অঞ্জন দত্ত এই ছবিতে গুরুবন্দনা করেননি
২০১৮ সালে মুক্তি পায় জার্মান পরিচালক ক্রিশ্চান পেটজল্ড-এর ছবি ‘ট্রানসিট’ (Transit by Christian Petzold)। এই ছবির আখ্যানসূত্র ১৯৪৪ সালে রচিত আনা স্যেঘেরসের একটি উপন্যাস, যার প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ‘অক্যুপায়েড ফ্রান্স’। কাহিনির প্রেক্ষাপট অপরিবর্তিত রেখেই পেটজল্ড সমকালীন প্যারিসে এই ছবির শুটিং করেন। ছবির গল্প চল্লিশের দশক, অথচ তার সেটিং ঊনবিংশ শতাব্দী। এই এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে পরিচালক বোঝাতে চেয়েছেন যে ১৯৪৪ সালে লেখা ফ্যাসিবাদ বিষয়ক একটি গল্প আজও সত্যি।

অঞ্জন দত্ত ও মৃণাল সেন
ফ্যাসিবাদ বলতে আমরা মূলত বুঝি এক প্রকার রাষ্ট্র রাজনীতি। অনেক সময়েই খেয়াল করি না যে ফ্যাসিবাদ এক প্রকার মানসিকতা যা আমাদের কাজে আচরণে বিভিন্ন ভাবে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পায়। ফ্যাসিবাদ কেবল সরকারি স্বৈরতন্ত্র নয় । প্রথার নামে, সংস্কৃতির নামে বদ্ধমূল ধারণা আর অভ্যাসের প্রতি শর্তহীন মানসিক আনুগত্য ফ্যাসিবাদের অন্যতম সংজ্ঞা। এই কারণেই ফ্যাসিবাদী সমাজ পরিবর্তন করা এত কঠিন। যদি কোনো রাজনৈতিক আদর্শ কেবল রাষ্ট্রের দ্বারা নির্মিত হয়, তাকে বদলানো অসম্ভব নয়। সেই বদল আসতে পারে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বা গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু যে আদর্শের মূল ব্যক্তি মনের গভীরে প্রোথিত, তাকে উপড়ে ফেলতে গেলে যে ‘অনলার্নিং’-এর প্রয়োজন, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা করতে পারি না বা চাই না। তার প্রধান কারণ আত্মসমালোচনা করা রাষ্ট্র সমালোচনা করার চেয়ে ঢের কঠিন। ঐতিহাসিকভাবে, যেমন আমরা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, সেই একই ভাবে নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পেরেছি কি ? আর পারি না বলেই আমাদের পক্ষে জাতি, লিঙ্গ, শ্রেণি, জাত বা ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে কোনো সাম্যবাদী সমাজ সৃষ্টি হয়ে ওঠে না। তাই বিশ্বের বহু দেশ দৃশ্যত গণতান্ত্রিক হলেও তা আসলে ফ্যাসিবাদী পরিকাঠামোর মধ্যে আটকে থাকে। ফ্যাসিবাদ হয়ে ওঠে এক চলমান বর্তমান।
অঞ্জন দত্ত আশির দশকের একটি ঘটনার সেটিং হিসেবে বেছে নিয়েছেন সমকালীন কলকাতা। যদিও ছবি দেখে আমরা বুঝতে পারছি সময়টা আশির দশক, কিন্তু ওই পেরিওডটিকে ধরার জন্য সেই ভাবে কোনো প্রপের ব্যবহার করা হয়নি।
মৃণাল সেন-এর প্রায় সব কটি ছবিই ফ্যাসিবাদ বিরোধী (Anti-fascism)। এই বিরোধিতা যেমন তাঁর ছকভাঙা ফর্মের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, ঠিক তেমন ভাবেই তাঁর কন্টেন্টের মধ্যেও তা লক্ষণীয়। তাঁর ছবি ও ছবির মাধ্যমে যে বাস্তব তিনি তুলে ধরেছেন, তা দ্বন্দ্বময় ও অন্তর্মুখী। এবং সেই ছবির বাস্তবের মধ্যে ঘটে চলা ঘটনারাশি ও অবস্থিত চরিত্রেরা সেই দ্বন্দ্ব ও অন্তর্মুখিতার প্রতীক। তাঁর ছবি পক্ষপাতহীন, সেখানে সহানুভুতি থাকলেও কোনো আবেগ তাড়িত রিপ্রেসেন্টেশন নেই। তিনি সবাইকেই এবং সব কিছুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছেন — এমনকি নিজেকেও ছাড়ছেন না। সেই কারণেই মৃণাল সেনের সিনেমা-র (Mrinal Sen Films) কোনো একমুখী পাঠ হওয়া প্রায় অসম্ভব। তাঁর ছবি আমাদের কোনো সহজ সমাধানের পথে নিয়ে যায় না, বরং নিরলস প্রশ্ন, সমালোচনা ও অস্বীকার করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। যেমন ভুবন সোম (১৯৬৯) ছবিতে তাঁর অধস্তন কর্মচারীর বেআইনি কাজের প্রতি ভুবন সোমের কঠোরতা আদতে কেবল নৈতিকতা নাকি ক্ষমতার আস্ফালন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয় , কারণ একদিকে যেমন এই প্রশ্নের মাধ্যমে মৃণাল ক্ষমতার হায়ারার্কিকে বুঝতে চেষ্টা করেন ও নৈতিক ভিত্তিতে তার সমালোচনা করেন, আবার অন্যদিকে অস্বীকার করেন কিছু তথাকথিত নৈতিকতার আদর্শ, যেগুলির দায় বুঝি চাপিয়ে দেওয়া হয় আমাদের বিষমমাত্রিক সমাজের কেবল বিশেষ কিছু শ্রেণির ওপর।
ভুবন সোম-এর তেরো বছর পর মুক্তি পায় মৃণাল সেনের চালচিত্র (১৯৮১)। এই ছবির দৃশ্যায়ন যেমন রীতিবর্জিত, তেমনি এই ছবির ঘটনা ও চরিত্রেরা ভালোও নয় আবার খারাপও নয়। বরং, তাদের দ্বান্দ্বিক সহাবস্থান ও মেলামেশার মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে আমাদের সমাজে সেই সূক্ষ্ম স্বৈরতান্ত্রিক পরিকাঠামোর উপস্থিতি এবং সেই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই বিরোধিতা কেবল ছবির চরিত্রদের দিয়েই নয়, ছবির দর্শকদের দিয়েও করিয়ে নিতে চান পরিচালক। একদম শেষ দৃশ্যে ছবির নায়ক দীপু একটি কম্প্রোমাইজ করে। ক্ষমতার সামনে, খানিকটা নিজের স্বার্থেই সে মাথা ঝোঁকায়। কিন্তু ছবির পরিচালক আবারো কোনো স্পষ্ট পক্ষ নেন না। যেন দর্শককে তিনি এই তর্কটি করার সুযোগ করে দেন যে দীপু ঠিক করলো না ভুল! এবং এই যে পুনরায় আমরা একমাত্রিক মীমাংসার সম্ভাবনার থেকে দূরে সরে গিয়ে ঢুকে পড়ি কথোপকথন, সমালোচনা ও প্রশ্নের আবর্তে, সেটাই হয়ে ওঠে মৃণাল সেন এর ছবির যথার্থ ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা; যা আজও প্রাসঙ্গিক এবং ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

অঞ্জন দত্তের চরিত্রে শাওন চক্রবর্তী
সেই প্রাসঙ্গিকতা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য অঞ্জন দত্ত চালচিত্র এখন (Chalchitra Ekhon by Anjan Dutt) নামে সম্প্রতি একটি ছবি বানিয়েছেন। এই ছবির বিষয় ১৯৮১ সালে নির্মিত মৃণাল সেনের চালচিত্র ছবিটির নির্মাণ ইতিহাস, যে ছবিতে অঞ্জন ছিলেন নায়ক এবং চলচ্চিত্র জগতে সেটাই তাঁর প্রথম কাজ। খানিকটা পেটজল্ড-এর মতোই অঞ্জন আশির দশকের একটি ঘটনার সেটিং হিসেবে বেছে নিয়েছেন সমকালীন কলকাতা। যদিও ছবি দেখে আমরা বুঝতে পারছি সময়টা আশির দশক, কিন্তু ওই পেরিওডটিকে ধরার জন্য সেই ভাবে কোনো প্রপের ব্যবহার করা হয়নি। তবে এক্ষেত্রে অঞ্জনের অনুপ্রেরণা খুব সম্ভবত আরেক ফ্যাসিবাদ বিরোধী ইতালিয়ান পরিচালক পিয়ার পাওলো পাসোলিনির ১৯৬৭ সালের ছবি ‘এডিপো রে’ (Oedipus Rex is a 1967 fantasy drama Italian film directed by Pier Paolo Pasolini) — যার উল্লেখ ‘চালচিত্র এখন’-এর একটি দৃশ্যে রয়েছে। অঞ্জন বলছেন এই ছবি মৃণাল সেনের প্রতি তাঁর ট্রিবিউট।
