফেলে মারবে তারা। শিক্ষা দেবে ভালো করে। তবে বিদ্যাসাগর আগেই আন্দাজ করেছিলেন, এমন আঘাত আসতেই পারে। তাই সঙ্গে বডিগার্ডও রেখেছিলেন। শ্রীমন্ত নাকি তাঁর নাম। তাঁরই উপস্থিতি ও দক্ষতা সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিল বিদ্যাসাগরকে। ভাবলে অবাক লাগে। এতদিন পর সেই একই রাস্তায় আবার আক্রমণ হল বিদ্যাসাগরকে ঘিরে। কী বলব একে? ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে…?’

সে আপনি একে জোর করে সূত্র মেলানো বলতেই পারেন। কিন্তু ঘটনা পরম্পরা দেখলে সত্যিই কেমনভাবে যেন সব মিলে যায়। বিদ্যাসাগর যতই বিধবাবিবাহর পক্ষে সওয়াল করছেন, শহর যেন ততই দাঙ্গামুখর হয়ে উঠছে। আর বিদ্যাসাগর বলছেন, লাগুক দাঙ্গা। তবু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে তিনি নড়বেন না। প্রথম যখন বিধবাবিবাহর পক্ষে শাস্ত্রীয় যুক্তি দিলেন বিদ্যাসাগর, তখন তাঁকে ঘিরে সভা বসল রাজা রাধাকান্ত দেবের বাড়িতে। বিদ্যাসাগর তাতে জিতলেন না। জিতলেন ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন। পুরস্কার হিসেবে রাধাকান্ত দেব তাঁকে দিলেন বহুমূল্য একটি শাল। সেই শাল গায়ে দিয়ে তিনি এবার শুরু করলেন বিদ্যাসাগর-বিরোধিতা। অবশ্যই তাঁর সঙ্গে হিন্দুসমাজের মাথারা। 

বিদ্যাসাগরও লেগে পড়লেন কাজে। ‘ভারতবর্ষীয় ব্যবস্থাপক সভা’র কাছে দরখাস্ত পাঠালেন তিনি। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে কালীপ্রসন্ন সিংহ, দ্বারকানাথ মিত্র, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বর গুপ্ত, রামগোপাল ঘোষ মিলে হাজার জন স্বাক্ষর করলেন সেখানে। ১৮৫৫ সালের ৪ অক্টোবর প্রায় পঁচিশ হাজার লোক জমা হয়ে সেই ঐতিহাসিক আবেদনপত্র দাখিল করেন। আর বিরোধীপক্ষ দাখিল করেছিল ছত্রিশ হাজার সাতশো তেষট্টি জনের স্বাক্ষর। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই সংখ্যালঘিষ্ঠরা জিতে গেলেন ব্যবস্থাপক সভার লড়াইয়ে। বিধবাবিবাহের দাবি মানবিকতার মর্মে জয়ী হল। আজকের দিন হলে কী হত অবশ্য বলা যায় না।

কিন্তু শুধু আইন হলেই তো আর সমাজবদল হয় না। বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিত্ব তা জানতেন খুব ভালো করে। তাই দায়িত্ব নিয়ে আয়োজন করলেন বিধবাবিবাহর। খুঁজে বের করলেন এমন এক পাত্র, যে প্রকৃতই বিধবাবিবাহর সমর্থক। পাত্র অবশেষে মিলল। যশোরের রামধন তর্কবাগীশের পুত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। আর পাত্রী বর্ধমান-নিবাসী ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা কালীমতী দেবী। মাত্র ছয় বছর বয়সে যে বিধবা হয়েছিল। 

