থার্ড থিয়েটার ধারার প্রথম নাট্যদল ‘শতাব্দী’
বাদল সরকার ছোটোবেলা থেকে রেডিওতে নাটক শুনতেন এবং নিজের ইচ্ছে মতোই বিভিন্ন গল্পের নাট্যরূপ দিতেন। কিন্তু তিনি ছোটোবেলায় কখনও কোনও দলে অভিনয় করেননি। কলেজ পাশ করে যখন তাঁর চাকরি জীবন চলছে, তখন ১৯৪৯ সালে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে লেকচারার পদে যোগ দেন। সেখানে থাকাকালীন ENACA (Entally Novice Artistes’ Cultural Association) নামে শৌখিন নাট্যসংস্থা তৈরি হয়। সেই সংস্থায় নাটক অভিনীত হতে থাকে। বাদল সরকার নানান গল্পের নাট্যরূপ দিতে থাকেন— সুবোধ বসুর ‘অতিথি’, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লাল পাঞ্জা’, ‘বন্ধু’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিরকুমার সভা’ ইত্যাদি। কিন্তু কিছু বছর পর ১৯৫২ সালে সেই নাট্যসংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। পরের বছর ১৯৫৩ সালে চাকরির সূত্রে আসেন মাইথনে ডি.ভি.সি.-তে। এখানে এসেও শুরু হয় অনেকগুলি নাটকের (বৈকুণ্ঠের খাতা, নতুন ইহুদি, ডিটেকটিভ, বন্ধু, মানময়ী গার্লস স্কুল, অতিথি ইত্যাদি) রিহার্সাল। রিক্রেয়েশন ক্লাবে ‘ডিটেকটিভ’, ‘বন্ধু’, ‘অতিথি’, ‘বিরিঞ্চিবাবা’, ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ নাটকগুলি মঞ্চস্থ হয়। ১৯৫৭ সালে তিনি লন্ডনে যান টাউন প্ল্যানিং পড়তে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ এই দু-বছরে তিনি লন্ডনে স্ট্রাটফোর্ড থিয়েটারে নাটক দেখেন। যেমন, জোয়ান লিটল্উডের নির্দেশনায় আইরিশ নাট্যকার বেহান-এর নাটক ‘দ্য হস্টেজ’, চার্লস লটনের নির্দেশনায় ‘দ্য বার্থডে পার্টি’ নাটক ইত্যাদি। এই সমস্ত থিয়েটার দেখে তাঁর মননে থিয়েটার সম্পর্কে ধারণা পরিপূর্ণ হতে থাকে। তখন তিনি নিজের একটা নাট্যদল গড়ার কথা ভাবেন।
অঙ্গনমঞ্চ থেকে বেরিয়ে ভিন্ন ধারার নাট্যচর্চা শুরু করেন বাদল সরকার, যা থার্ড থিয়েটার নামে পরিচিতি লাভ করলো। প্রথম যে নাটক দিয়ে এর যাত্রা শুরু সেটি ‘মিছিল’ (১৩ এপ্রিল, ১৯৭৪। রামচন্দ্রপুর, উত্তর ২৪ পরগনা)।
১৯৫৯-এ কলকাতাতে ফিরে আসেন। ১৯৬০ সালে ‘চক্র’ নামে রিহার্সাল ক্লাব-এর উদ্বোধন করেন। কারণ এখানে নাটক শুধুমাত্র রিহার্সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এই শর্তেই তৈরি হলেও কিন্তু শেষমেশ তাঁর রচিত নাটক ‘বড়ো পিসিমা’-র অভিনয় হয়। এই বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য অনেকে ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন। তবে আরও বেশ কয়েকটি নাটক ‘চক্র’ থেকে অভিনীত হয়— ‘সারারাত্তির’, ‘সলিউশন এক্স’, ‘শনিবার’, ‘রাম শ্যাম