
সামনের সিট থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন মানবেন্দ্র, ‘হেমন্ত মুখার্জির জবাব নাই’
ছোটবেলা থেকেই অভ্যেসমত মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গান শুনেছি আর পাঁচজন গায়কের গানের সাথেই। কিন্তু কোনদিন একটা গান বুকে শেলের মত বিঁধে গেল একমাত্র বিধাতাই জানেন, ‘সেই ভালো এ বসন্ত নয় এবার ফিরে যাক/ দূরেই তুমি থেকো/ আবার কোনও বসন্ত দিন তোমার আরো কাছে/ ফিরিয়ে নিয়ে আসবে আমায় দেখো।’ আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি, বনে নয় মনে মোর, ঐ মৌসুমি মন শুধু রঙ বদলায়-এর পাশাপাশি এই গানটা কীভাবে যে আপন হয়ে গেল, সে দিন-ক্ষণ মাপা নেই।
কিছু মানুষ থাকেন যারা নিজের কাজ নিঃশব্দে করে চলে যান। কিছু মানুষ থাকেন কাজের পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিত্বও পাশের মানুষটাকে প্রভাবিত করে, তাঁদের কাজের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও তাঁরা সমান জনপ্রিয়। মানবেন্দ্র মুখার্জি সেই দ্বিতীয় গোত্রের। ‘দেয়ানেয়া’ ছবির গান হবে, দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা, মানবেন্দ্রের অংশটাতে প্রথমে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভেবেছিলেন শ্যামল মিত্র। পরে যখন মানবেন্দ্র গাইলেন, কেমন হয়েছিল সেটা পাঠক জানেন। শ্যামল মিত্র প্রযোজক তার ওপর সঙ্গীত পরিচালক—বন্ধু মানবেন্দ্রকে সসংকোচে একটা ভাউচার দিতেই, মানবেন্দ্র সে টাকার ভাউচার ছিঁড়ে বললেন, শালা, তুমি আমাকে টাকা দেখাচ্ছ।
প্রাণময় একটা মানুষ বলে ওঁর খ্যাতি ছিল। তখন মানবেন্দ্র সবে নতুন গাড়ি কিনেছেন, সে দেখাদেখি শ্যামল মিত্র সতীনাথ মুখোপাধ্যায় নির্মলেন্দু চৌধুরী এক গাড়ি কিনলেন। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের একজন অনুষ্ঠানের জন্য এলে, তাঁকে সাফ জানিয়ে দিলেন মানবেন্দ্র, নিলে আমাদের চারজনকে নিতে হবে, গাড়ি পাঠাতে হবে না। চারজনের চারটে অস্টিন গেল অনুষ্ঠান করতে, সঙ্গে গেলেন একজন রাধাকান্ত নন্দী।
কী সব অসামান্য সুর করেছিলেন, একটা এ মুহুর্তে মনে পড়ছে, ‘আমি যে কত একলা’ ওরকম একটা ;গান গাইতে গেলে একজন মানবেন্দ্র লাগেই।
এ মুহুর্তে কিছু গানের উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে, এর অনুল্লেখ অপরাধের সামিল, পাঠক শুনে দেখুন অনুগ্রহ করে, ইলা বসুর গাওয়া ওঁর সুরে, ‘একটি গানের মাঝে দুজনে মিলে আছি জানি গো, জানি/ আমি তার সুর আর তুমি যে বানী’। ইলা বসুর সেই ফ্লেক্সিবল গলাটা, ভোলা যাবে না। ললিতা ধরচৌধুরী কে দিয়ে গাইয়েছিলেন, ‘ছোট চিঠি লাগে তবু মিষ্টি/ যদি তুমি লেখো’- যারা প্রখর কান নিয়ে শুনবেন বুঝবেন ঐ জায়গাটা, ‘সে চিঠি বুকে করে/ জেগেছি কত যে রাত/ হাতের ছোঁয়া তোমার পেয়েছে আমার হাত’—যেন মানবেন্দ্র নিজেই গাইছেন। আহা গানটাতে অলোকনাথ দে-র বাঁশী ছিল অসামান্য।
