গুপ্তিপাড়ায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রাজা লক্ষ্মণ সেনের বংশধরদের প্রাসাদ

বাংলার প্রথম বারোয়ারি পুজো হয়েছিল গুপ্তিপাড়ায়

“পথের ধূলার পরে
পড়ে আছে তারি তরে
যে তাহারে দিতে পারে মান”।

অতীতের পদচিহ্নের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে গুপ্তপল্লী, যা বর্তমানে গুপ্তিপাড়া। মনসামঙ্গল কাব্যে আছে চম্পকনগরী থেকে তরী ভাসিয়ে নদীতে চলার পথে কাটোয়া, গুপ্তিপাড়া, ত্রিবেণী – এই সব স্থানের কথা। নির্মল গ্রাম্য পরিবেশে সবুজে ঘেরা এই জায়গার ঐতিহ্যের ধারাগুলি আসে কির্ত্তিচন্দ্র (এরকমই বানান) সেনের বাড়ি থেকেই। হুগলির গুপ্তিপাড়ার হাটখোলা পাড়ায় গ্রামের পথ ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই চোখে আসবে সেন বাড়ি। চারপাশের ঘেরা সবুজ শান্তি দেয় মনকে। আজও প্রায় সব আচার শ্রদ্ধাশীলভাবে এখনও বহাল রয়েছে। 

শোনা যায়, বাংলার রাজা লক্ষ্মণ সেনের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে কোনও একজন পরিবার নিয়ে তীর্থ করতে বেরিয়েছিলেন। এই স্থানে এসে তাঁরা বিশ্রাম নেন। গুপ্তিপাড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে একরকম মোহিত হয়ে কুলগুরুর পরামর্শ মেনে বেশ কিছুদিন ছিলেন। ক্রমে স্থায়ীভাবে এখানে পরিবার নিয়ে থেকে যান। 

দেওয়ালে খোদিত কির্ত্তি সেনের নাম 

প্রায় চারশো বছরের পুরোনো হাটখোলা পাড়ার সেন বাড়ি। বাইরের অংশে দুটি আট চালার শিব মন্দির রয়েছে। প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকলেই প্রশস্ত ঠাকুর দালান। কির্ত্তি সেনের সময়ে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ে। তিনি ঠাকুর দালানটি নির্মাণ করেন। তাঁর সময় থেকেই আড়ম্বর ছিল চোখে পড়ার মতো। ঠাকুর দালানের তিন দিকের ঘর গুলিতে বাদ্যকর, কাজের লোক আর রাঁধুনিরা থাকতেন। তখন যাত্রাপালা হত। আর পরিবারের লোকেরা সেই পালায় অভিনয় করতেন। জাঁকজমক সহকারে দুর্গোৎসব হত। অন্তঃপুরে গিন্নিদের সোরগোল, বাবুদের হাঁক, কাজের লোকদের ব্যস্ততা, নাচগান, খানাপিনা – সব নিয়ে পুজোর চারদিন গমগম করত এই বনেদি বাড়ি। বাইরে থেকে গ্রামের বহু সাধারণ মানুষ এসে ভিড় করতেন। ভরপেট ভূরিভোজে জয়জয়কার পড়ত সেন বাড়ির সামনে। তবে এখানে একচালার দুর্গা প্রতিমার পাশে লক্ষ্মী ঠাকুরের মাটির পেঁচাটি থাকে না। দালানের একটি কুঠুরিতে কয়েকটা জ্যান্ত পেঁচা থাকে। বছরভর আলাদাভাবে তাদের পুজো করা হয়। 

কির্ত্তি সেনের সময় থেকেই বাড়িতে কবিগানের আসর বসত। গুপ্তিপাড়া খ্যাতি লাভ করে হরু ঠাকুরের শিষ্য ভোলা ময়রার জন্মস্থান হিসাবে। সেকালে দলে দলে লোক ভিড় করতেন সেন বাড়িতে কবিগান দেখতে। বাজনদাররা নানা রকম বাজনায় মাতিয়ে তুলতেন সমাগত মানুষদের। অতিথিদের উৎফুল্লে মুখরিত হতো প্রাঙ্গণ। বাবুরা সেই দৃশ্য উপভোগ করতেন। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম পেঁচার নক্সা’তে বলা হয়েছে, গুপ্তিপাড়ার বারোয়ারির সাথে শান্তিপুরের বারোয়ারি পুজার প্রতিযোগিতা ছিল। বলা হয়, এই পরিবারের বারোজন সদস্য নতুন করে একটি পুজো করেন, তাকে বাংলার প্রথম বারোয়ারি পূজা বলে চিহ্নিত করা হয়। 

শিব মন্দির

ক্রমে সময়ের পালাবদল হল। কবিগান আর যাত্রাপালা আজ কিছুই হয় না। তবে এখনও অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে গ্রামের মানুষ ভিড় জমায় সেন বাড়িতে। আগে অন্দরে যে গীতবাদ্য হত, সেইসব সময়ের সাথে হারিয়ে গিয়েছে। বিশাল সেন বাড়ির মধ্যে আজ আড়ম্বর নেই ঠিকই, তবু তার উপস্থিতিতে সেকালের বর্ণময় দিনগুলি নীরবে কথা কয়ে যায়।

তথ্যসূত্র – 
১. হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ। 
২. হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ, সুধীরকুমার মিত্র। 

কৃতজ্ঞতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
 

Developed by DXDasia