
‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন ডলি আনোয়ার, জহিরুল হক, কেরামত মাওলা
ঘরে এক দানা খাবার নেই। তিন চারদিনের ভুখা পেট রাক্ষুসে খিদেতে ক্ষেপে উঠছে। চারপাশে তখন কালোবাজারি আর গরিব মানুষগুলোকে প্রাণে মারার জন্য তৈরি ‘কৃত্রিম খাদ্য সংকট’। হাড় গিলগিলে চেহারা আর বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইয়ের ভিড়ে এরপর, হারিয়ে গেল কত লক্ষ মানুষ। ইতিহাস তাকে দিল গালভরা নাম, ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’। ভিটেমাটি ছেড়ে, এ সময়ে কাতারে কাতারে মানুষ এসেছে গ্রাম থেকে শহরে। লঙ্গরখানায় ভিড় জমানো মানুষগুলো পেটের জ্বালায় উচ্ছিষ্ট খাবার ভাগ করে খেয়েছে সারমেয়দের সঙ্গে। তারই মধ্যে আকাশে তখন চলেছে বিদেশি বোমারু বিমানের আনাগোনা। প্রাক্ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মন্বন্তর পর্বের এই যে ভয়ংকর চেনা ছবি, তাকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েই এক মাঝবয়সী মেয়ের লড়াই শুরু হয় তার ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’-তে। কেমন সেই মেয়ে, তার বাড়িটিই বা কেমন, কেন তার লড়াই, এসবের খোঁজ নিতে হলে, আমাদের চলে যেতে হবে দেশভাগের ঠিক আগের সময়টিতে, দারিদ্র্য আর কাঁটাতারের খোঁচায় মানুষ যখন আদতেই ফালাফালা হয়ে যাওয়া দলা মাংসপিণ্ড ভিন্ন আর কিছুই নয়।
বিখ্যাত ঔপন্যাসিক আবু ইসহাকের কালজয়ী সৃষ্টি ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’-র (১৯৫৫) পটভূমি যদি হয় দেশভাগ, মন্বন্তর, অন্ধ কুসংস্কারে ঘেরা অশিক্ষিত সমাজ, তবে তার মুখ্য চরিত্র এক সাধারণ মেয়ে জয়গুণ। হতদরিদ্র মুসলমান পরিবারের গৃহবধূ এই জয়গুণ তার চালচলন, চিন্তা ভাবনায় সমকালের চেয়ে অনেক এগিয়ে। চরম অভাবের মধ্যে থেকেও অন্যায় আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে জ্বলে উঠবার তীব্র শক্তিতে সদা ভরপুর তার চোখ। তাই সমাজের কাছে সে ‘বেপরদা, বেশরম ওউরাত’। হাজারো তওবায় যাকে সবসময় বেঁধে ফেলতে চায় সমাজ। কিন্তু পারে কি! এর উত্তর বড়ো নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন, তাঁদের পরিচালিত ছবি ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ (১৯৭৯)-তে। মূল উপন্যাসের হুবহু চিত্ররূপ এই সিনেমা। আর তা সম্ভব হয়েছে আশির দশকে বাংলাদেশের অনবদ্য অভিনেতা, অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার, জহিরুল হক, কেরামত মাওলাদের জন্যই। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমা এটি।
কেবল ‘এক বাটি ফ্যানের জন্য’ যখন অগুনতি দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষ অন্যের দরজায় দরজায় হত্যে দিত, অনেক লম্বা চওড়া রাজনীতির বুলি তখন পালে বাতাস তুলেছিল বড়ো। নতুন দেশ হলে তা হবে নিজের, এই মর্মে আশায় বুক বাঁধা মানুষগুলোর অবশ্য কপালে চিরকাল ভোগান্তিই লেখা থাকে। তাই ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’-র জয়গুণ, আসু, ময়মুন, সৌখির মায়েরা তাদের নতুন রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানে একসময় বলে ওঠে, “কত আশা ভসসা আছিল৷ স্বাদীন অইলে ভাত কাপড় সাইয্য অইব। খাজনা মকুব অইব। কিন্তু কই? বেবাক ফাঁটকি। আবার রেলগাড়ির ভাড়াও বাইড়্যা গেল।” জয়গুণের ছেলে আসু হুজুকে মেতে মায়ের ছেঁড়া কাপড় দিয়ে তাদের নতুন দেশের পতাকা বানালেও একটুও খুশি না হয়ে জয়গুণ তাকে বলে, ওসব ছেড়ে ঘরের চাল জোগাড় করতে। দরিদ্র -ভূমিহীন, পান্তাভাতে পোড়ামরিচ ভাগ করে খাওয়া জয়গুণদের সব থাকতেও কোনো কিছুই নিজের করে পাওয়া হয় না, সে দেশ হোক কিংবা সম্পর্কের অধিকার। জয়গুণের আত্মজ কাসুকে জোর করে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে তার প্রাক্তন স্বামী করিমবকশ্ জয়গুণের প্রথম পক্ষের সন্তান আসু আর ময়মুন-সহ জয়গুনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, আকালের সময়।
