ফণি, আমফান, তাউটে হয়ে এবার ‘ইয়াস’ – ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম এল কোথা থেকে?

শোনা যাচ্ছে, তীব্র গতিবেগে রাজ্যের দিকে ধেয়ে আসছে নতুন ঘূর্ণিঝড়

২০২০ সালের ২০ মে পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়েছিল বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমফান। তার ক্ষত এখনও শুকোয়নি, তার মধ্যেই বছর ঘুরতে না ঘুরতে, শোনা যাচ্ছে তীব্র গতিবেগ নিয়ে রাজ্যের দিকে ধেয়ে আসছে নতুন গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘ইয়াস’। নতুন এই ঘূর্ণিঝড়ের আমফানের মতো ‘সুপার সাইক্লোনিক’ বৈশিষ্ট্য থাকবে কি না তা সময় বলবে, তবে মনে করা হচ্ছে এই মাসের শেষের দিকেই আছড়ে পড়বে ‘ইয়াস’।

একদিকে এই ঘূর্ণিঝড় নিয়ে চাপানউতর শুরু হয়েছে, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় তাউটের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত ভারতের পশ্চিম উপকূলের বিস্তৃর্ণ এলাকা। কমপক্ষে ১২ জনের প্রাণ কেড়ে শক্তি কমিয়ে এখন গুজরাটের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে তাউটে। ঘটনাচক্রে, বার্মিজে ‘তাউটে’-র অর্থ একধরণের টিকটিকি, অনেকটা আমাদের এখানকার টিকটিকির মতোই। থাই-এ আমফান অর্থ আকাশ। ইয়াস শব্দটি আবার ওমানের। ইংরেজিতে এর মানে দাঁড়ায় ‘দুঃখ’ অথবা ‘হতাশা’, একটা ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের এর থেকে উপযুক্ত নাম আর কীই বা হতে পারে!

আয়লা (মালদ্বীপের দেওয়া নাম), ফণি (বাংলাদেশের দেওয়া নাম), বুলবুল, তিতলি (দুটো পাকিস্তানের দেওয়া নাম) এবং আমফান, বাংলার সাম্প্রতিক স্মৃতিতে এখনও তাজা এই সব বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলি। এর মধ্যে কিছু শব্দের অর্থ আমরা জানি, কিছু জানি না। তবে, চাইলেই আমরা জানতে পারি কারা, কোন পরিপ্রেক্ষিতে রাখলো এইসব দাপুটে ঝড়গুলির নাম। কীভাবে একটা থাই-শব্দের ঝড় আছড়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গে? কীভাবেই বা একটা বাংলা-শব্দের ঝড় ধেয়ে গেল থাইল্যান্ডে? যাঁরা এখনও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানেন না, তাঁদের জন্য রইল এই তথ্যগুলি। 

২০০০ সালে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লুএমও) উত্তর ভারত মহাসাগর অববাহিকায় আসন্ন ঘূর্ণিঝড়গুলির জন্য নামকরণ করতে শুরু করে। এই নামকরণের জন্য সংস্থার তরফে বেছে নেওয়া হয়েছিল অববাহিকার আশেপাশের দেশগুলির প্রস্তাবিত নামের তালিকা, ভারতও অংশগ্রহণ করেছিল। তবে, প্রথমদিকে ভারত ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণে অনীহা দেখায় এবং চার বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর রাজি হয়। ২০০৪ সালে ভারতের আবহাওয়া সংস্থা (আইএমডি) উত্তর ভারত মহাসাগরে আসন্ন ঝড়গুলির নামকরণ শুরু করে এবং ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘ওনিল’-এর নামকরণের মধ্য দিয়ে এর সূচনা হয়।নয়াদিল্লিতে আইএমডি-র বিশেষ আঞ্চলিক  আবহাওয়া  কেন্দ্রটি(আরএসএমসি) বিশ্বের ছয়টি আবহাওয়া কেন্দ্রের মধ্যে একটি শুধু তাই নয়, এই সংস্থা উত্তর ভারত মহাসাগর অববাহিকার ১৩টি দেশকে পরামর্শও দেয়—ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইরান, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান , কাতার, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন।

নয়াদিল্লির আরএসএমসি এই সমস্ত দেশের প্রস্তাবিত নামের ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগর জুড়ে ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণের সঙ্গে জড়িত। ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণের সময় যে যে বিষয়গুলির উপর জোর দেওয়া হয় সেগুলি হল: নামগুলিকে হতে হবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিরপেক্ষ, ‘নিষ্ঠুর এবং হিংস্র’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। সংক্ষিপ্ত ও সহজে  উচ্চারণ করা যায় এরকম শব্দ ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহার করা যাবে মোট আটটি বর্ণ।

আইএমডি-র প্রস্তাবিত পুরোনো একটি তালিকার একেবারে শেষ ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল আমফান। তারপর আইএমডি তরফে ঘূর্ণিঝড়ের নামের একটি নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দেশের জন্য ১৩টি করে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়েছে। মোট ১৬৯ টি। ভারতের তরফে প্রস্তাবিত নামগুলি হল- গতি, তেজ, মুরসু, আগ, ব্যোম, ঝড়, প্রবাহ, নীর, প্রভঞ্জন, ঘূর্ণি, অম্বুদ, জলধি এবং ভেগা। ১৩টি ঝড়ের নামগুলি ব্যবহার হয়ে যাওয়ার পর, দ্বিতীয় তালিকা থেকে নামকরণ শুরু হয় এবং এভাবেই চলতে থাকে।

গ্লোবাল গাইডলাইন অনুসারে, যদি কোনও ঝড় অতিরিক্ত ধ্বংসাত্মক হয়, সেক্ষেত্রে সেই ঝড়ের নামটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং কোনও ঝড়ের জন্য সেই নাম আর ব্যবহার করা হয় না।

 

 

Developed by DXDasia