‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল
২০০৭ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর পরিচালিত ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ (The Last Lear by Rituparno Ghosh) ছবির জন্য ইংরেজি ভাষায় নির্মিত সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। ছবি মুক্তি পেয়েছিল ২০০৮-এর সেপ্টেম্বর। দ্য লাস্ট লিয়ার-এর ক্রেডিট টাইটেলের প্রথম ফ্রেমই “Inspired by Utpal Dutt”!

ঋতুপর্ণ নিজে বলছেন, “আমি আজকের সাজাহান যখন দেখেছি আমি তখন খুব ছোটো। উৎপলদা থিয়েটার ও সিনেমার দক্ষ পরিচালক ও অভিনেতা। তাঁর সেন্স অফ ড্রামা অতুলনীয় আকর্ষণীয়!
স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহল হয় কী ইন্সপিরেশন তিনি পেলেন! উৎপল দত্ত তাঁর নাট্য দর্শনের আঁতে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ লালন করতেন এবং নিজেকে একজন প্রোপাগান্ডিস্ট হিসেবে ক্রমাগত জাহির করে গেছেন। তাতে স্পষ্ট ঋতুপর্ণ ঘোষ চলচ্চিত্র বা সাহিত্য কীর্তিতে কখনও রাজনৈতিক অভীপ্সা প্রকাশ করতে আদৌ স্পষ্ট ছিলেন না। বরং বাংলা তথা ভারতীয় মধ্যবিত্ত (মধ্যমেধাও পড়া যায়) মনোরঞ্জন মূলক ঝাঁ চকচকে স্মার্ট ছবি উপহার দিয়েছেন। তাঁর ছবিতে সেই হিরের আংটি থেকেই রঙের বাহার আর জৌলুষ জাঁকদার সেটের ব্যবহার। উৎপল দত্তের নাট্যযাত্রায় সেই অঙ্গার থেকেই “দর্শক কে চমৎকৃত করতে হবে! সারাদিনের ক্লান্তিশ্রান্তি নিয়ে যে দর্শক আসবে তার কাছে দৃষ্টি নন্দন নাট্যপ্রযোজনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্লেষণ জরুরি” বলছেন। তাঁর নাট্য নির্মাণ বিষয় উপস্থাপন নিয়ে এ লেখা নয়। আমরা খুঁজে দেখছি ঋতুপর্ণ ঘোষের ইন্সপিরেশন। ‘লাস্ট লিয়ার’ দেখতে বসলে এক শেক্সপিয়ার খ্যাপা অভিনেতা হরিশ মিশ্র ওরফে হ্যারিকে পাই! তিনি অতি প্রবীণ। প্রত্যক্ষ শিল্প- নাট্যাভিনয় এবং চলচ্চিত্র মাধ্যমের ধোঁকাময় নির্মাণ ও শেষ পর্যন্ত দর্শকের কাছে আপাত বাস্তব একটা প্রেজেন্টেশন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। হ্যারি তাঁর স্বপ্নের প্রযোজনা ‘কিং লিয়ার’-এর মহলার শেষ পর্বে থিয়েটার পরিত্যাগ করেন। একেবারেই ব্যক্তিগত অভিমান ও অপমান থেকে নিষ্কৃতি নিলেন। তাঁর অভিনয় দেখে আবেগ উদ্বেল বন্দনা এক কাপড়ে তাঁর বাসগৃহে চলে আসেন। বন্দনাকে নিয়ে কটুকথা তাঁর সহ্য হয়নি। সেই কিং লিয়ারের প্রযোজনা সম্ভাবনা কত বছর আগে তা স্পষ্ট নয়। ২০০৭ সালে বন্দনার বয়স দেখে মনে হয় খুব বেশি হলে কুড়ি বছর আগে মানে ১৯৮৭-তে হ্যারি নাটক থেকে বিদায় নিয়েছেন। কলকাতার প্রেক্ষাপটে ছবি। ১৯৮৭ সাল কেন ইংরেজি বা বাংলায় শেক্সপিয়ার চর্চায় হরিশ “মিশ্র” বা তাঁর সহ অভিনেতা নিরজ “চোপড়া”-দের কোনো ইতিহাস নেই। এবং হ্যারি অন রকস হুইস্কি খান, অতিথি এলে সেই দিয়েই আপ্যায়ন করেন। তাঁর ঘর জুড়ে পুরস্কার এবং এবং একটি একোয়ারিয়াম। বাড়িতে কফি থাকে না। মনে হয় হ্যারি পানীয় মানে হুইস্কিই জানেন।
