
অত্যাচারী সিম্পসনকে হত্যা করা হয়
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আপোসহীন মনোভাব নিয়েছিল বাংলার যুবসমাজের বড়ো অংশ। তাই বিপ্লবী আন্দোলনের এক প্রধান ঘাঁটি হয়ে ওঠে বাংলা। অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দলের নানা কার্যকলাপ ইংরেজ শাসকের ভীত করে তোলে। অরবিন্দ ঘোষ, ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, বাঘাযতীন, উল্লাসকর দত্তের মতো অগ্নিযুগের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা পথ হিসেবে বেছে নেন সশস্ত্র অভ্যূত্থানকে। একের পর এক অত্যাচারী ইংরেজ প্রশাসককে হত্যা করা হয়। ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র বসু গড়ে তোলেন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স বা বিভি।
বাংলার কারা বিভাগের ইনস্পেকটর জেনারেল এনএস সিম্পসন ছিলেন ভয়ানক অত্যাচারী। ভারতীয় কারাবন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন। বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের বিপ্লবীরা সিম্পসনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, সচিবালয় রাইটার্স বিল্ডিংয়ে হামলা চালিয়ে শাসকদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করা। সেই কাজের দায়িত্ব পান তিন অল্পবয়সী তরুণ – বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত।
বিনয়কৃষ্ণ বসু প্রথম জীবনে যুগান্তর দলে ছিলেন। পরবর্তীকালে যোগদান করেন বিভি-তে। পুলিশ ইনস্পেকটর জেনারেল লোম্যানকে হত্যা করে গা ঢাকা দেন। বাদলের আসল নাম সুধীর গুপ্ত। তিনি ছিলেন বিভি-র অ্যাকশন স্কোয়াডের লেফটেন্যান্ট। দীনেশচন্দ্র গুপ্ত ঢাকা এবং মেদিনীপুরে সংগঠনের কাজ করতেন। নিজের দক্ষতায় বিভি বাহিনীর সাধারণ সদস্য থেকে উন্নীত হন ক্যাপ্টেনের পদে।
বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর তারিখে বিনয়, বাদল ও দীনেশ ইউরোপীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে রাইটার্স ভবনে ঢোকেন ও সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। টেগার্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী তখনই শুরু করে গুলি বর্ষণ। পাল্টা জবান দেন বিপ্লবীরাও। টেয়ানাম, প্রেন্টিস, নেলসন-সহ কয়েকজন পুলিশ অফিসার গুলিযুদ্ধে আহত হন। অসম লড়াই বেশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া তিন বিপ্লবীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে পুলিশের কাছে ধরা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না কারো। বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বিনয় ও দীনেশ। হাসপাতালে ১৩ ডিসেম্বর বিনয়ের মৃত্যু ঘটে।
গুরুতর আহত অবস্থায় দীনেশকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বাঁচিয়ে তোলে পুলিশ। তারপর বিচারের মুখোমুখি করা হয় তাঁকে। ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। দীনেশ কারাগারে বসে কয়েকটি মূল্যবান চিঠি লেখেন, যাতে বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং গভীর দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই আলিপুর জেলে তাঁর ফাঁসি হল।
তিন বিপ্লবীর এই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বাধীনতার পর কলকাতার ডালহৌসি চত্বরের নাম দেওয়া হয় বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ।