যদু’, ‘থানা থেকে আসছি’, ‘কবিকাহিনি’, ‘সমাবৃত্ত’। ‘চক্র’-এর সময়পর্ব ১৯৬০-৬৩। ‘চক্র’ থেকেই তাঁর প্রসেনিয়াম নাট্যচর্চা শুরু। তবে ‘চক্র’ বেশিদিন টিকে না থাকার কারণ, তিনি ১৯৬৩ সালে টাউন প্ল্যানিং-এর জন্য ফরাসি সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে ৯ মাসের জন্য ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে বসে তিনি বেশ কিছু নাটক লেখেন, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ (১৯৬৩), ‘সারারাত্তির’ (১৯৬৩), ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ (১৯৬৩), ‘কবিকাহিনি’ (১৯৬৩)। তারপর তিনি দেশে ফিরে এসে ‘বহুরূপী’ নাট্যদলে দেখেন তাঁর নাটক ‘প্রলাপ’-এর প্রযোজনা। সেই নাটক দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর টেমপেরামেন্ট-এর সঙ্গে মিলছে না। তাই তাঁকে আলাদা করেই কাজ করতে হবে। এমনকী বহুরূপী যে ‘বাকি ইতিহাস’ করেছিল, শৌভনিক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ করেছিল এদের কোনোটাই বাদল সরকারের ভালো লাগে না। তাঁর মতে, নাটকের আসল পয়েন্টগুলোই নষ্ট করে দিয়েছে। এই সব থেকেই মনের ভেতরে ভেতরে নিজস্ব নাট্যদলের ভাবনা প্রকটভাবে চাগাড় দিয়ে ওঠে। তখন ১৯৬৭ সালে ‘শতাব্দী’ নাট্যকোম্পানির প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত প্রসেনিয়াম মঞ্চে শতাব্দী-র প্রযোজনায় বেশ কিছু নাটক প্রযোজিত হয়— ‘কবিকাহিনি’ (১৯৬৮), ‘বাঘ’ (১৯৬৮), ‘বিচিত্রানুষ্ঠান’ (১৯৬৮), ‘প্রলাপ’ (১৯৬৯), ‘সারারাত্তির’ (১৯৬৯), ‘শেষ নেই’ (১৯৭০), ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ (১৯৭০), সাগিনা মাহাতো’ (১৯৭১), ‘আবু হোসেন’ (১৯৭২)। প্রসেনিয়ামের জন্য তাঁর শেষ লেখা মৌলিক নাটক হল ‘শেষ নেই’ (১৯৭০)। ‘আবু হোসেন’ নাটকটিই শতাব্দীর শেষ প্রসেনিয়াম মঞ্চের নাটক ১৯৭২, ৯ ফেব্রুয়ারি আকাদেমি অব ফাইন আর্টস-এ। ততদিনে অঙ্গনমঞ্চে পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক নাটক করা শুরু হয়ে গেছে।

এরপর থেকেই বাদল সরকার সম্পূর্ণ নতুন ভাবে নাটকের উপস্থাপনার কথা ভাবতে থাকেন। অঙ্গনমঞ্চে এসে সম্পূর্ণভাবে প্রথম পরীক্ষামূলক নাটক করেন ‘সাগিনা মাহাতো’ (১৯৭২-এ ২৪ অক্টোবর কলকাতার এবিটিএ হলে অভিনীত হয়)। এই নাটক সম্পর্কে সুজাতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাদল সরকার বলেছেন—