১৯৮৭-তে কলকাতায় ইংরেজিতে শেক্সপিয়ার প্রযোজনা করে তিনি অর্থ সঞ্চয় করেছেন এবং বন্দনা ছবির একটি মুহূর্তে বলেন হু আস্ক্স চ্যারিটি। মানে তাঁরা সচ্ছল! হ্যারি ব্যক্তি চরিত্রটির অভিনয় শৈলী উৎপল দত্ত অনুপ্রাণিত অবশ্যই। হ্যারি তাঁর জানালা থেকে তাঁর বাড়ির ঘেরা দেওয়ালে পথচারী হিসি করলে গাল দেন। তাঁর কাছে সাংবাদিক এলে সেই সাংবাদিকের শেক্সপিয়ার অনজ্ঞতা নিয়ে আক্রমণ করেন এবং পলায়নপর সাংবাদিককে জানালা থেকে হুংকার দিতে থাকেন। এখানে হ্যারির চরিত্র যদি কলকাতায় শেক্সপিয়ার চর্চা নিয়ে অগ্রগণ্য বা অগ্রপথিক উৎপল দত্তের ছায়া থাকে সেখানে কিছু প্রশ্ন থাকে। এলজেবিথান যুগের শেক্সপিয়ার তাঁর নাটকে সমকাম এমনকি প্রাক্বিবাহ সংসর্গ দেখাতে পারেন না। সেন্সর! কিন্তু তাঁর নির্মিত চরিত্রে সে সম্ভাবনা উঁকি দেয়। বয় এক্ট্রেসরা নারী চরিত্রে দেখা অভিনয় করতেন – এ তথ্য অবশ্যই স্মরণে রাখা জরুরি। হ্যারি তাঁর সহ অভিনেতা “নিরজ চোপড়া” যৌন বাসনা নিয়ে অপ্রত্যাশিত ব্যঙ্গ ঠাট্টা করেন। থিয়েটারের মানুষের এটা কি মানায়! ঋতুপর্ণ মনে হয় তাঁর বিশেষ কোনো মনবাঞ্ছা প্রকাশ করেছন। ‘লাস্ট লিয়ার’ ছবির শেষে পৌঁছালে বোঝা যায় উৎপল দত্তের ১৯৮৫-র প্রযোজনা ‘আজকের সাজাহান’-এর কিছুটা নিয়েছেন। কী রকম?
আরও পড়ুন: ভারতীয় মিথ, ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং ‘উৎসব’

আজকের সাজাহান-এ বর্ষীয়ান অভিনেতা কুঞ্জবিহারী চক্রবর্তী ছোটোবাবু (তাঁর অভিনয়কালে শিশির ভাদুড়ি বড়ো বাবু নামে খ্যাত)। কুঞ্জবিহারী নিজের ঘরে কালজয়ী নাটকের পোশাক প্রপস সাজিয়ে রাখেন। সহ অভিনেতা ননীগোপাল তাঁর কাছে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে তিনি ধ্রুপদী নাটক (যেমন চাঁদ সদাগর)-এ চাঁদের অভিনয় করতে থাকেন। সামাজিক কুসংস্কার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে চাঁদ তাঁর প্রিয় চরিত্র অবশ্য স্বীকার্য কুঞ্জবিহারীর বর্তমান বাস্তব বিরহিত জগতে বাস করেন। কুঞ্জবিহারী চলচ্চিত্রে অভিনয়ে রাজি হয়ে শ্যুটিংয়ে দেখেন অশিক্ষিত প্রযোজক ক্ষীরোদচন্দ্রের অর্থগৃধ্নুতা, নায়িকার প্রতি যৌনলালসা, তিনি রাতবিরেতে নায়িকার দরজায় কড়া নাড়েন (আজও কী প্রাসঙ্গিক)।
উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’ (সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবর্ষ – ১৯৭৫) নাটকে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের সত্তাধিকারী বীরকৃষ্ণ দাঁ (চোটার কারবারি মানে তেজারতির ব্যবসায়ী)-কে নিয়েও একই ছবি আঁকেন। অবশ্য দুই নাটকেই অর্থ লগ্নি যে করবে তার খেয়ালখুশিই চূড়ান্ত হবে, তাই-ই দেখিয়েছেন। এবং বীরকৃষ্ণ দাঁ-রা জানেন দু-হাতের দশ আঙুলের দশটা জড়োয় আংটির যে কোনো একটি দিয়ে সাহিত্য-ফাহিত্য কিনে নিতে পারেন। আজকের সাজাহান-এর নায়ক উজ্জয়ন একটি এক লাইনের সংলাপ শ্যুট করতে আটটি শট বাতিল