
পুরীর পর মাহেশে দেশের বৃহত্তম রথযাত্রার আয়োজন হয়
মাহেশে রথযাত্রার দিনে কাঠের তৈরি রথ, শিল্পী – বালথাজার সলভিনস, ১৭৯৬
করোনা সংক্রমণের জন্য এবার থমকে গেল মাহেশের ৬২৪ বছরের রথযাত্রা। ইতিহাসে এই প্রথম। পুরীর পর মাহেশে দেশের বৃহত্তম রথযাত্রার আয়োজন হয়। কিন্তু বিশ্ব মহামারির দাপটে সেই রথের চাকা এবার থেমে গেল। রাজ্যের বাইরের থেকেও যেমন মানুষ আসেন, তেমনি জেলার প্রায় সব জায়গা থেকেই লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে রথের দিন। এই বছর সে চেনা ছবি দেখা যাবে না।
তবে, মন্দিরের পাশের একটি ঘরে এবার ‘মাসির ঘর’ তৈরি করা হবে। সেখানে সাতদিন থাকবে নারায়ণ শিলা। স্নানযাত্রার দিন প্রথা মেনে পুজোর পর মন্দির খুলবে রথযাত্রার দিন। কিন্তু রথ টানা পুরোপুরি এবার বন্ধ থাকবে।
মাহেশের রথ
আজ থেকে বহু আগে, সময়টা তখন সুলতানি যুগ। এমনই কোনো এক সময়ে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক পদব্রজে পৌঁছালেন নীলাচলে প্রভু জগন্নাথকে দর্শন করতে। ওদিকে পুরীর দৈতাপতিরা তো মহাক্রোধে ধ্রুবানন্দকে বের করে দিলেন মন্দির থেকে। অপমানিত ধ্রুবানন্দ অনাহারে গাছের তলায় পড়ে থেকে অশ্রু বিসর্জন করছেন। তখন স্বয়ং জগন্নাথদেবের আদেশে মাহেশে গঙ্গাবক্ষ থেকে দারুব্রহ্ম পেয়ে নিজ কুটিরে তিন সূত্রধর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন জগন্নাথ, বলভদ্র আর সুভদ্রার মূর্তি। এরকমই কথিত আছে কিংবদন্তির গল্পে। পরে চৈতন্যদেবের শিষ্য কমলাকর পিপলাই এই মূর্তির ভার নেন ধ্রুবানন্দের কাছ থেকে। চৈতন্যদেব মাহেশের রথযাত্রায় এসেছিলেন। তখন ছিল কাঠের রথ। অনেক পরে মার্টিন বার্ন নির্মাণ করে লোহার একটি রথ।
বাংলার ১২৭০-৭১ সনে কলিকাতার আড়পুলি নিবাসী রাইচরণ দত্ত আর যজ্ঞেশ্বর দত্ত নামে দুই ভাই জগন্নাথের পাকা মন্দির, বাঁধানো ঘাট, শিবমন্দির, বৈঠকখানা, বাগান, পুকুর সব নির্মাণ করিয়ে দেন। তারপর ১৭৫৫ সালে কলিকাতার পাথুরিয়াঘাটার নয়নচাঁদ মল্লিক বর্তমান মন্দিরটি তৈরি করান। রবীন্দ্রনাথ থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় রাধারানি – সকলেই এসেছে মাহেশে রথের মেলায়। এই সময়ে মহামারি আকার ধারণ করেছে করোনা, তাই সুরক্ষার কথা ভেবে এবারে রথের চাকা থামল। এ স্মৃতি ইতিহাসে ঠাঁই পাবে।
মাহেশের জগন্নাথ মূর্তি
তবে এই মহামারিই শেষ কথা নয়। ইতিহাসে কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না। করোনা রাক্ষসকেও একদিন মানুষ পরাজিত করবে। আবার ফিরে আসবে সুস্থ আনন্দময় স্বাভাবিক জীবন। শিশুরা স্কুলে যাবে, সব মানুষ ফিরে যাবে তাদের নিয়মিত কর্মজীবনে। ভ্রমণ-উৎসব-অনুষ্ঠান সব আবার হবে আগের মতো। দুর্গাপুজো, বইমেলায় মেতে উঠবে বাঙালি। মাহেশের রথের চাকাও আবার ঘুরবে।
তথ্যঋণ – প্রকাশ পাল, শিবশঙ্কর ভারতী।
রথ ও মূর্তির ছবি – সৌমশ্রী চন্দ্র
