
জগন্নাথের ভক্তদের কাছে পুরীর পরেই মাহেশের স্থান
ওড়িশার তীর্থক্ষেত্র পুরীর আরেক নাম ‘নীলাচল’। আর হুগলির মাহেশকে ‘নব নীলাচল’ আখ্যা দিয়েছিলেন মধ্যযুগের বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ চৈতন্যদেব। পুরী যাওয়ার পথে মাহেশ ঘুরে গিয়েছিলেন তিনি। ভারতের প্রাচীনতম রথযাত্রা শুরু হয়েছিল পুরীতে, আর মাহেশে তার পরে। তাই ভক্তদের কাছে পুরীর পরেই মাহেশের স্থান। বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব এটাই। এখানকার রথযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাধারানি’-তে দেখা যায়, এগারো বছরের বাচ্চা মেয়ে রাধারানি মাহেশে রথের মেলায় এসেছিল মালা বিক্রি করতে। সারা বাংলা জুড়ে এই মেলার খ্যাতি। মাহেশে একমাস ধরে চলে রথের মেলা।
মাহেশের এই রথযাত্রা কীভাবে শুরু হল, তার ইতিহাস খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে ৬০০ বছরেরও বেশি আগের এক লোককথায়। তখন চতুর্দশ শতকের কথা, ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বাঙালি ভক্তের সাধ ছিল, পুরীর জগন্নাথদেবকে নিজের হাতে ভোগ নিবেদন করবেন। কিন্তু পুরীর পাণ্ডারা তো কিছুতেই তাঁকে সেই কাজ করতে দিলেনও না, বরং অপমানও করলেন। মনের দুঃখে ধ্রুবানন্দ না খেয়েদেয়ে বসেছিলেন কয়েকদিন। এরই মধ্যে স্বপ্নে তাঁকে জগন্নাথ দেখা দিয়ে বললেন, বঙ্গদেশে ভাগীরথী নদীর পাশে মাহেশ নামের এক গ্রাম রয়েছে, সেখানে স্বয়ং জগন্নাথ একটা দারুব্রহ্ম বা নিমকাঠ পাঠিয়ে দেবেন। ওই নিমকাঠ থেকেই জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মূর্তি বানিয়ে যেন ধ্রুবানন্দ পুজো করেন। তাঁর নিজের হাতে রাঁধা ভোগ সেখানেই জগন্নাথদেব গ্রহণ করবেন। তারপর ধ্রুবানন্দ মাহেশে চলে এসে গঙ্গার ধারে এক কুটির বানিয়ে জগন্নাথদেবের পুজো শুরু করেন।

এদিকে কালের নিয়মে ধ্রুবানন্দ বৃদ্ধ হলেন। একদিন পুরীতে যাওয়ার পথে চৈতন্যদেব এলেন তাঁর কুটিরে। ধ্রুবানন্দ তখন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর কাতর অনুরোধে চৈতন্যদেব দ্বাদশ গোপালের পঞ্চম গোপাল কমলাকর পিপলাইকে ওই কুটিরে জগন্নাথদেবের পুজো করার দায়িত্ব দিলেন। এই কমলাকরই মাহেশে রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন পুরীর রথযাত্রা দেখে এসে। এখনও কমলাকরের বংশধররাই পুরুষানুক্রমে মাহেশে জগন্নাথদেবের সেবাইত। এখন মাহেশে যে মন্দির দেখা যায়, সেটা অনেক পরে ১৭৫৫ সালে কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক তৈরি করিয়েছিলেন। আর এখনকার রথটি বানানো হয়েছিল শ্যামবাজারের বসু পরিবারের সদস্য হুগলির দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসুর উদ্যোগে। ১৮৮৫ সাল থেকে প্রতি বছর ওই রথ চলছে।
একটা সময়ে মাহেশ ছিল গ্রাম, তবে এখন শ্রীরামপুর শহরের মধ্যেই এর অবস্থান। আগে বল্লভপুর পর্যন্ত রথ যেত। রাস্তার দু’ধারে বসত মেলা। এখন রথযাত্রার দিন মাহেশের জগন্নাথের মন্দির থেকে রথ টেনে জিটি রোড ধরে গুন্ডিচা মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, যা কিনা জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি। বিশাল রথে থাকেন জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রা। উল্টোরথের দিন সেই রথ আবার জগন্নাথের মন্দিরে ফিরে আসে।
