আজ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন
ছোটোবেলায় দূরদর্শনে ম্যাটিনি শো’তে দেখেছিলাম উত্তম কুমার, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, সন্ধ্যারানি, ছবি বিশ্বাস অভিনীত ‘মায়ামৃগ’। বিশ্বজিতের লিপ-এ সেই সিনেমায় একটা কিদ্ভুত গান ছিল। শুধু তাই নয়, সেসময় বাংলা ছবির গানে ডাক্তারি পরিভাষায় এমন একটা ‘প্রেমের গান’ তৈরি হতে পারে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সেই অকল্পনীয় গানটি হল- ‘মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য’। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই গান, গায়কীর কারণে নয় মন টেনেছিল অন্যকারণে। ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’, ‘ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে’ অথবা ‘তুমি ফিরায়ে দিয়েছ বলে’ -এসব কালজয়ী গানের থেকে সে গান ছিল আলাদা, বিরল আর মজার। প্রথমবার যখন শুনেছিলাম, মাথামুণ্ডু বুঝিনি। আসলে, মানবেন্দ্র বাবুর গাওয়া ‘মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য’র মধ্যে একটা ‘oddness’ ছিল। সেটাই মাথায় ছাপ ফেলেছিল। সেই ছাপ যে কত গভীর, তা বহুদিন পর মানবেন্দ্র বাবুর জন্মদিন উপলক্ষে বুঝলাম। তাঁর গাওয়া একশো একটা গানের ভিড়ে আবারও মন টানলো সেই ‘মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য’ই।
হঠাৎ মনে পড়ায় গানটা নেড়েচেড়ে জানতে পারলাম গানের কথা-সুরের মতো 'ব্যতিক্রমী' এই গানের নেপথ্য গল্পও। চিত্ত বসু পরিচালিত ‘মায়ামৃগ’র গান বাঁধা হচ্ছে। সুর দেবেন মানবেন্দ্র, গাইবেনও। গীতিকার শ্যামল গুপ্ত আবার মানবেন্দ্রর বহুকালের বন্ধু। এই শ্যামল গুপ্তরই লেখা ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’। শ্যামলের মানবেন্দ্রর গাঢ় বন্ধুতা ছিল। ‘মায়ামৃগ’র চিত্রনাট্য অনুযায়ী নায়ক বিশ্বজিৎ নায়িকা সন্ধ্যা রায়ের প্রেমে পড়েছে। কিন্তু নায়কের সব কথাতেই ডাক্তারির প্রসঙ্গ এসে পড়ে। এমনকী প্রেম নিবেদনের সময়ও তাই। এটাকে মাথায় রেখে শ্যামল গুপ্তকে একটা গান লেখার অনুরোধ করেন মানবেন্দ্র।
মানবেন্দ্র তখন ফার্ন রোডে ‘গীতবীথিকা’ নামে একটি স্কুলে গান শেখান। ক্লাসের পর সেখানে বন্ধু শ্যামলের সঙ্গে গান-আড্ডাও হয়। এক রবিবারের বিকেলে ‘মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য’ নিয়ে শ্যামল গুপ্ত হাজির হন ফার্ন রোডে। গানটি পড়ে মানবেন্দ্র বললেন, ‘‘ছ্যা, এ কী লিখেছিস! এ একেবারে চলবে না।” শুধু তাই নয়, গান লেখা টুকরো কাগজটা হাতে নিয়ে মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দেন জানলা দিয়ে। বন্ধু্র এহেন আচরণে শ্যামল বাবু একেবারে মুষড়ে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়েন।
ঘণ্টা দুই গড়ানোর পর। গানের ক্লাস শেষ। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মানবেন্দ্র দেখলেন বন্ধু পাংশুমুখে বসে। বললেন, ‘‘নারে, গানটা তুই মন্দ লিখিসনি। দেখি এক বার!’’
আরও পড়ুন: নজরুলগীতি ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
এতক্ষণ শ্যামল বাবু মুষড়ে পড়ে চুপচাপ বসেছিলেন কিন্তু ভিতরে ভিতরে বন্ধুর প্রতি রাগ-অভিমানে ফুঁসছিলেন। মানবেন্দ্রর কথা শুনে আর থাকতে না পেরে বলে ওঠেন, ‘‘তুই তো ফেলে দিলি রাস্তায়। আমার কাছে কোনও কপিও নেই। ট্রামে আসতে আসতে হাতে যা ছিল, তার ওপরে লিখেছিলাম…।’’
তখন সন্ধে নেমে গেছে। রাস্তায় আলো প্রায় নেই। টর্চ হাতে তোলপাড় খোঁজ চলল তার মধ্যেই। শেষে দলা পাকানো টুকরো কাগজটার খোঁজ মিলল নর্দমার পাশে। এর পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। জনপ্রিয়তার আকাশ ছুঁয়ে যায় ‘মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য’। যেখানে অনুষ্ঠানে যেতেন, ‘মেটেরিয়া’ না শুনিয়ে রেহাই নেই। এমনকী গানের লিপ দিতে মঞ্চে ডাক পড়ত বিশ্বজিতের। মানবেন্দ্র গেয়ে চলতেন-
ক্ষতি কি, না হয় আজ পড়ব
মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য
মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য
মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য।
নয়তো বা ফার্মাকোলজিটাই
নিয়ে আজ লেকচারে নাববো
লেকচারে নাববো
লেকচারে নাববো … ও
ক্ষতি কি, না হয় আজ পড়বে…
তারপর বৃষ্টির ছুরিতে
মনের ডিসেকশন শিখবে
কিম্বা স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে
নোটবুকে সিম্পটম লিখবে
বৃষ্টির ছুরিতে ডিসেকশন শিখবে
স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে সিম্পটম লিখবে
ওরাল জবাবগুলো হওয়া চাই
রীতিমত কানে সুখশ্রাব্য
নয়তো বা ফার্মাকোলজিটাই
নিয়ে আজ লেকচারে নাববো
চক্ষতি কি, না হয় আজ পড়বে…
হয়তো আউটডোরে এমনি
ডিউটি-টা কোনোদিন পড়বে
প্রেসক্রিপশন মত হয়ত
মিক্সচার গুলো কাজ করবে
আউটডোরে এমনি ডিউটি-টা পড়বে
প্রেসক্রিপশন মত মিক্সচার কাজ করবে
সব দিক আগে দেখে তবে তো
ডিগ্রী দেবার কথা ভাববো
নয়তো বা ফার্মাকোলজিটাই
নিয়ে আজ লেকচারে নাববো
ক্ষতি কি, না হয় আজ পড়বে…
মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য
তথ্যসূত্রঃ
আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি, আনন্দবাজার পত্রিকা