
পঞ্চমাঙ্কের নাটকের মতো আখ্যানের প্লটের রেখাচিত্রও পাঁচটি বিন্দু স্পর্শ করে এগিয়েছে
ঋতুপর্ণ ঘোষের উৎসব (২০০০) ছবির আখ্যান ধ্রুপদী গড়নের। পঞ্চমাঙ্কের নাটকের মতো আখ্যানের প্লটের রেখাচিত্রও পাঁচটি বিন্দু স্পর্শ করে এগিয়েছে। পঞ্চমীর সকাল থেকে কাহিনি শুরু হয়, চলে প্রায় কালীপুজোর সময় পর্যন্ত। শুরুর পর রাইজিং অ্যাকশন চলে দশমী পর্যন্ত। দশমীতে ক্ল্যাইম্যাক্স। একাদশী থেকে ফলিং অ্যাকশনের শুরু। মোট পাঁচটি দিনের ঘটনা সরাসরি ঘটেছে — পঞ্চমী-অষ্টমী-দশমী-একাদশী-কালীপুজো (প্রায়)।
রাইজিং অ্যাকশনের শুরু এবং ফলিং অ্যাকশনের শেষের মধ্যে ঘটনাগত সাদৃশ্য হল, দুটোই শিশিরের একটা চিঠির সূত্রে; যখন পিছনে ভিখারীর কীর্ত্তনের সঙ্গে ‘দুটি পয়সা দেবে গো মা’র আকুল প্রার্থনার আওয়াজ ভেসে আসে; ভগবতীর হাতে ধরা থাকে চিঠি। অন্যদিকে সমস্ত ঘটমান দিনগুলোর দিকে তাকালে দেখবো দশমী এবং একাদশীর ঘটনার মধ্যে কোনো ফাঁক নেই, যা আখ্যানের ঘনপিনদ্ধ ক্ল্যাইম্যাক্সের বাইরের সূচক। আখ্যানের ধ্রুপদীয়ানার মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এর প্রলোগ অংশ এবং মিথ-আর্কেটাইপের ব্যবহার। আমরা জানি ধ্রুপদী আখ্যানে প্রলোগ অংশে কাহিনির সূত্রকে ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো কাহিনির ছক, এমনকি পরিণতির ঈঙ্গিতও দেওয়া থাকে। ‘উৎসবে’র প্রলোগ এর ওপেনিং সিন; জয়ের (রাতুল শংকর) ভিডিও শুটের নানা দৃশ্যে ও বর্ণনায়। এই প্রলোগে কাহিনিগত তথ্য দেওয়ার সঙ্গে সিনেমার আর্কেটাইপ ছকটাও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরস্বতীর সংসার
মৃৎশিল্পী বংশীদা ও বুম্বার (বিনীত রঞ্জন মৈত্র) মধ্যে দেবী দুর্গা এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে কথোপকথন চলছে। সেখানে, বাংলার লোক-ধারণায় চার সন্তান-সহ দেবীর বাপের বাড়ি আসার কথাই গল্পের ছলে বলা হয়। এই ছাঁচের গল্প আসলে ‘উৎসবে’র পারিবারিক ছাঁচটিকে চিহ্নিত করতে চেয়েই।
ভগবতীর (মাধবী মুখোপাধ্যায়) দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড়ো ছেলে অসিত (প্রদীপ মুখার্জি), তারপর ক্রমে নিশীথ (বোধিসত্ত্ব মজুমদার), পারুল (মমতা শংকর) এবং কেয়া (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)। চারজনেই পুজো উপলক্ষে গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে এসেছে। কাহিনিতে মূল চরিত্র এই পাঁচজন। কাহিনি এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই, তাদের সকলের জীবনের ব্যক্তিগত সমস্যা পারিবারিক সমস্যার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। প্রলোগ অংশে বংশীদা কথিত একচালার সাবেকী প্রতীমা আসলে একটা প্রতীক, যা এই পারিবারিক সমস্যার ছকটাকে ধরায়।
