‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ যখন করছেন বিশ্বজিৎ, ততদিনে তিনি প্রতিষ্ঠিত নায়ক
বিশের দশকের কলকাতা। স্বাধীনতা আন্দোলনের গনগনে আঁচে উত্তপ্ত এক শহর। কাঠফাটা রোদে সেই উত্তাপ যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। তার মধ্যেই ‘বিদূষক চাই, বিদূষক?’ বলতে বলতে কাগজ ফেরি করছে এক তরুণ। তার পরিচয়? সে কদিন আগেই জেল থেকে ছাড়া পাওয়া এক স্বদেশী। তবে আরও একটা পরিচয় তার ছিল। কাগজ ফেরি করতে করতেই চেনা দুজন মানুষের সঙ্গে দেখা হতেই সে জানায় তার পুরোনো পরিচয়টা – “আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি। নিশাপুর জমিদারদের শেষ বংশধর। পরীক্ষা করে দেখছি, আমাদের জগতেও কিছু বদলায় কিনা।”
সুধীর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘দাদাঠাকুর’ ছবির শেষ দিকের দৃশ্য। দাদাঠাকুর শরৎ পণ্ডিতকে (ছবি বিশ্বাস) কলকাতার রাস্তায় কাগজ ফেরি করতে দেখে তাঁর হাত থেকে সব কাগজ কেড়ে নিয়ে দর্পনারায়ণ চৌধুরী বলেছিলেন – “তোমাকে কলকাতার রাস্তায় কাগজ বিক্রি করতে দেখে আমার নামের প্রথম দুটো অক্ষর ঝরে পড়ে গিয়েছে।” অথচ, একদিন যখন স্বদেশীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জে তারা রক্তাক্ত লুটিয়ে পড়ছে শুঁড়িখানার দরজায়, তখন এই দর্পনারায়ণই নিশ্চিন্তে দোকানের ভিতরে বসে মদ্যপান করছে। এই বাবুগিরির জীবন থেকে অকুতোভয় স্বাধীনতা-সংগ্রামীতে তার এই রূপান্তর যেন ছবিটিকে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। ছবিটি সর্বতোভাবে ছবি-ময় হলেও এমন একটি শক্তিশালী পার্শ্বচরিত্রে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ও ছিল অসাধারণ নিজস্বতায় পরিপূর্ণ।
বিশ্বজিতের অভিনয়-জীবনের একদম শুরুর দিকের চলচ্চিত্র ‘দাদাঠাকুর’। আর, ছবি বিশ্বাসের শেষ চলচ্চিত্র। বিশ্বজিতের কথা অনুযায়ী, শুটিংয়ের পরিবেশ ছিল একদম বাড়ির মতো। আউটডোরে মশার কামড়ে তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে অভিভাবক-সম ছবি বিশ্বাস নিজে মশারি টাঙিয়ে গায়ে কম্বল চাপা দিয়ে দিয়েছিলেন। ছবি বিশ্বাসকে তিনি বাবার মতোই শ্রদ্ধা করতেন। পুত্র প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশনে ছবি বিশ্বাস নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অতিথিদের আপ্যায়ন করেছিলেন, একথা বিশ্বজিৎ নিজেই বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে।
স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরিত্রে আরও একটি স্মরণীয় ছবিতে অভিনয় করেছিলেন বিশ্বজিৎ। ছবিটি তরুণ মজুমদারের ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’। যদিও সে ছবির দুই কিশোরশিল্পীর যুগলবন্দিকেই বেশি মনে রেখেছে দর্শক, তাও ব্রিটিশ-ভারতীয় পুলিশবাহিনীর হাতে মার খেতে খেতে অখিল মিত্তির যখন চিৎকার করে ওঠে – “একটা অখিল মিত্তির মারা যাবে, একশোটা জন্মাবে। একশোটা মারা যাবে, হাজারটা জন্মাবে। বন্দে মাতরম।” ছবির ঘরোয়া ছেলেমানুষি হাস্যরসের মেজাজেও পরিবর্তন আসে। সদাচঞ্চল, ছেলেমানুষ রসিকের তার অখিলদা-কে বাঁচাতে বোমা ছুঁড়তে থাকা যেন তাকেও একধাক্কায় অনেকটা পরিণত করে তোলে।
‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ যখন করছেন বিশ্বজিৎ, ততদিনে তিনি প্রতিষ্ঠিত নায়ক। বাংলা, হিন্দি দু’ধরনের ছবিতেই দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন। বোম্বাইতে যাওয়ার আগে বাংলা চলচ্চিত্রের সুদর্শন ও সুপুরুষ নায়ক হিসেবে উত্তমকুমারের যোগ্য উত্তরসূরি ধরা হত তাঁকে। তবে শুধু পর্দাতেই নয়, থিয়েটারেও নিয়মিত অভিনয় করতেন বিশ্বজিৎ। রংমহলে যোগ দিয়েছিলেন। ‘মায়ামৃগ’ ছবির মতো ‘মায়ামৃগ’ নাটকেও তাঁর অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। এছাড়া, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘এক পেয়ালা কফি’ এরকম বেশ কয়েকটি নাটকে মঞ্চাভিনয়েও নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি।
এই ‘এক পেয়ালা কফি’-র একটি শোয়ের দিনই এমন ঘটনা ঘটেছিল যা তাঁকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত দেয়। কেউ একজন নিজের পরিচয় গোপন রেখে তাঁকে ফোন করে বলে, পরদিন সকালে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে দেখা করতে। সত্যজিৎ হয়তো কোনও ছবির কাস্টিংয়ের জন্য তাঁকে ডেকেছেন, একথা ভেবে পরদিন সকালে সত্যজিতের লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সত্যজিৎ খুব অবাক হয়ে জানান, তিনি আদপেই তাঁকে ডাকেননি। এটা কোনও ধান্দাবাজ লোকের কাজ, এরকম আগেও হয়েছে। তবে হতোদ্যম তরুণটিকে একথা বলে আশ্বস্তও করেন যে, পরের কোনও ছবিতে দরকার পড়লে নিজে ফোন করে জানাবেন অথবা লোক পাঠাবেন।
সত্যজিতের ছবিতে বিশ্বজিতের আর কাজ করা হয়নি। হলে হয়তো তাঁর বর্ণময় অভিনয় কেরিয়ারে রচিত হত এক নতুন অধ্যায়।