করেন। পড়াশোনার ধার ধারেন না। এবং ক্রমাগত নতুন নতুন অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেম করেন। নাটকের প্রায় শেষের দিকে কুঞ্জবিহারী পরিচালক সুব্রতকে বলেন তোমরা নতুন যৌবনের দূত। তোমাদের কাছে বিপুল প্রত্যাশা। বাস্তব বিবাদী ছেঁদো প্রেমের গল্পে আমার চরিত্রটার কী মামুলি একটা নির্মাণ! মানে ইঙ্গিত করছেন পরিচালক একেবারেই এলিয়েনিয়েটেড। কুঞ্জবিহারী নিজেও বাস করেন সযত্নে গড়ে তোলা নাটকের যাদুঘরে। সাম্প্রতিক বর্তমানের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। সাংবাদিক তাঁর প্রেম সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে বলেন আমাদের পঙ্কিল জীবন। আমার প্রথম সঙ্গিনী হাফগেরস্ত বুঁচি। তারপর… যৌনাচারে তাঁদের বাছবিচার ছিলো না। হ্যারি তো তা নয়! কুঞ্জবিহারী কন্যাসম নায়িকা কুমকুমকে ওথেলো শোনান। স্টান্টম্যানকে সরিয়ে নিজে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার নাট্যভিনেতার দম্ভ সম্বল করে এগিয়ে যাওয়ার আগে ওথেলো থেকে উদ্ধৃত করেন, “Speak of me as I am, nothing extenuate. Nor set down aught in malice: then must you speak of one that loved not wisely, but too well!”
ঋতুপর্ণ নিজে বলছেন, “আমি আজকের সাজাহান যখন দেখেছি আমি তখন খুব ছোটো। উৎপলদা থিয়েটার ও সিনেমার দক্ষ পরিচালক ও অভিনেতা। তাঁর সেন্স অফ ড্রামা অতুলনীয় আকর্ষণীয়!

(১৯৬৩-তে ঋতুপর্ণের জন্ম, ১৯৮৫-তে আজকের সাজাহান। ৪৭ থেকে ৮৫ ইংরেজি ও বাংলায় শেক্সপিয়ার থেকে উৎপল দত্তের অন্যান্য বৈপ্লবিক রাজনৈতিক থিয়েটার অন্তত ৮০ এবং সিনেমা অন্তত একশো অভিনয় পরিচালনা সহ; যাত্রা ২১টা)
হ্যারি ক্রমাগত The Tempest-এর প্রসপেরো অভিনয় করে শোনান। প্রাক্তন ডিউক অফ মিলান জাদুকর! On the dreadful thunderclaps more momentary and sight out turning or not the fire and cracks… পরিচালক সিদ্ধার্থ জানি টেম্পেস্ট-এর অ্যাক্ট ওয়ান সিন টু। এটুকু জ্ঞানই হ্যারিকে আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন পরিচালক। লাস্ট লিয়ার-এ দুটো নারী চরিত্র (শবনম নায়িকা, আইভি নার্স) কুৎসিত পুরুষতান্ত্রিকতায় ছারখার। আর বন্দনা শয্যাশায়ী প্রায় জ্ঞানহীন হ্যারির লালন কর্তৃ। শেষ দৃশ্যে বাহ্যজ্ঞান রহিত হ্যারি শবনমের কিং লিয়ার সংলাপে উৎসারিত হয়ে সংলাপ বলে অস্ফুট স্বরে। আজকের সাজাহান-এর শেষ দৃশ্যে কুঞ্জবিহারী নিজের প্রবাদপ্রতিম চরিত্র সাজাহান-এর সংলাপ বিস্মৃত।
ঋতুপর্ণ সামলেসুমলে নিয়েছেন। সামান্য! নিয়েছেন! অভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা, রবিরঞ্জন মৈত্রর সম্পাদনা আর ঋতুপর্ণের সংলাপ সহ তাঁর অতুলনীয় দৃশ্য নির্মাণ ‘লাস্ট লিয়ার’ একটা উপভোগ্য দর্শনসুখের ছবি।
______
ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি দ্য লাস্ট লিয়ার | অভিনয়ে অমিতাভ বচ্চন, অর্জুন রামপাল, প্রীতি জিন্টা, শেফালি শাহ প্রমুখ