উত্তরাধিকার
গণেশ বড়ো ছেলে। ষষ্ঠীর দিন গণেশের বিয়ে হয় কলা বৌয়ের সঙ্গে (যদিও শাস্ত্রীয় মতে, কলা বৌ গণেশের বৌ নয়। দেবী দুর্গার ভিন্ন রূপ শাকম্ভরীর প্রতীক হিসেবে কলা বৌয়ের বোধন হয়)। আমাদের গল্পে অসিতের বউ বনানী (অলোকান্দা রায়) এই পাঁচজনের পরিবারের সমস্যায় মন্তব্য করেন, কিন্তু দূরের কেউ হিসেবেই। প্রধান চরিত্র নয়, বনানী পার্শ্ব চরিত্র হিসেবেই থেকে যায় সিনেমায়। অথচ অসিতের নিজের কোনো সমস্যা না থাকলেও সব সমস্যার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত থেকে পারিবারিক চালচিত্রকে ধরেছে।
প্রলোগে বলা হয়েছে কার্তিক আইবুড়ো। তাই, নিশীথের স্ত্রী অনুরাধা (অনুরাধা রায়) পরিবারের কোনো সমস্যায় সরাসরি কথাই বলে না। যে কারণে অনুরাধার চরিত্রকে আঁকাই হয়েছে আপাত উন্নাসিক। তার সমস্ত মন্তব্যই পরোক্ষে। যেন পারিবারিক এই কাঠামোয় সে নেই। কার্তিক দেব সেনাপতি। নিশীথের সমস্যাও বাইরের – ফ্যাক্টরির লক্-আউট সংক্রান্ত। এখানেও দেখব, নিশীথ নিজের সমস্যার থেকেও অনুরাধাকে আড়াল করে রাখে। এ আসলে সেই ‘নেই’-কেই চিহ্নিত করতে চাওয়া।
দুই মেয়ে পারুল ও কেয়া। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর আর্কেটাইপ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এই চরিত্র দুটিতে।
পুরাণ অনুযায়ী লক্ষ্মীর জন্ম সমুদ্রমন্থনকালে। সে সময়ই বাসুকীনাগের মুখ নিঃসৃত বিষ থেকে অলক্ষ্মীর জন্ম। পারুলের মধ্যে এই দুই দেবীর আর্কেটাইপ। বাড়ির সমস্ত কাজের তত্ত্বাবধান থেকে রূপের মধ্যে, সাজ-পোশাকের মধ্যে পারুলের লক্ষ্মীশ্রী মূর্তি স্পষ্ট। তার সিঁথি জুড়ে লাল চওড়া সিঁদুর, নববধূর মতো লাল-হলুদ রঙের শাড়ির বাহুল্য, গা ভর্তি গয়না, চওড়া জড়ি পাড়ের শাড়ি – এ সব তার আলম্বন।
একটা বিরাট মিথ-পুরাণের আর্কেটাইপকে আঁকতে চেয়েই এই সিনেমায় এহেন কাহিনি ও চরিত্রের বয়ন। যা বাঙালির শারদোৎসবের আমেজকে ছুঁয়ে ফেলে কোথাও। যা হয়তো এক নিমেষে বুনে দিতে পারেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ ঘোষ।
অন্যদিকে চিত্রনাট্যকার অলক্ষ্মীর ধারণাও ঢুকিয়ে দেন পারুলের অতীত জীবনের ঘটনা বর্ণনায়। উপাখ্যান অনুযায়ী অলক্ষ্মী ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ঈর্ষা, অমঙ্গল এবং ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব এনে কুলবিনাশ করেন। পারুলের সঙ্গে শিশিরের (দীপঙ্কর দে) পূর্ব সম্পর্কের জেরে ঘটা পারিবারিক কলহ এবং ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব আসলে