উভয়ের বিবাহ হয়েছিল কলকাতার ১২ নম্বর সুকেস স্ট্রিটের বাড়িতে। সেই বাড়িটি আজও আছে, ঠিকানা খানিক অদলবদল করে। তার পরিচয় এখন ৪৮-এ ও ৪৮-বি কৈলাস বসু স্ট্রিট। পরস্পর লাগোয়া দুটি বাড়ি। কলকাতার বুকে সেখানেই অনুষ্ঠিত হল প্রথম বিধবাবিবাহ। ৭ডিসেম্বর, ১৮৫৬। সেই অনুষ্ঠান দেখতে উপচে পড়েছিল গোটা কলকাতা। কেউ নিন্দা করেছিল, কেউ বা হতবাক হয়ে গিয়েছিল সেই পট-পরিবর্তন দেখে।

বন্ধুদের সাহায্য মিললেও মূলত একার চেষ্টাতেই কিন্তু বিদ্যাসাগর এত বড়ো কাজটি করেছিলেন। রাজা-মহারাজার উপাধি বা সম্পত্তি কিছুই তাঁর ছিল না। ছিল এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সাহসী মনন। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় বাংলাদেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি করে গেছেন। প্রয়োজনমতো ব্রাহ্মণ্যবাদকে নস্যাৎ করেছেন। সংস্কৃত কলেজ তিনি খুলে দিয়েছিলেন শূদ্রদের জন্য।

যেখানে তাঁর মূর্তি ভাঙা পড়ল, সেই বিদ্যাসাগর কলেজের জন্মও তাঁরই হাত ধরে ১৮৭২-এ। তখন নাম ছিল, মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন। কলেজের সমস্ত শিক্ষক ভারতীয়। দেশীয় অধ্যাপকদের দ্বারাও যে উচ্চমানের শিক্ষা সম্ভব– তা বুঝিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। আর অবশ্যই কলেজটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। হিন্দু কলেজে সাহেব অধ্যাপকদের রমরমা তখন। ছাত্রেরাও তৈরি হচ্ছিল বিদেশি আদবকায়দায়। সেখানে সম্পূর্ণ দেশি ছাঁদে উচ্চশিক্ষাকে গড়ে তোলার উদাহরণ বিদ্যাসাগরই রেখেছিলেন। দেশীয় সংস্কৃতি, ভাষার ওপরে দাঁড়িয়েই নির্মাণ করেছিলেন বৃহত্তর পৃথিবীকে দেখাশোনার পথ। সেই পথ এক অদ্ভুত মিলনের পথ। বৈরিতা বা বৈষম্যের নয়। মেট্রোপলিটন কলেজ সেসময় বাস্তবিকই হিন্দু কলেজের তুলনায় কোনো অংশে পিছিয়ে-পড়া ছিল না। গোটা দেশের মধ্যে এই কলেজেই প্রথম বাণিজ্যবিভাগের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বিদ্যাসাগরের হাতে।

একা একজন মানুষ হাজারটি সামাজিক বাধা পেরিয়ে বিধবাবিবাহ, নারীশিক্ষার জন্য একের পর এক স্কুল স্থাপন, পাঠ্যপুস্তক রচনা, সাহিত্য রচনা, মূলনিবাসী মানুষের সেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা যেভাবে চালিয়ে গিয়েছেন। কর্মাটারে আদিবাসী মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষার সুব্যবস্থার জন্য নিংড়ে দিয়েছেন নিজেকে। একটা নতুন সময়কে গেঁথে দেওয়ার জন্য প্রাণপাত করেছেন সংস্কারাচ্ছন্ন এই দেশে। পাশাপাশি, বাংলা ভাষাকেও নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন বিদ্যাসাগর। বদলে তাঁকে আমরা কিছুই দিতে পারিনি। 

উপকার করলে মানুষ যে আঘাত ফিরিয়ে দেয়, জীবৎকালেই তা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন বিদ্যাসাগর। একটা জাতি যখন পিছনে মুখ করে ছুটতে চাইছে অন্ধকার বয়ানে, সেখানে বিদ্যাসাগরের উপস্থিতি বড়োই অস্বস্তিকর। সে উপস্থিতি যতই প্রাণহীন মূর্তির হোক না কেন। আঘাত সইতে অভ্যস্ত যে তিনি। আর আমরা আঘাত দিতে। 

Developed by DXDasia