বাংলার ঘটি গরমের সঙ্গে জুড়ে আছে মন ভালো করা সব গল্প

ঘটি গরম খেতে কে না ভালোবাসে!

ঘটি গরম | ছবি -সংগৃহীত 

বাংলার খাবার স্বাদে এবং গুণে অনন্য। হাজার বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী রান্নার ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার গৃহিণীরা। পুরোনো অভিজাত পরিবারগুলির রাজকীয় নানা পদ আজও তৃপ্তি আনে। বাংলার হোটেল-রেস্তোরাঁ-মিষ্টির দোকানগুলিতেও খাবার নিয়ে অভিনব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে থাকে। এসবের পাশেই স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে ফুটপাথের নানা খাবার। সময়ে-অসময়ে পড়ুয়া, চাকরিজীবী, পর্যটক এবং অনেকেরই খিদে মিটিয়ে থাকে স্ট্রিট ফুড। স্বাদ-গন্ধের আকর্ষণেও কেউ কেউ ফুটপাতের খাবার খেয়ে থাকেন। গত বছর রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের বিশেষ তালিকায় কলকাতার ফুটপাতের খাবার জায়গা করে নিয়েছে। 

একটি মন ভালো করা স্ট্রিট ফুড হল ঘটি গরম। তিলোত্তমা কলকাতা তো বটেই, বাংলার ছোটো-বড়ো শহরে, গ্রামে, মফস্সলে রাস্তায় গলিতেও পাওয়া যায় এই সুস্বাদু খাবার। ঘটি গরম খেতে কে না ভালোবাসে! চানাচুর, ঝুরিভাজা, রোস্টেড ভুট্টা চিপস, রোস্টেড চিনাবাদাম, বিট নুন, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচালঙ্কা কুচি, চাট মশলা, লঙ্কা গুঁড়ো, আমচুর পাওডার, সর্ষের তেল আর সঙ্গে কাঁচা আম বা আমড়ার টুকরো – সব মিলিয়ে গরম গরম মুচমুচে খাবারটি যেন অমৃত। কলকাতার সবথেকে বিখ্যাত ঘটি গরম পাওয়া যায় প্রিন্সেপ ঘাটে। এখানে প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঘটি গরম খেতে খেতে গঙ্গার সৌন্দর্য উপভোগ করার মজাই আলাদা। এছাড়া, রেল স্টেশন, ট্রেনের কামরা, রাস্তার ফুটপাথ, ভিড় মেলা – যে কোনো জায়গাতেই মনকে ফ্রেশ করে দিতে পারে এই খাবার। প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে এখনও অনলাইনে ঘটি গরম পৌঁছে দেওয়ার কোনো উপায় হয়ে ওঠেনি, এটাই যা দুঃখের। 

ঘটি গরম বিক্রেতাদের মধ্যে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং মানুষের দেখা মেলে। কয়েক বছর আগে টেলি-তারকা লাবণী ভট্টাচার্য চন্দননগর স্ট্যান্ডে এক ‘ব্রেক ডান্সার’ ঘটি গরম বিক্রেতার দেখা পেয়েছিলেন। ব্রেকডান্স করতে করতেই এই ফেরিওয়ালা ঘটি গরম পরিবেশন করেন। লাবণী সেই নাচের ভিডিও তুলে ফেসবুকে দিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভিডিওটি। 

ভিডিও সৌজন্যে – লাবণী ভট্টাচার্য, ফেসবুক 

বাংলাদেশেও ঘটি গরম খুব জনপ্রিয়। ঢাকা শহর থেকে জেলায় জেলায় সর্বত্র এই খাবারের কদর। কুষ্টিয়াতে স্বরূপদহ গ্রামে মন্টু মিয়া নামের এক ঘটি গরম বিক্রেতাকে লোকে ‘মিসড কল’ বলে ডাকে। দূর থেকে এই ডাক শুনলেই ঝুড়ি নিয়ে কাছে চলে আসবেন মন্টু। অল্প ঘটি গরম হাতে দেবেন চেখে দেখতে। এটাই তাঁর ভাষায় ‘মিসড কল’। খেয়ে ভালো লাগলে যখন কেউ টাকা দিয়ে কিনতে চান, তখনই সেটা তাঁর কাছে ‘কল’ হয়ে ওঠে। কাগজের ঠোঙায় ঘটি গরম ভরে দেন ক্রেতাকে। গড়াই নদীর শেখ রাসেল সেতুর ওপর দেখা মেলে পঞ্চাশোর্ধ এই মানুষটির। 

ঘটি গরমের বাক্স 

ঘটি গরম নিয়ে বলতে গেলে এই ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। গত বছরেরই কথা। দিঘার সমুদ্র-সৈকতে গলায় বাক্স ঝুলিয়ে ঘটি গরম বিক্রি করছিলেন স্বরাজ ভট্টাচার্য। দিঘা সফরে গিয়ে তাঁর হাতের গরমাগরম ঘটি গরম খেয়ে অভিভূত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৈকত অঞ্চলে স্বরাজবাবু ‘ঘটি গরম কাকু’ নামে পরিচিত। দিঘাকে গ্রিন সিটি বানানোর লক্ষ্য নিয়ে অ্যাসিডমুক্ত কাগজের ঠোঙায় খাবার পরিবেশন করেন। খবরের কাগজের ঠোঙা ব্যবহার করেন না। কারণ, খবরের কাগজে থাকা বিষাক্ত কালি স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক। স্বরাজবাবুকে ডেকে মুখ্যমন্ত্রী মোমো খাওয়ান, বাড়ি ঘরদোরের খোঁজ নেন। জানতে পারেন, দিঘায় ব্যবসা করলেও স্বরাজবাবুর কোনো থাকার জায়গা নেই। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে রামনগর বাজারের লাগোয়া একটি জায়গার পাট্টা তুলে দেওয়া হয় স্বরাজবাবুর হাতে, মুখ্যমন্ত্রী দিঘা ছাড়ার আগেই। এরকম মানবিকতার গল্পও জুড়ে আছে ঘটি গরমের সঙ্গে। 
 

Developed by DXDasia