পারুলের সূত্রে কাহিনির মধ্যে ‘অলক্ষ্মী’ ধারণার বীজ বুনে দিতে চাওয়ারই দ্যোতক। এমনকি, দীপাবলির সন্ধ্যায় লক্ষ্মী বরণ এবং অলক্ষ্মী বিদায়ের যে লোকাচার বাংলার ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয়, গল্পে তারই প্রতীকী রূপায়ণ – একাদশীর সন্ধেয় শিশিরের সঙ্গে দীর্ঘ বাইশ বছর পরে শিশিরের মুখোমুখি দেখা হওয়ায় এবং তাকে চলে যেতে বলায়। যদিও আধুনিক দৃষ্টিতে এর মধ্যে ‘অলক্ষ্মী’ কিছু নেই। তবু মনে রাখতে হবে, এই ছকটা পুরোটাই ধ্রুপদী। তাছাড়া সিনেমায় পারুল সরাসরি এই সম্পর্ককে ‘ভুল করা’ বলেছে।
এখানে সরস্বতীর সমান কেয়া। দেবী মনসারও নাম কেয়া; কেয়াপাতায় জন্ম বলেই তার নাম কেয়া। মনসা ও সরস্বতী দুই দেবী কল্পনার পিছনে যেহেতু একই মূল তাই এখানে সরস্বতীর নাম কেয়া। কেয়া শিল্প-কলার চর্চা করে (তার স্বামী অরুণ – প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (ব্রহ্মা) ও সে তাদের গ্রামে আঁকার স্কুল খোলে শেষ পর্যন্ত)। দ্বিতীয়ত কেয়ার পোশাকে সরস্বতীর পূর্ণ ছাপ ছিল। কেয়াকে প্রথম দৃশ্যেই দেখানো হয়েছে সকালের প্রধানের পরে লাল ব্লাউজ ও সবজেটে সায়া পরে থাকতে। তারপর সে লাল রঙের একটা শাড়ি গায়ে রাখে কিন্তু পরে না, পরে সরু পাড়ের সবুজ হালকা শাড়ি। পরে আবার, অষ্টমীর সকালে হলদে পাড়যুক্ত সাদাটে একটা শাড়ি প’রে সে দাদাদের দেখায়। লাল শাড়ি না পরা বা দাদাদের দেখানোয় সরস্বতীকে চিনিয়ে দিতে চাওয়ার চিন্তা কাজ করেছে। তাছাড়া কেয়ার একাধিক ক্লোজআপে সরস্বতীর ধ্যান মন্ত্র বা প্রণাম মন্ত্রকে মনে পড়ে যায় – হুবহু একই রকম। হালকা গয়না, শুভ্র সাজ।
এর সঙ্গেই বলার, পুরাণ অনুযায়ী কেয়া ফুল অভিশপ্ত। তার কারণ আবার ব্রহ্মা ও শিবের মধ্যের একটা বিরোধের ঘটনা। ‘উৎসবে’র আখ্যানে শিব যেহেতু বাবা, তাই তাঁর সঙ্গে অরুণের রাজনৈতিক বিরোধ এবং তা নিয়ে কেয়ার সঙ্গে ঝগড়ায় কোথাও কেয়া ফুলের অভিশপ্ত জীবনের আর্কেটাইপকে ধরিয়ে দেয়।
অলক্ষ্মী বিদায়ের সন্ধ্যা
এখানে বলার, জয় এবং শম্পার (অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়) সম্পর্কটায় এবং চরিত্রে উপরের পুরো ছকটাই নানাভাবে ধরানো হয়েছে। জয় তার মাকে যেভাবে আগলায়, কিংবা জয় এবং শম্পার প্রেম, কিংবা শম্পার গান-সাহিত্যের চর্চা – সবই গণেশ-কার্তিক-লক্ষ্মী-সরস্বতীর আর্কেটাইপের সংমিশ্রণ।
একটা বিরাট মিথ-পুরাণের আর্কেটাইপকে আঁকতে চেয়েই এই সিনেমায় এহেন কাহিনি ও চরিত্রের বয়ন। যা বাঙালির শারদোৎসবের আমেজকে ছুঁয়ে ফেলে কোথাও। যা হয়তো এক নিমেষে বুনে দিতে পারেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ ঘোষ।
