সিলেবাসের বাইরে শিশুদের ব্যতিক্রমী জীবনের শিক্ষা দিচ্ছে ‘পৃথিবীর পাঠশালা’

কলকাতা ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন জেলায় এখন ‘পৃথিবীর পাঠশালা’-র সংখ্যা প্রায় ৬০টি

শহরে করোনার গ্রাফ যখন তুঙ্গে, যখন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে সবাই তৎপর, ঠিক তখনই পথে নেমেছিলেন তাঁরা। ‘কমিউনিটি কিচেন’ চালিয়ে ভাত তুলে দিয়েছিলেন হত-দরিদ্র মানুষের মুখে। এ গল্প কোনো একদিনের ছিল না, দিনের পর দিন পাশে থেকেছেন তাঁরা। লকডাউনের পর থেকেই কলকাতার বুকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছিলেন একদল ছাত্র-যুবক। প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সাধারণ ছাত্রছাত্রী স্বপ্ন দেখেছিলেন মানুষকে ভালো রাখার। তাদের মিলিত সেই উদ্যোগের নাম ছিল ‘কোয়ারেন্টাইন স্টুডেন্টস ইয়ুথ নেটওয়ার্ক’। কিন্তু কী এই নেটওয়ার্ক?

পড়ার ফাঁকে বাচ্ছারা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া সুস্মিতা মণ্ডলের কথায়, “সোশ্যাল সলিডারিটি উইথ ফিজিক্যাল ডিসটেন্স”, এটাই ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। শুধু রোজকার অন্ন তুলে দিয়েই তাঁরা থেমে থাকেনি, পাশে থেকেছে জীবনের বিভিন্ন ওঠাপড়ায়। কখনও ছুটে গিয়েছে আমফান বিধ্বস্ত এলাকায়, কখনও পাশে থেকেছে কাজ হারানো একদল মানুষের।

তারপর সময় বদলেছে, দুর্যোগ কাটিয়ে ক্রমেই ছন্দে ফিরেছে জনজীবন। কিন্তু থেমে থাকেনি সেই পাশে থাকার অঙ্গীকার। তারা প্রতিদিন থেকে গিয়েছে পথে। ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে শহরতলিতে, জেলায় জেলায়। সময়ের সঙ্গে এসেছে শিক্ষার প্রশ্ন। এখনও বেশ কিছু প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়ে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তাই সেই দায়িত্বও অস্বীকার করতে পারেননি তাঁরা। এই দায়িত্ববোধই একদিন জন্ম দিয়েছিল ‘পৃথিবীর পাঠশালা’-র। পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের চেনা আলোয় আনার এক অন্যরকম পাঠশালা।

উৎসবের মেজাজে কচিকাঁচারা

‘পৃথিবীর পাঠশালা’, একদল ছাত্র-যুবদের স্বপ্নের নাম। ‘পাঠশালা’ শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে যায় চিরন্তন কোনো এক বিদ্যালয়ের আঙিনার কথা। পড়াশোনাকে ঘিরেই যার বিচরণ। কিন্তু পড়াশোনা বলতে আমরা কী বুঝি? ক্লাসের সিলেবাস, পরীক্ষা কিংবা ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া? নাকি পড়াশোনা হল সেটাই, যা আমাদের জীবনের কথা বলে, তৈরি করে মূল্যবোধ। এ যেন প্রথাগত শিক্ষার বাইরে বেরিয়ে একটু অন্যভাবে পৃথিবীকে চেনার চেষ্টা।

কলেজস্ট্রিট পাঠশালার জমজমাট ফ্রেম

এ প্রসঙ্গে পাঠশালার পক্ষ থেকে স্নেহা গাঙ্গুলি বঙ্গদর্শনকে জানান, “পড়াশোনা তো শুধু সিলেবাস মেনে হয় না, আমাদের রোজকার জীবন, আমাদের আশেপাশের পরিবেশ সবকিছু থেকেই এক অন্যরকম ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান শিখতে পারি। আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল সেটাই, যে আমরা বাচ্চাদের জীবনবোধের শিক্ষা দেব।”

নাচে-গানে-কবিতায় ভরপুর কলেজস্ট্রিট ‘পৃথিবীর পাঠশালা’

