জমিদার বাড়ির জামাইকে ঠকাতে জলভরা সন্দেশ বানিয়েছিলেন সূর্য মোদক

চন্দননগরের জলভরা সন্দেশের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে

পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় ছড়িয়ে আছে জিভে জল আনা মিষ্টির খাজানা। হুগলির জেলাও তাতে কম যায় না। জনাইয়ের মনোহরা, কামারপুকুরের সাদা বোঁদে, রিষড়ায় ফেলু মোদকের ছানার মুড়কি, লবঙ্গ লতিকার স্বাদ যে পায়, জীবনে কখনই ভুলতে পারে না। সূর্য মোদকের দোকানের বিখ্যাত জলভরা সন্দেশ হুগলির আরেকটি বিশেষ সম্পদ। এই মিষ্টি পাওয়া যায় চন্দননগর শহরে। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর নাম যেমন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি, এই শহরে এসেছেন অথচ জলভরা তালশাঁস সন্দেশ খাননি, এমন মানুষ বিরল।

সূর্য কুমার মোদকের দোকান, বড়বাজার, চন্দননগর 

জলভরা সন্দেশের আবিষ্কর্তা সূর্য কুমার মোদক। কীভাবে প্রথম এই মিষ্টি তৈরি হল? একটা মজার গল্প লুকিয়ে আছে কড়াপাকের এই সন্দেশের পিছনে। সেটা ১৮১৮ সাল। তখন ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ায় ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়দের জমিদারবাড়ি। সেই পরিবারের গিন্নিরা বায়না ধরলেন, জামাইষষ্ঠীর দিন ঠকাতে হবে জামাইকে। এমন মিষ্টি খাওয়ানো হবে তাকে, মুখে দিয়েই সে বোকা বনে যাবে। এমন আবদারে কর্তারা পড়লেন ভারি মুশকিলে। কিন্তু, যেভাবেই হোক, গিন্নিদের মন তো জোগানো দরকার! শেষ পর্যন্ত সূর্য কুমার মোদকের ডাক পড়ে। ভদ্রেশ্বর-চন্দননগর লাগোয়া জায়গায় ছিল সূর্য মোদকের মিষ্টির দোকান। সব কিছু শুনে জামাইকে হাঁদাগঙ্গারাম বানানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন তিনি। 

চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ | ভিডিও সৌজন্যে – ঘুরতে ফিরতে 

জামাইষষ্ঠীর দিন বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির মেয়েরা আদর করে জামাইয়ের পাতে দিলেন নতুন ধরনের এক মিষ্টি। সূর্য মোদকের বানানো তালশাঁসের মতো আকারের বিশাল কড়াপাকের সন্দেশ। এমন খাবার দেখে জামাই তো খুশিতে ডগমগ। মনের আনন্দে যেই না তিনি ওই সন্দেশে কামড় দিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে তার ভিতর থেকে গোলাপ জল ছিটকে লাগল জামাইয়ের গরদের পাঞ্জাবিতে। জামাইকে ভ্যাবাচ্যাকা খেতে দেখে হেসে উঠলেন উপস্থিত সবাই। এভাবেই জলভরা সন্দেশের জন্ম হয়েছিল। 

জলভরা সন্দেশ

এখন চন্দননগরের বেশ কয়েকটি জায়গায় রয়েছে সূর্য কুমার মোদকের নামাঙ্কিত দোকান। জলভরা সন্দেশের স্বাদ পেতে হানা দিয়েছিলাম জিটি রোডের ধারে চন্দননগরের বড়বাজারে এমনই এক দোকানে। সেখানে হাজির ছিলেন মোদক বংশের বধূ সুমনা মোদক। তিনি জানালেন, এটিই সূর্য মোদক বংশের আসল দোকান। এই দোকানের আর কোনো শাখা নেই। বাকি দোকানগুলি চালাচ্ছেন সূর্য মোদকেরই অন্য কোনো না কোনো বংশধর। 

সারা বিশ্বে চন্দননগরের এই মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। আজও প্রথা মেনে জলভরা সন্দেশের ভিতরে দেওয়া হয় গোলাপ জল। কথিত আছে, এই গোলাপ জল আসে খোদ কনৌজ থেকে।  শীতকালে নলেন গুড় দেওয়া তালশাঁস সন্দেশও পাওয়া যায়। আজকাল জলভরা সন্দেশ নিয়ে সূর্যকুমার মোদকের দোকানে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা হয়। তবুও এই মিষ্টির জনপ্রিয়তা তো কমেইনি, বরং দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। 


গুগল ম্যাপে সূর্য কুমার মোদকের দোকান

Developed by DXDasia