মন্দিরের টেরাকোটায় ইতিহাস কথা বলে পূর্ব বর্ধমানের দেবীপুরে

একের পর এক অসাধারণ স্থাপত্য মুগ্ধ করবে আপনাকে

পূর্ব বর্ধমানের শিবতলা বাস স্ট্যান্ডে নামলেই আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে মনোরম সবুজের নানা দৃশ্য। সামনেই দেখতে পাবেন একজোড়া পুরোনো শিব মন্দির। অসাধারণ এক স্থাপত্য, যেখানে একই মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে তিনটি স্থাপত্যের সমাহার। তারই মধ্যে দুই ধারে রয়েছে শিবের মন্দির দু’টি। এগুলি বাংলার নিজস্ব আটচালা স্থাপত্যের নিদর্শন। যদি কোনো মন্দিরের চারটে তিনকোনা কাটা অংশ দিয়ে একটা বাঁকা ছাদ গড়ে ওঠে, তাকে চারচালা বলে। আটচালার ক্ষেত্রে চারচালা মূল মন্দিরের ওপর সেই কাঠামোরই একটি ছোট্ট অনুকৃতি থাকে। 

দু’টি শিব মন্দিরের মাঝখানে আছে দোল মঞ্চ। যৌথ স্থাপত্য জুড়ে সুন্দর পোড়ামাটির অলংকরণ। দোল মঞ্চের নকল দরজায় একটি সাদা মার্বেল পাথরের ফলক লাগানো। সেটির থেকে জানা যায়, ১২৮৩ বঙ্গাব্দে এই স্থাপত্যকীর্তি গড়ে উঠেছিল। 

জোড়া শিব মন্দির এবং দোল মঞ্চ 

জোড়া শিব মন্দির এবং দোল মঞ্চের বাঁ দিকে সরু রাস্তা দিয়ে খানিকটা এগোলে চোখে পড়বে একটি বিশাল মন্দির। দেবীপুরের বিখ্যাত ‘লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির’ এটি। উচ্চতা ৬০ ফুটের মতো। মন্দিরের অলংকৃত প্রবেশপথটিও আপনাকে মুগ্ধ করবে। এই মন্দির ওড়িশার রেখ দেউল রীতি অনুসরণ করে নির্মিত। সামনের অংশে আবার দেখা যায় বাংলার নিজস্ব দোচালা মণ্ডপ। এইভাবে বাংলা এবং ওড়িশার মন্দিরস্থাপত্যের এক মিশ্রণ ঘটেছে এখানে।

লক্ষ্মী-জনার্দন মন্দিরের মার্বেল ফলক 

পোড়ামাটির অলংকরণই লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ। পৌরাণিক চরিত্র কৃষ্ণের জীবনকাহিনি এখানে বিস্তৃতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোথাও দেখা যায় শৈশবের মাখন চুরির ঘটনা, কোথাও বা কালীয় দমন লীলা। আবার গোপীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা কিংবা মথুরা যাত্রার গল্পও স্থান পেয়েছে। এছাড়া টেরাকোটার মাধ্যমে তুলে আনা হয়েছে যুদ্ধের ছবি এবং আগেকার দিনের দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা।

পোড়ামাটির অলংকরণ  

পারিবারিক ইষ্টদেবতা লক্ষ্মী-জনার্দনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বর্ধমানের দেওয়ান বনবিহারী কাপুরের থেকে ১৮৩৩ সালে এই মন্দিরের জমি কিনেছিলেন জমিদার নরোত্তম সিংহ। তাঁর প্রপৌত্র হেমন্ত গোপালের পুত্রবধূ কজ্জলীদেবী এবং তাঁর স্বামী দিব্যেন্দু নারায়ণ সিংহ এই মন্দিরের আমূল সংস্কার করেন। পাশেই রয়েছে জমিদার বাড়ি। এখন সেই প্রাসাদ জরাজীর্ণ, তা সত্ত্বেও এক হারিয়ে যাওয়া যুগের আড়ম্বরময় স্মৃতি বয়ে চলেছে। বাংলার এই অখ্যাত মন্দির জনপদ ঘুরে আসুন একদিন সময় করে।

মাখন চোর কৃষ্ণ এবং মা যশোদা 

কীভাবে যাবেন

হাওড়া স্টেশন থেকে বর্ধমান লোকাল (মেন)-এ উঠে পড়ুন। দেবীপুর স্টেশন পৌঁছতে দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। সেখান থেকে অটো বা ট্রেকারে করে শিবতলা যেতে হবে। 

কোথায় থাকবেন

দেবীপুরে পর্যটকদের থাকার কোনো বিলাসবহুল বন্দোবস্ত নেই। দেবীপুর রেল স্টেশন থেকে ৭.৮ কিলোমিটার দূরে উৎসব রিসর্টই ভ্রমণার্থীদের থাকার জন্য সবথেকে কাছের জায়গা। 

টেরাকোটার অলংকরণে গজলক্ষ্মী 

Developed by DXDasia