পথে নামার সেই শুরু জয়গুণের। অন্তত উপন্যাস কিংবা সিনেমার আখ্যান তেমনই তথ্য দেয়। কিন্তু আর পাঁচজন মেয়ের থেকে জয়গুণ আলাদা অনেকটাই। সাহসে, আত্মবিশ্বাসে সে প্রগতিশীল, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে বাগে আনতে তার জুড়ি মেলা ভার। তাই তো শুরুতেই দেখি যে সময় দলে দলে লোক শহরের লঙ্গরখানায় ছুটে যাচ্ছে গ্রাম ছেড়ে, সে সময় শহরের পথে পথে অপমান আর অবজ্ঞার সবটুকু অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত জয়গুণ তার ছেলে মেয়ে ভাই-বউকে নিয়ে গ্রামে ফিরছে। খুব অল্প দামে জয়গুণের বাবার অনেক আগেই কেনা এমন একটা জমিতে তারপর এরা ঘর তোলে, যে ভিটায় এর আগে অনেক বাসিন্দার অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে। গ্রামবাসীদের কাছে তাই এ জায়গাটা প্রেতাত্মা আর অশুভ শক্তির বাস। অথচ দরিদ্র জয়গুণ আর তার ছেলেমেয়েরা জানে তাদের মতো হতদরিদ্র মানুষদের এভাবে লোকের দেখানো ভয়ে কাবু হলে চলবে না। তাই ‘জিনপরি’ ঠেকানোর বাহানা করে চাল ভিক্ষে করতে আসা ফকির কিংবা তাদের বাড়ি ছাড়া করতে চাওয়া গেদু প্রধানের দুরভিসন্ধি বুঝতে জয়গুণের বাকি থাকে না। জয়গুণ জানে ঈশ্বর তাকে হাত দিয়েছে কাজ করে খাওয়ার জন্য, তাই সমাজের সবরকম বেয়াদপিকে উপেক্ষা করে বাড়ির বাইরে গিয়ে কখনও ঠিকে কাজ করেছে, কখনও চাল বিক্রি করেছে, কখনও বা ধান ঝাড়ার কাজ করেছে চালের কারখানায়। আধপেটা খেয়েও জয়গুণ সৎ পথে থাকতে শিখিয়েছে তার ছেলেমেয়েদের। কুসংস্কার আর কুপ্রথার বিরুদ্ধে কষাঘাত করেছে তার কথায়, ব্যবহারে। আর এরই মাঝে জীবন পথে সর্বহারা জয়গুণ তার মনের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছে তার মমতা মাখা মাতৃত্বকে, তার আত্ম সম্ভ্রমকে। গ্রামের বড়োলোক গেদুপ্রধান বা আরও অন্য লোকের তার শরীরটাকে লক্ষ্য করে ফেলা কুদৃষ্টির কাঁথায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে জয়গুণ তার দারুণ তেজে। এত দারিদ্র্যেও এই পৃথিবীর অনেক মানুষ পয়সার কাছে নিজের সম্ভ্রম বিক্রি করে না। জয়গুণ তাদেরই প্রতিনিধি। গ্রামীন কুসংস্কার, অশিক্ষা, নারী নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সদা বিরাজিত অতন্দ্র সাহসী যোদ্ধা এই জয়গুণ।
গড্ডালিকার বিপরীতে চলা মানুষগুলো যেমনই অনন্য, তেমনই জগৎ সংসারও তাদের কাছ থেকে জীবনের দাম নেয় বড়ো বেশি করে। এ গল্পের শ্রমজীবী জয়গুণ তাই সব সত্যি জেনে ফেলার অপরাধে গেদু প্রধানদের মতো সবজান্তা মানুষ রূপী হিংস্র পশুদের চক্রান্তের আগুনের শিকার হয়। তিল তিল করে ‘অপয়া’ তালগাছের ভিটায় পূর্ব-পশ্চিম দুয়ারী ঘর বাঁধা ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’-র সব স্বপ্ন অন্যায় আক্রোশে একসময় ভস্মীভূত হয়। হাহাকার ওঠে চারদিকে। এক মুহূর্তের জন্য সিনেমার পর্দা ভেদ করে ভবিষ্যৎ পুড়ে যাওয়ার গন্ধটা আমাদের নাকেও আসে। কিন্তু প্রথমেই বলেছি, জয়গুণকে আর পাঁচজনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ধুকতে ধুকতেও বেঁচে উঠতে জানে জয়গুণরা। তাই ছেলেমেয়ের হাত ধরে, একা এক মা আবারও অন্য কোনো জমিতে ঘর বাঁধার তাগিদে রুক্ষ মাঠের পাশ দিয়ে ফের হাঁটতে শুরু করে একসময়। এখানেই শেষ হয় সিনেমা এবং উপন্যাসের লিখিত গল্প। কিন্তু আসলে এখান থেকেই দর্শক কিংবা পাঠকের মনে জয়গুণের জীবন গল্পের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় যেন।
কারণ, যে তথাকথিত ‘অশিক্ষিত’ মুসলমান নারী তার সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতন্ত্রের নির্যাতন, ধনীর শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতেও নিজস্ব স্বর বজায় রাখতে পারে, তার গল্প এভাবে মন্বন্তর বা বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে কেবল সীমাবদ্ধ নয়। জয়গুণরা গল্প বলে চিরকালের লড়াইয়ের। শত অন্ধকারের মাঝেও জয়গুণরা দীর্ঘকালের আলোদানকারী দীঘল সূর্যের তেজের মতই প্রখর। জীবনে চলার পথে কোনো না কোনো সময়ে এই তেজের পরশ পেতে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ অবশ্য দ্রষ্টব্য।
*সংসদ বানানবিধি অনুযায়ী ‘বাড়ি’ বানানটি পরিবর্তিত হল
