
নিজের বাড়ি তৈরি করার আদৌ কোনও বাসনা ছিল না বিদ্যাসাগরের। কেবল বিপুল বইয়ের সম্ভারকে সুরক্ষিত রাখাই চিন্তা ছিল তাঁর।
১। সংস্কৃত কলেজে পড়িবার সময় বিদ্যাসাগর পিতা ঠাকুরদাস ও কনিষ্ঠ ভ্রাতৃগণের সহিত উত্তররাঢ়ী কায়স্থ জমিদার জগদ্দুর্লভ সিংহের বড় বাজার ১৩ নং দয়েহাটা স্ট্রীটের (বর্তমান নাম দিগম্বর জৈন টেম্পল রোড) বাটীতে থাকিতেন।
২। পরে পিতা সে বাটী পরিত্যাগ করিয়া বহুবাজারে হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাটীর বিপরীত (দক্ষিণ) দিকে ১৫ নং হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলিতে আনন্দ চন্দ্র সেনের বাড়িতে প্রায় তিন বৎসর বাস করেন। বিদ্যাসাগর ও তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতারাও সেখানে থাকিতেন।
৩। পরে হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহির্বাটীর (৫৪নং হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলি) দুইটি ঘর ভাড়া লইয়া পিতা-পুত্রে বাস করেন। কিছুকাল পরে সমগ্র বহির্বাটী মাসিক ৮ টাকা ভাড়ায় লইয়াছিলেন। এইখানেই হৃদয়রাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌত্র রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত তাঁহার ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত হয়।
৪। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হইবার পর বিদ্যাসাগর কিছুকাল সংস্কৃত কলেজের একতলার একটি ঘরে থাকিতেন। সেই ঘরের সম্মুখে কোদাল দিয়া মাটি কাটিয়া কুস্তির আখড়া প্রস্তুত করিয়াছিলেন। প্রতিদিন কুস্তি করিতেন। কোন লজ্জা সংকোচ ছিল না।
৫। তাহার পর বর্তমান কলেজ স্ট্রীট বাজারের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি একতলা বাড়িতে থাকিতেন। সে বাড়ি এখন নাই। তখনও বহুবাজারের বাসাবাড়ি ছিল। সেখানে ভাইয়েরা, আত্মীয়, কুটুম্ব ও কলিকাতায় আগত গ্রামের লোকেরা থাকিত।
৬। তাহার পর মেছুয়া বাজার স্ট্রীটের একটি একতলা বাড়ি ভাড়া করিয়া কিছুকাল ছিলেন। এ বাড়িটি সনাক্ত করিতে পারা যায় নাই। তখনও বহুবাজারের বাসাবাড়ি ছিল।
৭। তাহার পর যকৃতের বেদনা অত্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি ঐ বাসা ত্যাগ করিয়া কিছুকাল রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে ছিলেন। সেখানে রাজকৃষ্ণ বাবুর পরিবারের সকলেই তাঁহার সেবা করিত। তখনও বহুবাজারের বাসাবাড়ি ছিল।
৮। তাহার পর ৬৩নং আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাড়ি ভাড়া করিয়া কিছুকাল বাস করেন।
৯। ১৮৭১ সনের মে-জুন মাস হইতে কলিকাতার উত্তর উপকণ্ঠে কাশীপুরের গঙ্গাতীরে বাবু হীরালাল শীলের এক বাঙ্গলো বাড়িতে মাসিক ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়া কিছুকাল বাস করেন।
১০। অবশেষে ১৮৭৬ সনে বাদুড় বাগানে ২৫ নং বৃন্দাবন মল্লিক লেনে (বর্তমান ৩৬নং বিদ্যাসাগর স্ট্রীটে) একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করেন। গৃহপ্রবেশ করেন ১৮৭৭ সনের জানুয়ারি মাসে।
বিদ্যাসাগরের নিজস্ব বাটী নির্মাণ করিবার আদৌ ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সংস্কৃত, বাংলা, ইংরাজী, হিন্দী, ফার্সী প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় প্রায় ১৬০০০ পুস্তকের তাঁহার একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিয়াছিল। তিনি ঐ পুস্তকগুলিকে অত্যন্ত যত্ন করিতেন। বহু অর্থব্যয় করিয়া সেগুলিকে বাঁধাইয়াছিলেন। উত্তমরূপে বই বাঁধান বিদ্যাসাগরের একটিমাত্র বিলাস ছিল। ঐ পুস্তকগুলিকে রক্ষা করিবার জন্যই প্রধানত তাঁহাকে নিজস্ব বাটী নির্মাণ করিতে হইয়াছিল। এই বাটীতে বিদ্যাসাগর জীবনের অবশিষ্ট ১৪ বৎসর অতিবাহিত করিয়াছিলেন এবং এই বাটীতেই দেহত্যাগ করেন।
(‘ঐতিহাসিক’ পত্রিকার ১৯৭৬ সালের অক্টোবর সংখ্যায় রাধারমণ মিত্র'র রচনা ‘কলিকাতায় বিদ্যাসাগর’- থেকে সংকলিত)
