
মাদুর শিল্পের জন্য পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগরের খুব নামডাক
মাদুর কাঠির চাষ করেন পুরুষ আর মাদুর বোনেন মহিলারা। এখানেই দুটি মনন জুড়ে তৈরি হয় একটি রঙিন শিল্প। মাদুর শিল্পের সমাদর সর্বত্র। মাদুরের বুনন দুই রকমের – একহারা ও দোহারা। একহারার দুটি কাঠি সুতোর উপর নিচে পড়ানো হয় পর্যায়ক্রমে। আর দোহারার কাঠি দুটি দড়ির ওপর নিচে পড়ানো হয়। কাপড় দিয়ে ছোটো ছোটো দু-তিনটে মাদুর জোড়া লাগানো হয় অনেক সময়।
তবে প্লাস্টিকের সস্তার মাদুরে বাজার ছেয়ে গেছে, তাই পশ্চিমবঙ্গে মাদুর শিল্পের অবস্থা হালে খুব খারাপ। মেদিনীপুরের সবং থানার তালদা, দাঁতড়দা, সারতা, দাঁড়রা, পাঁশকুড়ার রঘুনাথবাড়ি, ময়না, রামনগরের কচুড়ি, সাদি, হলদিয়া, পুরুষোত্তমপুর, বেতেশ্বর, খোলাবেড়িয়া, চন্দনপুর, এগরা, কোচবিহার, বীরভূমের শ্রীনিকেতন, হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর, আমতা, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেশ কয়েকটি জায়গায় মাদুর তৈরি হয়। এমনিতে একহারা ও দোহারা মাদুর অনেক জায়গাতে তৈরি হলেও মসলন্দ মাদুর তৈরি হয় পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগরে এবং সবং অঞ্চলে।
মেদিনীপুর সবং-এর মাদুর
মাদুর শিল্পের জন্য পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগরের খুব নামডাক। মাদুরকে এখানে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘মশনা’। রামনগরের খোলাবাড়িয়া গ্রাম মসলন্দ মাদুরের জন্য বেশ বিখ্যাত। বর্তমানে খোলাবাড়িয়া গ্রামে আছে ‘মাদুরম সমিতি’। এই গ্রামের প্রায় পঁচিশ জন শিল্পী মাদুর শিল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত। দুটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী অন্নপূর্ণা স্বনির্ভর দল এবং যশোদা স্বনির্ভর দলের সদস্যরা দক্ষতার সঙ্গে এখানে কাজ করছেন। মাদুর শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন নমিতা গিরি (৩৫), যশোদা দাস (৫৫), মালতী পাল (৪৫), শিউলি পাল (২৮) এঁদের মতো অনেকেই।
এছাড়াও রামনগরের এক নম্বর ব্লকের সাদি, খয়রান্ডা, হলদিয়া আর দুই নম্বর ব্লকের সাবিত্রাপুর এবং দেপাল প্রভৃতি গ্রামে মাদুর তৈরি হয়। খোলাবেড়িয়া গ্রামের কোনও কোনও শিল্পী জেলার বাইরেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। যেমন, উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা, বর্ধমানের পূর্বস্থলী প্রভৃতি জায়গায় প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন এখানকার খগেন্দ্রনাথ প্রধান। এই শিল্পী ডিস্ট্রিক্ট কটেজ অ্যান্ড স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রিজ অব ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে পুরস্কারও পেয়েছেন। নিউ দিল্লিতে শিল্প প্রদর্শনীতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর তৈরি তালপাখা, মাদুর উপহার হিসেবে দিতে পেরেছিলেন। ক্রাফট কাউন্সিল অব ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে আমেরিকা এবং আরব যাওয়ার প্রস্তাব এসেছিল তাঁর কাছে।
মেদিনীপুর সবং-এর মাদুর
মাদুরের নকশায় কখনো থাকে রাধা-কৃষ্ণের লীলা, কখনো বা রাম-রাবণের যুদ্ধ ইত্যাদি। মাদুর বোনার সঙ্গে তাঁত বোনার বেশ মিল। আবার মাদুরের নকশা দেখলেই মনে পড়তে পারে কাঁথার নকশার কথা। ১৯৮৮ সালে খোলাবেড়িয়া গ্রামের সরযূবালা গিরি দিল্লির প্রদর্শনীতে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। এসব শিল্পীর নকশার কাজ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আসলে মাদুর বিছিয়ে শোয়া কিংবা অতিথিকে বসতে দেওয়া অথবা ঘরোয়া অবসর কাটানোর রেওয়াজের সঙ্গে শিল্পবোধকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন শিল্পীরা। তাই দেখা গেল কখনও ঘরে দেখা কাঁথা বা তাঁতের কাপড়ের নকশাকে তাঁরা তুলে নিচ্ছেন মাদুরে আবার কখনও বা পাঁচালিতে শোনা রামায়ণের কাহিনি বা কীর্তনে শোনা কৃষ্ণলীলার কাহিনিকে মাদুরে জুড়ে দিচ্ছেন। এসবের সঙ্গে সঙ্গে আসলে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় লোকায়ত স্তরের মানুষের শিল্পবোধ। আর সেই সঙ্গে গৃহস্থের মঙ্গল কামনার চিন্তাসূত্র। এসবের খোঁজ এখনকার নাগরিক সমাজ রাখে কই। এখন প্রকৃতিজাত জিনিসের থেকেও প্লাস্টিক নামক কদর্য জিনিসের কদর বেশি।
গ্রামে বিয়ের মরসুমে মাদুর কাঠি দিয়ে তৈরি মাদুর বিক্রি হয়। শ্রাদ্ধ-শান্তিতেও ব্রাহ্মণদের মাদুর দেওয়ার চল আছে। মূলত মাদুর কাঠির চাষটা করেন বাড়ির পুরুষেরা আর মাদুর বোনার কাজটা করেন মহিলারা। গরিব সংসারে পুরুষ-মহিলার যৌথ উদ্যোগে সংসারতরী বইতে থাকে আপন গতিতে। এটাই এই শিল্পের মজা।