“১৯৭১ সালে যখন আমি ‘সাগিনা মাহাতো’ লিখলাম তখনই উপলব্ধি করলাম আমার প্রসেনিয়াম থিয়েটার ছাড়ার সময় উপস্থিত। ২৪ অক্টোবর (১৯৭২) সাগিনা মাহাতো প্রথম মঞ্চের বাইরে অলবেঙ্গল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন হলে দেখানো হল। নাটক চলাকালীন হঠাৎ আলো নিভে যায়। অন্ধকারের মধ্যেই চলল নাটক। পরে আলো ঠিক করা গেলেও নাটকে মঞ্চসজ্জার লাইট ব্যবহার করা যায়নি। এই অবস্থায় অগণিত দর্শক উপভোগ করলেন নাটক। নবজাগরণের একটা ঢেউ উঠল, বুঝলাম মঞ্চসজ্জা ছাড়াও নাটক চলতে পারে। এরপর ‘আবু হোসেন’ পরিপূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে (প্রসেনিয়াম মঞ্চে) অভিনীত না হওয়ায় অর্থনৈতিক সমস্যাটা প্রকট হয়ে উঠল। তখন মঞ্চ থিয়েটারের রীতি ভেঙে আমরা থার্ড থিয়েটারের পথে এগোই। ১৯৭২ সাল থেকে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এর ঘরে অঙ্গন মঞ্চে আমাদের নাটক চলতে থাকে।…”
বাদল সরকার বেঁচে থাকাকালীন দলের নাটকের যে মার্জিত রূপ ছিল, বর্তমানে তা নেই। যদিও থার্ড থিয়েটারের প্রথম এই দল আজও যে বাদল সরকারের দেখানো পথেই হেঁটে যাচ্ছে সেটিই প্রশংসনীয়।
এরপর আকাদেমির তিনতলায় অভিনয় হয় ‘স্পার্টাকাস’ (১২ নভেম্বর, ১৯৭২)। এই নাটক দিয়েই শুরু হয় প্রতি রবিবার আকাদেমিতে অভিনয়। তারপর হয় ‘প্রস্তাব’ (৭ অক্টোবর, ১৯৭৩), ‘মুক্তমেলা’ (৪ নভেম্বর, ১৯৭৩), ‘বীজ’ (১৯৭৩), ‘স্বাধীন ভারত’ (১৯ জানুয়ারি, ১৯৭৪, কার্জন পার্ক)।

এরপর অঙ্গনমঞ্চ থেকে বেরিয়ে ভিন্ন ধারার নাট্যচর্চা শুরু করেন যা থার্ড থিয়েটার নামে পরিচিতি লাভ করলো। প্রথম যে নাটক দিয়ে এর যাত্রা শুরু সেটি ‘মিছিল’ (১৩ এপ্রিল, ১৯৭৪। রামচন্দ্রপুর, উত্তর ২৪ পরগনা)। তারপর ‘শতাদী’ দল এক এক করে যে যে নাটকগুলি করেছে— ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ (৬ আগস্ট, ১৯৭৪। আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস), ‘লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালি’ (১৯ অক্টোবর, ১৯৭৪। কার্জন পার্ক), ‘ভানুমতীকা খেল’ (১৯ অক্টোবর ১৯৭৪। কার্জন পার্ক), ‘পরীক্ষা’ (১৯ অক্টোবর, ১৯৭৪ কার্জন পার্ক), ‘রূপকথার কেলেঙ্কারি’ (১৮ জানুয়ারি, ১৯৭৫। কার্জন পার্ক), ‘যদি আর একবার’ (২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬। আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস), ‘ভোমা’(২১ মার্চ, ১৯৭৬। রাঙ্গাবেলিয়া। দঃ ২৪ পরগনা), ‘সুখপাঠ্য ভারতের ইতিহাস’ (১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৬। থিওজফিক্যাল সোসাইটি হল)।
