
অবন ঠাকুরও তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন এই বাড়ির কথা
“এইখানে বাঁধিয়াছি ঘর / তোর তরে কবিতা আমার…..”
বিশ্বকবি জীবনে বহুবার বিশ্বভ্রমণ করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নানাবিধ অবস্থার মধ্যে থাকতে হয়েছে। কিন্তু মোরান সাহেবের বাগানবাড়ির মতো এতো নিখুঁত বর্ণনা আর কোনো বাড়ি প্রসঙ্গে সেভাবে বলেননি। মোরান সাহেবের বাগানটি ছিল গঙ্গার দক্ষিণ সীমান্ত লাগোয়া ফরাসডাঙায়, যা আজকের চন্দননগর। সেই বাগানের প্রসঙ্গে কবি একবার জীবনের শেষ দিকে বলেছিলেন – “সেই অতিথি বৎসলা বিশ্বপ্রকৃতি তার অবারিত আঙিনায় সেদিন যখন বালককে বসালেন,তাকে কানে কানে বললেন, ‘তোমার বাঁশিটি বাজাও’। বালক সে দাবি মেনেছিল”। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ ও ‘ছেলেবেলা’ বই দু’টির কোনোটিতেই জানাননি, প্রথম কবে তিনি এসেছিলেন। তবে বহুজনকেই বলেছেন, যখন একেবারেই তিনি বালক, তখনই এখানে এসেছিলেন। চন্দননগরে গঙ্গার ওপর হাউস বোটে চড়ে তিনি জ্যোতি দাদার সঙ্গে সময় কাটাতেন। গঙ্গাতীরে বকুলবীথিকা ঘেরা মোরান সাহেবের সুন্দর বাগানবাড়িতে থেকেছেন দীর্ঘকাল। কবি প্রতিভা জাগ্রত হবার অনুকূল শান্ত পরিবেশ গঙ্গাতীরের মোরান হাউস তাঁর হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তবে মোরান সাহেব কে ছিলেন, তা খুব একটা জানা যায় না।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ঘরোয়া’ বইতে এখানকার স্মৃতিকথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের বর্ণিত ‘ছোটো সে দোতলা বাড়িতে’ বেড়াতে এসেছিলেন তাঁর পিতা গুণেন্দ্রনাথের সঙ্গে। অবন ঠাকুর লেখেন – “জ্যোতি কাকামশাই থাকেন তখন ফরাসডাঙার বাগানে (‘ছোটো সে দোতলা বাড়ি’) বসে আছি। বাগানে খুব আম টাম খাওয়া হল…….. জ্যোতি কাকামশাই বললেন, “রবি গান গাও”। সেই গানটা হলো – ‘ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’।…….. গান হতে হতে মেঘ উঠল। গঙ্গার ওপর কোন্নগরি মেঘ”।
এর কিছুদিন পর ছোট্ট সে দোতলা বাড়ি ছেড়ে দেওয়া হলো। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ চন্দননগরে গঙ্গাতীরে সেই মোরান সাহেবের বাগান বাড়িতে উঠে আসলেন। সেটাও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নিজের অর্থে ভাড়া নেওয়া। ঠাকুর বাড়ির ক্যাশ বইতে এ বিষয়ে খরচের হিসেব নেই। তারিখও জানা যায় না। জীবনের প্রথমদিকের কথা উঠলেই রবীন্দ্রনাথ বারবার এই মোরান সাহেবের বাগানের কথা বলতেন। ‘ছেলেবেলা’র কাহিনিতে বলেছিলেন “তার কিছুদিন পরে বাসা বদল করা হল মোরান সাহেবের বাগানে। সেটা রাজবাড়ি বললেই হয়। রঙিন কাচের জানলা দেওয়া উঁচু নিচু ঘর, মার্বেল পাথরে বাঁধা মেঝে, ধাপে ধাপে গঙ্গার উপর থেকেই সিঁড়ি উঠেছে লম্বা বারান্দায়। ঐখানে রাত জাগবার ঘোর লাগত আমার মনে”। ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ লেখা শুরু করেছিলেন এখানে। মোরান সাহেবের বাগানে তার কাব্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে গদ্য রচনাও চলছিল। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘বউ ঠাকুরানীর হাট’ এখান থেকেই লেখা শুরু হয়েছিল।
মোরান হাউস আজ আর নেই। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই শুধুমাত্র জুটমিল হবার প্রয়োজনে ভেঙে ফেলা হয়েছিল এই বাড়িটিকে। শহরবাসীর প্রতিবাদের কন্ঠ শোনা গিয়েছিল কিনা জানা যায় না। লোহার দাঁত সেদিনের মোরান সাহেবের বাগান বাড়িকে কড়মড়িয়ে গিলে ফেলেছিল।
(ছবিসূত্র – ‘রবীন্দ্র-সমীপে’, হরিহর শেঠ, মাসিক বসুমতী, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)