বাঁকুড়ার পাত্রসায়র এলাকাতেই প্রথম শুরু হয় একটি স্কুল। তারপর কলকাতার কালিকাপুর, রুবি, বাঘাযতীন, কলেজস্ট্রিট এবং পাটুলি অঞ্চলে শুরু হয় একইরকমের উদ্যোগ। শুধু কলকাতা নয়, তাদের পাঠশালা পৌঁছে গেছে দিকে দিকে। যাদবপুরের সৈকত সিট জানাচ্ছেন, “কলকাতায় সব মিলিয়ে ১৪টি পাঠশালা চলছে এই মুহূর্তে। এছাড়াও বিভিন্ন জেলায় এখন ‘পৃথিবীর পাঠশালা’র সংখ্যা ৬০টি।”

বাংলা জুড়ে তথাকথিত ব্যাক বেঞ্চারদের শিক্ষার আলো দেখাচ্ছে এই পাঠশালা। নাজিয়া, রমা, সহেলী, সুমনদের রোজ নিয়ম করে পড়তে বসার অভ্যেস করেছে ‘পৃথিবীর পাঠশালা’। শুধু পড়াশোনা নয়, নাচ, গান, আঁকা আবৃত্তি ইত্যাদি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দিকেও এগিয়ে দিচ্ছেন তাদের। পাঠশালা হয়ে উঠেছে জীবনের অঙ্গ। রোজকার পড়াশোনার পাশাপাশি বার্ষিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যেমন – বর্ষবরণ, রবীন্দ্রজয়ন্তী, রাখি বন্ধন ইত্যাদি দিয়ে মাতিয়ে রেখেছে পাঠশালা। নাচে, গানে, কবিতায় রঙিন মুহূর্ত এনে দিয়েছেন পাঠশালার প্রাঙ্গনে। শুধু তাই কেন! চার দেওয়ালের বাইরেও চলেছে এই পাঠশালা। বাচ্চাদের একটু বাড়তি আনন্দ দিতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছেন পৃথিবীর পাঠশালার ছাত্র-যুবরা।

‘পৃথিবীর পাঠশালা’র আয়োজিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা  

ঝড়, বৃষ্টি সবকিছু মাথায় নিয়েই রোজ পড়াতে যাচ্ছেন স্নেহা, আসিফ, শিভাঙ্গিরা। নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকছেন, পড়াচ্ছেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। হুগলির রিষড়া এলাকার পাঠশালাটি চালাচ্ছেন স্নেহা গাঙ্গুলি। স্নেহার কথায়, “আমরা তো ছিলামই, কিন্তু পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষও সবসময় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এসেছেন আমাদের পাশে। ওঁরা পাশে না থাকলে আমরা একা হয়তো কিছুই পারতাম না। যার যতটুকু সামর্থ্য সেটাই তুলে দিয়েছেন আমাদের হাতে।”

পুরুলিয়ায় আদিবাসিদের ‘পৃথিবীর পাঠশালা’

ফেসবুকে একটি পেজ রয়েছে ‘পৃথিবীর পাঠশালা’ নামে। সেই পেজই বারবার দিশা দেখিয়েছে ছাত্র-যুবদের। কখনও পাশে থাকার অঙ্গিকার, কখনও আর্থিক সহায়তা, কখনও খাবার কিংবা বই-খাতা দিয়ে সাহায্য করেছেন অনেকেই। অনেকেই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। আজ তাই ‘মাস্টারমশাই’-এর অভাব নেই পাঠশালায়। জেলার ছেলেমেয়েরা নিজেদের উদ্যোগেই চালাচ্ছে পাঠশালাগুলি। জানা গিয়েছে, পুরুলিয়ার পাঠশালাগুলি ওই এলাকার আদিবাসী নিজেরাই চালায়।

সময় চলেছে নিজের ছন্দে। রোজকার ব্যস্ততার ফাঁকে পাঠশালাও দিব্যি আছে খোশমেজাজে। সমাজের মূল স্রোতের বাইরে থাকা মুখগুলোতে প্রতিদিন আলো এনে দিচ্ছে ‘পৃথিবীর পাঠশালা’। আর ওই হাসিমুখগুলো দেখেই সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে নিচ্ছে স্নেহা, সুস্মিতা কিংবা সৈকতরা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্মিতাকে তার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে একরাশ আনন্দ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, যত দিন এই পাঠশালা থাকবে ততদিন আমিও থাকব।” তাঁরা সকলেই বিশ্বাস করেন, জাতবর্ণের ভেদাভেদহীন একটা ভিন্ন সমাজ গড়তে পারবে আগামীতে।

Developed by DXDasia