১৯৭৬-এর ২৩ এপ্রিল থেকে আবার নিয়মিত অঙ্গনমঞ্চে প্রতি শুক্রবার অভিনয় শুরু হয় থিওজফিক্যাল সোসাইটির হল ঘরে। সেখানে যে যে নাটক অভিনীত হয়— ‘ভোমা’, ‘মিছিল’, ‘ত্রিংশ শতাব্দী’, ‘স্পার্টাকাস’, ‘প্রস্তাব’, ‘সুখপাঠ্য ভারতের ইতিহাস’, ‘ভাঙা মানুষ’ (৮ এপ্রিল, ১৯৭৭), ‘মণিকাঞ্চন’ (২২ জুলাই, ১৯৭৭), ‘হট্টমালার ওপারে’ (২২ জুলাই, ১৯৭৭), ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ (২২ নভেম্বর, ১৯৭৭), ‘গণ্ডি’ (১২ মে, ১৯৭৮), ‘বাসি খবর’ (৬ জুলাই, ১৯৭৯), ‘সিঁড়ি’ (১ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫), ‘শানা বাউড়ির কথকতা’ (৩০ আগস্ট, ১৯৮৫), ‘জন্মভূমি আজ’ (২৩ মে, ১৯৮৬), ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (২২ মে, ১৯৯০)।

এরপর বর্তমান সময়ে এই দলে যে যে নতুন নাটক প্রযোজিত হয়েছে সেগুলির কিছু হল— ‘একটি হত্যার নাট্যকথা’ (১ অগাস্ট, ১৯৮০। সিন্ধুভবন), ‘মানুষে মানুষে’ (৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১। সিন্ধুভবন), ‘নাগিনী কন্যার কাহিনি’ (৬ অগাস্ট, ১৯৮২। সিন্ধুভবন), ‘খাটমাটক্রিং’ (১৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৩। সিন্ধুভবন), ‘সাদা কালো’ (২৬ অগাস্ট, ১৯৮৭। সিন্ধুভবন), ‘চূর্ণ পৃথিবী’ (১২ মে, ১৯৮৮। সিন্ধুভবন), ‘বাইস্কোপ’ (৬ জানুয়ারি, ১৯৮৯। সিন্ধুভবন), ‘ভুল রাস্তা’ (২ মার্চ, ১৯৮৯। সিন্ধুভবন), ‘দখল’ (৮ ডিসেম্বর, ১৯৯০। কার্জন পার্ক), ‘আন্দ্রোক্লিস ও সিঙ্ঘ’ (২৯ জুলাই, ১৯৯১। সিন্ধুভবন), ‘সাদা কালো’ (২৯ ডিসেম্বর, ১৯৯৩। সিন্ধুভবন), ‘ভুল রাস্তা’ (২৯ জানুয়ারি, ১৯৯৪। কার্জন পার্ক), ‘লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালি’ (২৬ মার্চ, ৯৪। শান্তিনিকেতন), ‘মিছিল’ (২১ মে, ৯৪। কার্জন পার্ক), ‘চড়ুইভাতি’ (১০ অগাস্ট, ১৯৯৪। চিত্রবাণী, অঙ্গনমঞ্চ), ‘ক চ ট ত প’ (১৯৯৭), ‘হট্টমালার ওপারে’ (২৪ এপ্রিল, ১৯৯৯। কার্জন পার্ক), ‘জন্মভূমি আজ’ (১১ জুন, ১৯৯৯। সিন্ধুভবন), ‘বগলা চরিতমানস’ (জুন ২০০০), ‘ভুল রাস্তা’ (২৪ মার্চ, ২০০১। কার্জন পার্ক), ‘নদীতে’ (৬ জুন, ২০০২। লরেটো কলেজের সামনে), ‘হট্টমালার ওপারে’ (২৮ ডিসেম্বর, ২০০৩), ‘আমরা মানুষ বটি’ (২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৪। লরেটো কলেজের সামনে), ‘খাট মাট ক্রিং’ (৬ নভেম্বর, ২০০৫। নন্দন), ‘নদীতে’ (৬ জানুয়ারি, ২০০৬। লরেটো), ‘জন্মভূমি আজ’ (৬ মে, ২০০৭। হিন্দ মোটর), ‘প্রলাপ’ (৬ জানুয়ারি, ২০০৮। নন্দন), ‘মিছিল’ (২৮ মার্চ, ২০০৯। বাঁশবেড়িয়া), ‘ওরে বিহঙ্গ’ (১৯ ডিসেম্বর, ২০১০), ‘হট্টমালার ওপারে’ (৭ জানুয়ারি, ২০১১। নিউ মার্কেট), ‘উদ্যোগপর্ব’ (২০১৩-১৫), ‘যমপুকুর ব্রত’ (২০১৬, প্রসেনিয়াম আর্ট সেন্টার), ‘থাকে শুধু নচিকেতা’ (২০১৭, প্রসেনিয়াম আর্ট সেন্টার) ইত্যাদি।
তবে বাদল সরকার বেঁচে থাকাকালীন দলের নাটকের যে মার্জিত রূপ ছিল, বর্তমানে তা নেই। যদিও থার্ড থিয়েটারের প্রথম এই দল আজও যে বাদল সরকারের দেখানো পথেই হেঁটে যাচ্ছে সেটিই প্রশংসনীয়।