‘চালচিত্র এখন’-এ মৃণাল সেনের ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা বেশ রূপকী চালে উঠে এসেছে। অঞ্জন দত্ত গুরুবন্দনা করেননি। তাঁর কুনাল সেন (মৃণালের রেপ্লিকা) কোনো অতিমানব নন।
যদিও অঞ্জন দত্ত, মৃণাল সেনকে তাঁর মেন্টর মনে করেন, তাঁদের ছবির স্টাইল ও রাজনীতি খুবই আলাদা। তবু ‘চালচিত্র এখন’-এ মৃণালের ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা বেশ রূপকী চালে উঠে এসেছে। প্রথমত, অঞ্জন গুরুবন্দনা করেননি। তাঁর কুনাল সেন (মৃণালের রেপ্লিকা) কোনো অতিমানব নন। তিনি একজন ঘরোয়া মজাদার খামখেয়ালি মানুষ যিনি খুব বুদ্ধি ও যত্ন সহকারে ছবি তৈরি করেন। তাঁর সব আচরণ মোটেও সুমধুর নয়। কখনও বা তিনিও হয়ে ওঠেন অথরিটেরিয়ান। তাঁকে নিয়ে চিন্তক মহলে যা তর্ক বিতর্ক রয়েছে তারও কিছু অনুষঙ্গ উঠে এসেছে এই ছবিতে। কিন্তু তাঁর প্রতি রঞ্জনের (অঞ্জনের রেপ্লিকা) যে ভালোবাসা তৈরি হয় তার উৎস শ্রদ্ধা নয় — যা স্বৈরতন্ত্রের অন্যতম নির্দেশ, বরং নির্ভরশীলতা যা আমাদের অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে নিয়ে চলে সমষ্টির দিকে।
দ্বিতীয়ত, এই ছবির দুটি দৃশ্য ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার প্রেক্ষিতে খুবই প্রাসঙ্গিক। একটি দৃশ্যে ছবির একদম প্রথম দিকে আমরা দেখি, যেখানে কুনাল সেন রঞ্জনের সম্মতি না নিয়েই তার চুল কেটে দেন। দৃশ্যে দেখানো হয় রঞ্জন কাঁদছে অথচ প্রতিবাদ করতে পারছে না। কারণ প্রবাদ প্রতিম কুনাল সেন তখন ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। তিনি রঞ্জনের দিকে তাকাচ্ছেনই না। তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে রঞ্জন দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠিক যেমন নাটকের মহড়ায়, যেখানে রঞ্জন পরিচালক, তার সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে দলের অন্যান্য সদস্যরা। এই দৃশ্যের মাধ্যমে পরিচালক ও অভিনেতার মধ্যে যেভাবে ক্ষমতার ইকুয়েশন কাজ করে তা অত্যন্ত নিপুণ ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন অঞ্জন দত্ত।

নাটক বা ছবির ফ্লোরে পরিচালক আসলে ডিকটেটর। এই বিষয় নিয়ে মৃণাল সেনের ‘চালচিত্র’ মুক্তি পাবার এক বছর পর, ১৯৮২ সালে, বিখ্যাত আইরিশ সাহিত্যিক স্যামুয়েল বেকেট ‘ক্যাটাস্ট্রফে’ নামে ফরাসি ভাষায় একটি নাটক লেখেন। সেই নাটকের শেষ মুহূর্তে ডিরেক্টর বা ডিকটেটরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অভিনেতা চোখ তুলে তাকায় এবং সেই তাকানো হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ইঙ্গিত। ঠিক সেই ভাবেই ‘চালচিত্র এখন’-এর শেষের দিকে রঞ্জন প্রশ্ন করে কুনাল সেনকে। সে মেনে নিতে চায় না তার পরিচালকের নির্দেশ। যদিও রঞ্জনের আপত্তি অগ্রাহ্য করেন কুনাল সেন — ঠিক যেভাবে ক্ষমতা কিছুতেই প্রতিরোধের কাছে হার শিকার করে না, কিন্তু কোথায় যেন রঞ্জনের এই প্রতিবাদ হয়ে ওঠে মৃণাল সেনের প্রতি অঞ্জন দত্তর উপযুক্ত ট্রিবিউট।
_____
ছবি: চালচিত্র এখন | পরিচালক: অঞ্জন দত্ত | অভিনয়: অঞ্জন দত্ত, শাওন চক্রবর্তী, বিদীপ্তা চক্রবর্তী | সংগীত: অঞ্জন দত্ত ও নীল দত্ত