নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা, দায়িত্ব নিয়েছেন গৃহবধূ অসীমা ভাণ্ডারী
গতবছর লকডাউনের গৃহবন্দি জীবনে আমরা প্রত্যেকেই যে যার মতো করে নতুন আলো খোঁজার চেষ্টা করে গিয়েছি। কেউ আড়ালে, কেউ সোচ্চারে। আলো খোঁজার চেষ্টা জারি আছে এখনও। প্রায় ১২ বছর আগে, ২০০৯ সালে আয়লা বিধ্বস্ত সুন্দরবনের দয়াপুর গ্রামে যাওয়ার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বঙ্গদর্শন তখন সদ্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করছে গুটিগুটি পায়ে। বঙ্গদর্শনের পাঠক ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছেন, বাংলার ইতিবাচক ঠিকানার হালহকিকত, এমনকি আপনার বাড়িতে পৌঁছে গিয়ে সেই উদ্ভাসিত আলোটি খুঁজে আনার প্রচেষ্টা আমরা সারাবছর ধরে জারি রাখি আমরা।
সোশ্যাল মিডিয়ার হইচই আর একাধিক প্রিন্ট/ডিজিটাল মিডিয়ার ইঁদুর দৌড়ে আমরা চলতে অভ্যস্ত নই৷ বলা ভালো, এটা আমাদের কাজও মনে করি না। আমরা সবসময় বলতে চেয়েছি, এ জীবন তীব্রভাবে বেঁচে থাকার। তাই করোনা আক্রান্ত পৃথিবী বা আমফান বিধ্বস্ত বাংলার ধ্বংসের আর কান্নার ছবি আমরা দেখাইনি৷ বরং চেয়েছি ধ্বংসের মধ্যে থেকে নতুন পথ খুঁজে নিক মানুষ। ইতিবাচক বাংলার ছবিই তাই পৌঁছে গেছে পাঠকদের ঘরে ঘরে।
কাকিমার পাঠশালাঃ আগে এবং পরে
আমাদের আশ্রয় সেইসব মানুষগুলি, যাঁরা অন্ধকারের মধ্যে থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে জানেন। কেউ ভাঙা বাড়ি সারিয়ে তোলেন, কেউ সাধ্যমতো শিক্ষার প্রসার ঘটান, আবার বন্ধুর যত্ন নেন আরেক বন্ধু — এটাই তো বাংলা।
গতবছর আমফান ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বাংলার নানা প্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভুবনেশ্বরী গ্রাম তার মধ্যে অন্যতম। ঝড়ের রেশ কেটে গেলেও কুলতলির এই গ্রামে অনেকদিনই ধ্বংসলীলার চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। বহু মানুষ ঘরছাড়া, খাবারের জোগানে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সূর্য ডোবার পর অন্ধকারই ছিল একমাত্র ভবিতব্য। এই সংকটকালে গ্রামের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন অসীমা ভাণ্ডারী।
পড়ুয়াদের সঙ্গে অসীমা ভাণ্ডারী
অসীমার খোঁজ পেয়ে আমরা (বঙ্গদর্শন এবং ) তাঁর খবরটি সম্পূর্ণ তথ্যসহ প্রকাশ করি। প্রকাশিত হবার পর তা বহু পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় এবং দেশ-বিদেশ থেকে পাঠকরা আমাদের জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, কীভাবে এই অসাধারণ উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানো যায়। সেই মতো আমাদের মূল কোম্পানি পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস-এর তৎপরতায় এবং সরকারি সহায়তায় আমরা ভুবনেশ্বরী গ্রামের অসীমা ভাণ্ডারীর কাছে যাই।
ভুবনেশ্বরী গ্রামের গৃহবধূ অসীমার ছোটোবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের দারিদ্র। অভাবের কারণে চতুর্থ শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে না পারলেও ভেঙে পড়েননি তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই স্বপ্ন। আমফান সাইক্লোনের পর তিনিই হয়ে উঠলেন গ্রামের কচিকাঁচাদের আশা-ভরসা। পাঠশালায় গিয়ে দেখলাম যে ছাঁউনির নিচে তিনি পড়ান, তা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে তাই ওই একফালি বাড়িই ভরসা। কিন্তু ছাদ ফুটো হয়ে গেছে। বৃষ্টি নামলে ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল৷ ছোট্ট একখান ঘরই হয়ে উঠেছে শিক্ষার আবাস। কচিকাঁচাদের স্বপ্ন।
কাকিমার পাঠশালায় একঝাঁক পড়ুয়া
শিক্ষার প্রসার হওয়া প্রয়োজন — এই যে মানসিকতা তিনি ধারণ করেছেন, আমার মনে হয়েছিল এই উদ্যোগের পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। হ্যারিকেনের আলো জ্বালতেও তো তেল লাগে, সেই টাকাই বা কোত্থেকে আসবে! কিন্তু অসীমা কিছুতেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেবেন না গ্রামের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছিল গ্রামের একমাত্র স্কুল রবীন্দ্র শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। তাই সকাল-সন্ধে দু’বেলা অসীমার মাটির বাড়িতেই ক্লাস হত। দিনে সূর্যের আলো, আর সন্ধেবেলা মিটমিটে হ্যারিকেনই ভরসা। অসীমার পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ছেলেও। এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সে।
পড়ুয়াদের সঙ্গে আমি
অসীমা ভাণ্ডারীর এই বিপুল কর্মকাণ্ডকে নিজের চোখে দেখার বড়ো সাধ হয়েছিল আমার। আমরা পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশন-এর পক্ষ থেকে সেই পাঠশালাটি পুনর্নির্মাণ করে দিচ্ছি একটু গুছিয়ে৷ যাতে শিশুরা নিয়ম করে এখানে এসে পড়াশোনা করতে পারে। আর অসীমারও কোনো অসুবিধা না হয়। কারণ অসীমা আমার কাছে হয়ে উঠেছেন শিক্ষকের মতো। যাঁদের কথা বইয়ে পড়েছি, গুণীজনদের থেকে জেনেছি, সেদিন যেন তেমন একজন মানুষকেই চাক্ষুষ করেছিলাম। তাঁর কাজের সামান্য অংশ হতে পেরে ভালো লাগছে।
পাঠশালা পুনর্নির্মাণের ছবি
পশ্চিমবঙ্গের আরও গ্রামগঞ্জে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের কোম্পানি ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। ভবিষ্যতে আরও কাজ করতে পারব বলে আশা রাখি। আমাদের পাঠক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা পারলে আমাদের পাশে থাকবেন। পাশে থাকবেন অসীমা ভাণ্ডারীরও। তিনি কিন্তু প্রমাণ করেছেন তথাকথিত উচ্চশিক্ষা না থাকলেও সম্পূর্ণ মনের জোরে আগামী প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার বীজ বপণ করা যায়।