মোগলমারির বৌদ্ধ প্রত্নস্থল হোক আপনার পরবর্তী গন্তব্য

এখানে পাওয়া গিয়েছে প্রাচীন যুগের বৌদ্ধ বিহার

প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলি দেখতে বেশিরভাগ মানুষই চলে যান বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে। তবে আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও অল্প কিছু বৌদ্ধ প্রত্নস্থলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। মালদা জেলার জগজীবনপুরের প্রাচীন মঠের কথা এই প্রসঙ্গে বলা যায়। সম্প্রতি আরেকটি বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসস্তুপ পর্যটক ও গবেষকদের আগ্রহ সঞ্চার করেছে। বাংলা-ওড়িশা সীমান্তে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ছোট্ট গ্রাম মোগলমারি। এখানেই আবিষ্কৃত হয়েছে এক প্রত্নক্ষেত্র। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এখানে বৌদ্ধধর্মের চর্চা করা হত। প্রাচীন ভারতের বিক্রমশীলা, সোমপুর, নালন্দা প্রভৃতি মহাবিহারের মতো এখানেও প্রচুর ভিক্ষু বসবাস করতেন। 

প্রাচীন বৌদ্ধ মহাবিহারগুলির মধ্যে এটি অন্যতম

গবেষকরা বলেন, প্রখ্যাত চিনা পর্যটক হিউ-এন-সাং তাঁর গ্রন্থ ‘সি-ইউ-কি’-তে এই বৌদ্ধ বিহারের উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজে এসেছিলেন এখানে। তাম্প্রলিপ্তের ১০টি বৌদ্ধ বিহারের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। ১৯৯৯ সালে নদী-বাণিজ্য নিয়ে পুরাতাত্ত্বিক গবেষণার কাজে দাঁতনে এসেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. অশোক দত্ত। দাঁতন হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস তাঁকে মোগলমারি গ্রামে সখীসেনা ঢিবি নামে এক প্রাচীন ইটের ঢিবির সন্ধান দেন। এই ঢিবির সঙ্গে এক কিংবদন্তি প্রেম কাহিনি জড়িয়ে আছে। লোকে বলেন, এই অঞ্চলের নাম আগে ছিল অমরাবতী। সেখানকার রাজা বিক্রমকেশরীর সখীসেনা নামে এক মেয়ে ছিল। সে যখন পাঠাশালায় বিদ্যাচর্চার জন্য গিয়েছিল, মন্ত্রীর পালিত পুত্র আহিমানিকের সঙ্গে তার প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

সখীসেনা ঢিবির উত্তর-পশ্চিম এবং দক্ষিণ অংশে প্রথম খননকার্য শুরু হয়েছিল ড. অশোক দত্তের উদ্যোগে। এখনও খননকার্য পুরোপুরি শেষ হয়নি। গবেষকদের মতে এখানে মহাযান এবং বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। মাটির পাত্রের টুকরো, মূর্তি প্রভৃতি নানা প্রাচীন বস্তু এখান থেকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। এখানে প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রায় পাওয়া গিয়েছে রাজা সমাচারদেবের নাম। তিনি পাল যুগেরও পূর্ববর্তী শাসক। অনেক গবেষক বলেন যে গুপ্ত রাজবংশের পতনের পর রাজা সমাচারদেব এই মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বুদ্ধমূর্তির স্বর্ণমুকুটের একটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়েছে। সাধারণত বুদ্ধমূর্তিকে কোনো অলংকারে সাজানো হত না, তবে বজ্রযান পন্থায় মুকুটযুক্ত বুদ্ধেরও উপাসনা করার প্রচলন ছিল। 

পাওয়া গিয়েছে প্রাচীন যুগের নানা সামগ্রী 

প্রাচীনকালে এই গ্রাম ছিল দণ্ডভুক্তির অন্তর্ভুক্ত। এই জায়গার ওপর দিয়ে গিয়েছিল বিশাখাপত্তনম এবং পাটলিপুত্রের সংযোগকারী বাণিজ্যপথ। তাম্রলিপ্ত বন্দরের সঙ্গেও এই অঞ্চল যুক্ত ছিল। এখানে বৌদ্ধধর্মের বিকাশে বাণিজ্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। অনেকে মনে করেন যে বণিকরা এই বৌদ্ধবিহারকে সোনার অলংকার দান করতেন, যার বেশ কিছু খননকার্যের ফলে উদ্ধার করা গিয়েছে। পঞ্চম দফার খননকার্যের সময়ে পাওয়া গিয়েছে ২০০টির মতো প্রাচীন কড়ি। যার থেকে প্রমাণিত হয় যে লাক্ষাদ্বীপের সঙ্গে মোগলমারি অঞ্চলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলত।

বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তূপ 

মোগলমারির খননকার্য বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে একটি নতুন জ্ঞানভাণ্ডারের দরজা আমাদের সামনে খুলে দিচ্ছে। খুব শীঘ্রই এই গ্রাম সারা বিশ্বের গবেষক ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি এবং সারা পৃথিবী থেকে বৌদ্ধরা এখানে তীর্থযাত্রা করতে আসবেন। বৌদ্ধ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলির মধ্যে বাংলাও এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে।

মোগলমারি প্রত্নক্ষেত্রের নামফলক 
 

কীভাবে যাবেন
হাওড়া রেলস্টেশন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব শাখার ট্রেন ধরে পৌছবেন খড়গপুর। সেখান থেকে ভুবনেশ্বর রুটের লোকাল ট্রেনে চড়ে দাঁতনের আগে নিকুরসিনি স্টেশনে নামবেন। স্টেশন থেকে টোটো করে যেতে হবে মোগলমারি। খড়গপুর স্টেশন থেকে বাসে করেও মোগলমারি যেতে পারেন। হাওড়া-পুরী জগন্নাথ এক্সপ্রেসে করে দাঁতন গিয়ে সেখান থেকে বাসে এই গ্রামে পৌঁছতে পারেন। অথবা কলকাতার ধর্মতলা থেকে বাসে বেলদা অথব খড়গপুর চলে যাবেন। তারপর বাস পাল্টিয়ে মোগলমারি। তমলুক থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়েও মোগলমারি পৌঁছনো যায়।
কোথায় থাকবেন
দাঁতনে বেশ কয়েকটি হোটেল আছে। সেগুলির একটাতেই রাত্রিবাস করতে পারেন। তার মধ্যে একটি ‘হোটেল প্রধান হাইওয়ে ইন’। যোগাযোগ ৯১৫২৮২৭৩৩৯। প্রিয়জনদের নিয়ে দেখে আসুন মোগলমারি।

 

মোগলমারির অবস্থান

Developed by DXDasia