একটা ছোট্ট স্মৃতির কথা বলি, ছোটবেলায় একটা গান শুনতাম খুব মন দিয়ে, ও আমার চন্দ্রমল্লিকা বুঝি চন্দ্র দেখেছে। তখন কি অত ভালোবাসা দিয়ে শুনতাম, নিশ্চয়ই না। শুনতাম, যেন কোন শুক্লা পঞ্চমী চোখে স্বপ্ন এঁকেছে- এই লাইনটার জন্যে। আমার মায়ের নাম শুক্লা। পরে যখন বড় হয়ে এর সঞ্চারীটা শুনি, ‘আমার ভাঙল দ্বিধা ভয়/ কুঁড়ি রাঙলো পরাগে/ আঁধার মানল পরাজয়/ নতুন আলোর সোহাগে’ আহা নচিকেতা ঘোষের সুরে, পুলক বাবুর কথায় গানটা।
‘এই নীল নির্জন সাগরে/ এলোমেলো সুরে গান গাওয়া’- প্রবীর মজুমদারের সুরে গেয়েছিলেন মানবেন্দ্র। এই গানটাতে একটা হামিং আছে, কত বড় শিল্পী হলে ওটা করা যায় ভাবতে হয়। উল্টোদিকের গানটাও একটা অসামান্য গান, এখনো এই রাত অনেক বাকি।’ মানব মানবেন্দ্রের কথা বলছিলাম না, রবীন্দ্রসদনে সন্ধ্যা মুখার্জি রাধাকান্ত নন্দীকে নিয়ে মাত করে নেমে গেলেন, উঠলেন হেমন্ত মুখার্জি, কোনও কথা নেই, শুরু করলেন, ‘মুছে যাওয়া দিন গুলি আমায় যে পিছু ডাকে।’ সামনের সিট থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন মানবেন্দ্র, ‘হেমন্ত মুখার্জির জবাব নাই’। বাঁইচ্যা থাকেন’। এ জগতে দাঁড়িয়ে যখন পারস্পরিক অবিনয় দেখি, তখন এই ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় শ্রদ্ধা কাকে বলে। ওঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে গানে অকারণ কালোয়াতি করতেন, হয়তো কথাটা খানিকটা হলেও সত্যি। কিন্তু আমার মনে হয় ওটা ওঁকে মানাতোও। পাঠক চোখ বন্ধ করে ভাবুন দেখি একবার, ‘আমি যে মন্দ তাতে সঙ্গিনী গো, সন্দেহ কী/ তুমি যে ভালো সে কি নতুন করে জানব সখি’ এটা হেমন্ত গাইছেন। স্পষ্ট কল্পনার বদলে কষ্ট কল্পনা হবে। যাকে যা মানায়। এই গানটাতেও অলোকনাথ দে’র অসামান্য বাঁশী ছিল। আসলে মানবেন্দ্রের পাশাপাশি এঁদের উল্লেখ না করলে নিজের অস্বস্তি হয় ।
বারাসাতে একটা অনুষ্ঠানে তখন হৈমন্তী শুক্লা গাইছেন, গাওয়া শেষ হতেই, স্টেজে উঠে চলে ওঁর হাতে ৫ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন, তরুনী হৈমন্তীকে। এই দরাজ দিল মানুষটার নাম যে মানবেন্দ্র হবে, এ আর আশ্চর্য কী। মানবেন্দ্র যখন গান, ‘হে মহা লক্ষ্মী জননী, গৌরি শুভদা’ (তব অচিন্ত্য রূপ চরিত মহিমা) আহা মনে হয় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের লাইনটা,’ ‘বন্ধুরা বিদ্রুপ করে তোমাকে বিশ্বাস করি বলে;/ তোমার চেয়েও তারা বিশ্বাসের উপযোগী হলে/ আমি কি তোমার কাছে আসতাম ভুলেও কখনো?’ এই মানবেন্দ্রকে শুনেছি মধ্যমগ্রামের অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখনকার এক উঠতি নায়ক নায়িকার নাচ গান হবে বলে। আমাদের পূর্বসূরি এখনও উপস্থিত রক্তে।
